অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা পূরণ

মোহীত উল আলম

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশাটা আমাদের সবারই ছিল। শেষ পর্যন্ত তাই হতে যাচ্ছে। এটা এক দিকে শান্তিপ্রিয়দের জন্য যেমন স্বস্তির সংবাদ, অন্য দিকে গণতন্ত্রের জন্যও কল্যাণকর। এই বিষয়টিকে স্বাগত জানাই এবং শান্তিপ্রিয় সবার এতে খুশি না হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ বিষয়টি সম্ভব হয়েছে সংলাপে বসে সব রাজনৈতিক দল কিংবা জোটের নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি-অঙ্গীকারের প্রতি আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন বিধায়ই। বাইরে তারা যত কথাই বলুন না কেন, যদি আস্থাই রাখতে না পারতেন, তাহলে নির্বাচনে অংশ নিতেন না। এবারের নির্বাচনের মেজাজটাই সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে যাচ্ছে। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে এবারই দেশে সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্য রকম হাওয়া বইতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। আমার মনে হয়, খুব উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে এই নির্বাচন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক- এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টা কতটা প্রখর ছিল; বিদ্যমান বাস্তবতাই এর সাক্ষ্যবহ। সচেতন মানুষমাত্রেরই এর প্রেক্ষাপট জানা। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি ছিল না। একই সঙ্গে তার সৎ সাহসের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। তিনি তো বরাবরই বলে আসছেন, জনগণ চাইলে ক্ষমতায় থাকব; না চাইলে থাকব না। আমার মনে হয়, এবার মানুষ স্বাধীনভাবে, ভীতিমুক্ত পরিবেশে অবাধে ভোট দিতে পারবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে গণরায় যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ বিগত দুদশকে শুধু দেশের অভাবনীয় উন্নয়নই হয়নি; গণতন্ত্রের বিকাশ এবং জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসসহ বহুবিধ নেতিবাচকতার মূলোৎপাটনে এই সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রয়াস সবার নজর কেড়েছে। মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী বলেন, উন্নয়ন নাকি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিয়ামক শক্তি নয়, এমন নজির বিশ্বে অনেক আছে। আমি মনে করি, তেমনটি আমাদের ক্ষেত্রে ঘটবে না। কারণ আমাদের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্নতার যে কারণগুলো উল্লেখ করেছি; এ ছাড়াও রয়েছে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ সুগম করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার, জেল হত্যাকা-ের বিচার- এসব তো শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে।
যেহেতু তফসিল ঘোষণা করা হয়ে গেছে, সেহেতু বিধি মোতাবেক এখন অনেক কিছু চলে গেছে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে। সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে এবং নির্বাচন কমিশনের আদেশ উপেক্ষার অবকাশ তাদের নেই। নির্বাচন নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত, দৃষ্টান্তযোগ্য করার জন্য সব রকম প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে- এই বিশ্বাস সঙ্গত কারণে পোষণ করি। একই সঙ্গে এ-ও মনে করি যে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য শেখ হাসিনা যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটতে তিনি দেবেন না। কারণ এ রকমটি মনে করার মতো প্রেক্ষাপট ইতোমধ্যে তিনি তৈরি করেছেন। তবে নির্বাচন কমিশনকে সর্বক্ষেত্রে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য। কারণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়, তাদের শৈথিল্যের কারণে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের সামনে প্রশ্নমুক্ত, স্বচ্ছ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত আছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেসব নির্বাচন প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এবারও সে রকম নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন কমিশন সক্ষম হবে, এই প্রত্যাশা পোষণ করি। উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশনের। সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন হলে গণতান্ত্রিক ধারা আরও শক্তিশালী হবে। প্রধান বিরোধী পক্ষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবির মুখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের তারিখ ইতোমধ্যে পিছিয়ে ৩০ ডিসেম্বর করা হয়েছে। গত ১২ নভেম্বর দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা এ কথা জানিয়েছেন। কথা হলো, সবার গ্রহণযোগ্য দাবিগুলো যতটা বিবেচনা করা সম্ভব, সেসব করেই জনপ্রত্যাশা মোতাবেক সম্পন্ন হোক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
নির্বাচন কমিশনের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে তাদের জয়ী হতে হবে। তাদের কোনো কর্মকা- যেন বিতর্ক সৃষ্টি না করে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের বিশেষ করে শেখ হাসিনার আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। স্বচ্ছতার ব্যাপারেও তার দৃঢ় মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ইতোমধ্যে ঘটেছে। তিনি সবাইকে নির্বাচনে চেয়েছেন। এসবই ইতিবাচক। এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সর্বাধিক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন- সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। কেউ যাতে বাড়তি সুবিধা না পায়, সমানাধিকার যাতে নিশ্চিত হয়; এসব নিশ্চিতকরণের দায়টা তাদের। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের জনগণের সামনে ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রটা অনেক বিস্তৃত। কারণ বিগত এক দশকে তারা যে কাজ করেছে দেশ-জাতির কল্যাণে, সেসবই বিশেষ কল্যাণকর ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বদরবারেও এই সরকারের অনেক কাজ প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু অন্যতম। দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে।
এ দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের জন্য কম মূল্য দেয়নি। কিন্তু কখনও কখনও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের অনেক স্বপ্ন-প্রত্যাশার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে। গণতন্ত্রকে বৃত্তবন্দী করে হীন স্বার্থবাদীরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছে। শেখ হাসিনা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সড়ক নির্মাণ করেন- এই সত্যও এড়ানোর অবকাশ নেই। তা ছাড়া আরও একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং হিসাব-নিকাশ করার ক্ষেত্রে তারা খুব একটা ভুল করে না। তারা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে সবকিছু বিচার করে। সেই নিরিখে এবারের জাতীয় নির্বাচনে হয়তো তারা রায়ও দেবে। শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক