অতিরিক্ত টোল আদায় অমানবিক ও জুলুমের সামিল

ছালাবত জং চৌধুরী :

উন্নয়নের মহাসড়কে বর্তমান বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে নন্দিত। এটি আজ আর স্বপ্ন নয়, কঠিন বাস্তব। আমরা বাংলাদেশিরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতিবিদ সবাই এতে গর্বিত। বাংলাদেশের এই অভাবনীয় কর্মকাণ্ডে, যাদের অবদানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব হয় বা হয়ে থাকে, তাদের প্রধানতম হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিক এবং অন্যরা হলেন- গার্মেন্টের অক্লান্ত পরিশ্রম করা মা-বোনেরা বা কর্মীরা। রফতানি বাণিজ্যে এদের অবদান অপরিসীম। এ শ্রেণির কর্মীরা নিজ দেশে, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে থেকেই নিরলস শ্রম দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে যারা প্রবাসী, নানা প্রতিকূল পরিবেশে জীবনবাজি রেখে ক্রীতদাসের মত খেয়ে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে টাকা রোজগার করে দেশে পাঠান, তাদের এই অবদান কি কোনভাবে পরিমাপযোগ্য?

২০২২ অর্থ বছরেই বাংলাদেশে তিনটি মেগা প্রকল্প চালু হতে যাচ্ছে। ১ম পদ্মা বহুমুখি সেতু, ২য় বঙ্গবন্ধু ট্যানেল ও তৃতীয়টি মেট্রোরেল প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলো সুন্দর ও স্বার্থকভাবে চালু হলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মধ্যে আর্থসামাজিক একটি বিরাট পরিবর্তন সূচিত হবে। এতে জিডিপির হারও বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে প্রতিটি কর্মজীবী মানুষের কর্মঘণ্টা। এছাড়া রয়েছে আরো বহুবিধ মেগা প্রকল্প।

যা কিনা ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে মাতারবাড়ির বহুমুখী সমুদ্র বন্দর, আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, সাগরকন্যা কুয়াকাটায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, ঢাকা বিমানবন্দরের ৩য় আন্তর্জাতিক টার্মিনাল নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দ্রুতগতির ট্রেন লাইন নির্মাণ, ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা ট্রেন লাইন নির্মাণ, ঢাকা-যশোর ট্রেন লাইন নির্মাণ, অসংখ্য ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। অর্থাৎ যোগাযোগ অবকাঠামোর এ ব্যাপক উন্নয়নে ইতিমধ্যেই দ্রুতগতিতে প্রতিটি প্রকল্পের কাজই এগিয়ে চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

অন্যদিকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীকেও ফোর্সেস গোল-২০৩০-এর আওতায় যুগোপযোগী করে গড়ে তোলারও অব্যাহত প্রচেষ্টা রয়েছে সরকারের। কেননা সেনাবাহিনী আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আমাদের আশা-ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল। বিশ্বজুড়ে যারা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে দেশ ও জাতির জন্য সম্মান কুড়িয়ে আনছেন, তাদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা জাতির পবিত্র দায়িত্ব। কোন দেশ কি ভাবলো বা শত্রুতা করলো, তাতে বাংলাদেশের সরকার বা মানুষের কিছু যায় আসে না। বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে যুদ্ধ চায় না। বিরোধ চায় না। সবার সাথে বন্ধুত্বই বাংলাদেশের মানুষ কামনা করে। তবে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের কিছু গোপন শত্রুর সৃষ্টি হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
এরা প্রকাশ্যে শত্রুতা না করলেও পেছন থেকে ছুরি মারার সব প্রক্রিয়া রপ্ত করে রেখেছে, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। আর কিছু না হোক, অন্তত কূটনৈতিক উপায়ে হলেও চেষ্টা চালিয়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করতে সদা চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। এ বিষয়ে প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষ যেমন অবগত, তেমনি প্রয়োজনে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং প্রতিটি ইঞ্চি জমি রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। উদাহরণ হিসেবে তিস্তা বহুমুখী প্রকল্প, যা কিনা বন্ধুরাষ্ট্র চীনের সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করার জন্য যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ সরকার পদক্ষেপ নিয়েছেন, ঠিক তখনই ভারত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নানাভাবে বাধা প্রদান করে, যা এখনও তারা চালিয়ে আসছে।

আমরা আমাদের প্রয়োজনে-উন্নয়নের এবং তিস্তার দু’পাড়ের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য, নদীভাঙন প্রতিরোধ করার জন্য এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার ভূমি পূণরুাদ্ধরের জন্য এবং উত্তর বঙ্গের জেলাগুলোকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষার স্বার্থে প্রকল্পটি অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আমাদের কিছু যায় আসে না। আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা কোনভাবেই স্তিমিত হতে পারে না। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, উন্নযনের সব যাত্রায়ই দু’টি দিক পাশাপাশি অবস্থান করে। একটি- উন্নয়ন, অন্যটি- অর্থ আত্মসাৎ। উন্নয়নের প্রকল্প ছাড়া অর্থ আত্মসাৎ করা যায় না। এবং আত্মসাতের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার সব অভিনব প্রক্রিয়াও এই চোর দলের জানা।

এসব বিষয়ে সর্তকাবস্থা যতই থাকুক না কেন, আইনের শাসন অনুপস্থিত থাকার কারণে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথাযথভাবে না নেয়ার কারণে ‘বেগমপাড়া’র মত বিদেশের মাটিতে নানা পাড়ার সৃষ্টি হয়েছে। কানাডা, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুরের মত বহু দেশে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এমন কি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বাংলাদেশ হতে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বিশেষ করে কিছু পুলিশ অফিসার অবৈধ ঘুষ ও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে এই কূকর্ম সাধন করে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। অদূর ভবিষ্যতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পৃথিবীর সব দেশেই এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং প্রত্যেক দেশ থেকে এদেরকে বের করে দেয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাবে।

আগামী সোনালীদিনের অপেক্ষায় আমরা এ মুহূর্তে আরো একটি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকগুলো ব্রিজ তৈরি হয়েছে। ব্যয়বহুল এসব ব্রিজে টোল নির্ধারণ ও আদায়ের মাধ্যমেই ব্রিজগুলোকে জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এ টোল আদায় যেনো কোনক্রমেই মাত্রাতিরিক্ত না হয়, সে দিকে তীক্ষè নজর রাখতে হবে। প্রতিটি ব্রিজের টোল হতে হবে জনবান্ধব। টোল প্রদানে সাধারণ মানুষের যেনো কষ্ট না হয়। যদিও গাড়ি, লরি বা বিভিন্ন যানবাহন থেকে টোল নেয়া হবে।

তবে মনে রাখতে হবে- এই টোল জনগণকেই দিতে হবে। গাড়ি ভাড়া, ট্রাক ভাড়া, লরি ভাড়া সবই বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের ভাড়া যেমন বেড়ে যাবে, তেমনি পরিবহন ভাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবাদির উপর বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নিত্যপ্রয়োজীন দ্রবাদি ক্রয় করতে পারবে না। টোল নির্ধারণ এবং আদায় যেনো অমানবিক ও জুলুমের পর্যায়ে না পড়ে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী মহোদয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুবিবেচনার দাবি রাখে।