অধ্যাপক জামালের মুক্তি দাবিতে গণস্বাক্ষর অভিযান

ঠিকানা রিপোর্ট : কন্যাকে স্কুলে নেয়ার পথে গ্রেফতার হলেন সৈয়দ আহমেদ জামাল (৫৫)। অধ্যাপক জামালের মুক্তি দাবিতে গণস্বাক্ষর অভিযান ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এর এজেন্টরা ২৪ জানুয়ারি সকালে তাকে গ্রেফতার করেছে। ৩০ বছর যাবত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এই বাংলাদেশীর ৩টি সন্তান জন্মেছে এদেশেই এবং তারা মেধাবি হিসেবেও স্বীকৃত। জামালও কোন অপরাধে কখনো লিপ্ত হননি। অন্যের ওপর ভরসা করেও জীবন-যাপন করেন না। তবুও তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দয় নিদের্শের বাস্তবায়ন ঘটাতে। ক্যানসাস অঙ্গরাজ্যের লরেন্স সিটির বাসিন্দা জামালের স্ত্রী এঞ্জেলা জয়নব চৌধুরীও তার একটি কিডনি অন্যকে দান করেছেন অর্থাৎ একটি কিডনি নিয়ে দিনাতিপাত করছেন। এমনি অবস্থায় জামালকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করলে স্কুলগামী ৩ সন্তানসহ স্ত্রীকে অসহনীয় দুর্দশায় পড়তে হবে। এমন পরিস্থিতির কথা সবিস্তারে উল্লেখ করে ৩০ হাজারের অধিক আমেরিকান স্বাক্ষর করেছেন একটি আবেদনপত্রে। সেটি দেয়া হচ্ছে কর্র্তপক্ষ বরাবরে। জানা গেছে, স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের বিহারি সম্প্রদায়ের সন্তান জামাল। সে কোর্স শেষ করে ক্যানসাসের একটি ভার্সিটিতে রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন। এরইমধ্যে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়। তা সংশোধনের চেষ্টা করেও সক্ষম না হওয়ায় ২০১১ সালে ইমিগ্রেশন জজ তাকে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের সময় নির্দ্ধারণ করে দেন। সে অনুযায়ী তিনি যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ না করে ইমিগ্রেশন বিভাগের সাথে বিশেষ এক চুক্তির ভিত্তিতে ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করেন। সে অনুযায়ী, বছরে একবার ইমিগ্রেশন দফতরে উপস্থিত হয়ে ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের প্রক্রিয়ায় ছিলেন, যাকে বলা হয় ‘সুপারভাইজড রিলিজ’। অর্থাৎ যে কোন সময় কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করে বহিষ্কার করতে পারেন। সে প্রক্রিয়ায় ২৫ লক্ষাধিক অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট রয়েছেন এবং আইস তাদেরকে গ্রেফতারের অভিযান পুরোদমে শুরু করেছে। এর আগে ক্যানসাস থেকে আরো দুই বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করে বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় নেয়া হয়েছে।
জামালকে রাখা হয়েছে তার বাড়ি থেকে ১৬০ মাইল দূর মিজৌরী অঙ্গরাজ্যের মর্গ্যান কাউন্টি ডিটেনশন সেন্টারে।
জামালকে মানবিক কারণে মুক্তি দিয়ে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতির আহবানে গণস্বাক্ষর সংগ্রহকারিরা গত ৩ ফেব্রুয়ারি লরেন্স সিটিতে প্লাইমাউথ চার্চে জড়ো হয়েছিলেন। রসায়নে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের পর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত জামাল যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ১৯৮৭ সালে। স্টুডেন্ট ভিসায় এসেই ভর্তি হন ক্যানসাস ইউনিভার্সিটিতে। এরপর বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে এইচ-ওয়ান বি ভিসায় পুনরায় এসে মার্সি হাসপাতালে যোগদান করেন শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে। সে সময়েই তিনি ক্যানসাস ইউনিভার্সিটিতে আবারো যোগদান করেন ডক্টরেট ডিগ্রির জন্যে। সে সময়ে এইচ ওয়ান-বি ভিসার পরিবর্তন ঘটান স্টুডেন্ট ভিসায়।
জামালের এক ভাই সৈয়দ হোসেন জামাল থাকেন আরিজোনায়। তিনি বলেন, আমরা আরো ৪ ভাইয়ের সকলেই সিটিজেনশিপ পেয়েছি। শুধু জামালের হয়নি।
জামালের সমর্থকরা মার্কিণ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জামালকে যদি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে তিনি নৃশংসতার শিকার হয়ে মারাও যেতে পারেন। কারণ, জামালের পরিবারের সকলেই ‘বিহারি’ হিসেবে চিহ্নিত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামালের অভিভাবকেরা পাকিস্তানীদের পক্ষে ছিলেন।
ডিটেনশন সেন্টার থেকে প্রেরিত এক বিবৃতিতে জামাল তার এটর্নীকে জানিয়েছেন, ‘আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে আমি মারাত্মক হুমকিতে পতিত হবো, সেটি হচ্ছে আমার প্রিয় পেশা শিক্ষকতা ও গবেষণা। এখানে আমি স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছি। বাংলাদেশে ফিরে গেলে সে সুযোগ থাকবে না।’
‘বাংলাদেশে গিয়ে শিক্ষকতার অনুমতি পেলেও জাতীয় নেতাদের কর্মকান্ডের ব্যাপারে কোন সমালোচনা করার অধিকার তিনি পাবেন না’-বলেও উল্লেখ করেছেন।
ওয়াশিংটন ডিসিতে আইসের জনসংযোগ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন যে, জামালকে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায়। ৪ বছর আগে জামালের সর্বশেষ আপিলের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে ‘ইউএস বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিল’ বিভাগ। এখন আর সময়ক্ষেপনের অবকাশ নেই।
জামালের ১৪ বছর বয়েসী পুত্র (নবম গ্রেডের ছাত্র) তাছিন জামাল তার ফেসবুকে লিখেছে, আমাদের বাড়িটি এখন আর বসবাসের উপযোগী নয়। কারণ, বাবা নেই বাসায়। তিনিই হচ্ছেন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবা শুধু আমাদের ব্যাপারেই যতœবান ছিলেন না, মাকেও সেবা দিয়েছেন। কারণ, আমার মা একটিমাত্র কিডনি নিয়ে বেঁচে আছেন।’
তাছিনের একমাত্র বোন সপ্তম গ্রেডের ছাত্রী, তার বয়স ১২ বছর।। আরেক ভাই যাচ্ছে প্রাইমারিতে. তার বয়স ৭ বছর।
ক্যানসাস স্টেট ডেমক্র্যাটিক পার্টির নির্বাহী কমিটির সেক্রেটারি রেহান রেজা জানিয়েছেন, জামালকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দানের জন্যে আমরা ইতিমধ্যেই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী (অভিবাসন দফতরের অভিভাবক) কে দরখাস্ত দিয়েছি। স্থানীয় কংগ্রেসম্যানকে লিখেছি। সর্বস্তরে স্বাক্ষর অভিযান চলছে মানবিক কারণে জামালকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি প্রদানের জন্যে।