অনীপ্সিত প্রত্যুষ

দিলারা বেগম

আকাশের রং অন্য রকম নির্দিষ্ট কোনো রং ধরে বর্ণনা করা যায় না। লাল, সোনালি আর ধূসর রঙের সমন্বয়ে কেমন যেন এক ভয়ংকর রকমের পিঙ্গল। আকাশের ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট গর্ত। সেই গর্ত থেকে সুড়সুড় করে সুরকি, বালি, পাথর আর কংক্রিটের গুঁড়া ভূপৃষ্ঠে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক পাহাড়সমান ঢিবি। ধুলাবালিতে ভরে গেছে গাছপালা, বাড়িঘর। পৃথিবীতে শুধু মাটি আর মাটি। আল্লাহ আল্লাহ করে মানুষজন চারদিকে ছোটাছুটি করছে। সময়ও কেউ আন্দাজ করতে পারছে না, কটা বাজে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সায়ন্তীর গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে। সে পানি খুঁজছে। কোথাও পানি পাচ্ছে না। হঠাৎ সে দেখতে পেল, কলকল করে পানি আসছে চারদিক থেকে। সে অঞ্জলি ভরে পানি নিল, পানিতে জোঁক কিলবিল করছে। ভয়ে-আতঙ্কে সে খুব জোরে চিৎকার করে উঠল।
ঘুম ভেঙে গেল সায়ন্তীর। সত্যি সত্যি তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। টেবিলে রাখা পানির বোতল খুলে সে পানি খেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত সাড়ে তিনটা বাজে। আরাম করে আরো কয়েক ঘণ্টা ঘুমানো যাবে। সাড়ে ছয়টায় সে বিছানা ছাড়ে, সাতটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের ঘটনাগুলো মনে করতে করতে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল। বেশ কিছুদিন থেকে সে এ ধরনের স্বপ্ন দেখছে। একবার দেখল চাঁদ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পৃথিবীতে এসে পড়েছে। চাঁদের সোনালি আলোয় সারা পৃথিবী উজ্জ্বল হয়ে আছে। এ যেন এক ভয়ংকর রকমের জ্যোৎস্নাময়ী রাত। আরেকবার দেখল সূর্য উঠেছে দুটি, একটি পূর্ব দিকে আর একটি পশ্চিম দিকে। এই স্বপ্নটা দেখে সায়ন্তী সত্যি খুব ভয় পেয়েছিল। তুহিনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আতঙ্কজড়িত কণ্ঠে বলেছিল,
তুহিন, জানো, আমি না কেমন যেন এতগুলো স্বপ্ন প্রায়ই দেখি।
তুহিন জিজ্ঞেস করেছিল কেমন?
সায়ন্তী বলেছিল, কেমন যেন সব স্পেস-সংক্রান্ত।
এই স্পেস-সংক্রান্ত কথাটা শুনে মধ্যরাতের নিঃশব্দতা ভঙ্গ করে হাহা করে হেসে উঠেছিল তুহিন।
বলেছিল, অ্যাসট্রোনাট হতে যাচ্ছ নাকি।
স্বপ্ন, তুহিন, তুহিনের সাথে সম্পর্ক, বিয়ে, ডিভি পেয়ে আমেরিকায় চলে আসা, তারপর মনোমালিন্য অতি তুচ্ছ কারণে। তন্দ্রাচ্ছন্ন সায়ন্তীর বিক্ষিপ্ত মন একবার অতীত একবার বর্তমানের দিকে ধাবিত হতে লাগল। অপর রাত্রির অসংলগ্ন চিন্তা-ভাবনায় আচ্ছন্ন সায়ন্তী অস্পষ্ট স্বপ্নে নিমগ্ন হয়ে উপভোগ করতে লাগল দুরন্ত-দুর্বার সৌন্দর্যমণ্ডিত শৈশব, কৈশোর ও উত্তপ্ত যৌবনের আনন্দ-বেদনার গল্পকথায় গেঁথে রাখা নানান ধরনের কাহিনি চিত্র। কত কথা মনে পড়ে গেল। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাশের বাসার বন্ধুদের সাথে বকুল ফুল কুড়ানো, মক্তবে আরবি পড়া, দল বেঁধে হেঁটে হেঁটে দূরের পাঠশালায় পড়তে যাওয়া, বিকেলে ছেলেমেয়ে সবাই মিলে ওপেন টিন বায়োস্কোপ নাইন টেন টেলিস্কোপ, এলাটিং বেলাটিং ধাইল রাজার খবর আইল, গোল্লাছুট, হাডুডু খেলা। নিবিড় কৃষ্ণ সন্ধ্যায় ঝাঁক ঝাঁক জোনাকির আলোর সাথে মিশে যাওয়া সেই অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো কেমন করে যেন কোথায় হারিয়ে গেল।
স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সদ্য অতিবাহিত হয়ে যাওয়া কোরবানির ঈদের দ্বিতীয় রাতের প্রথম প্রহর। মৃদুমন্দ বাতাস আর জ্যোৎস্নার বন্যার সাথে মিলেমিশে একাকার যাওয়া কোরবানির গরু-ছাগলের শুকনো রক্তের গন্ধ। পৃথিবীর বুকে যেন একটি করুণ চাঁদনি রাত। সে রাতেই তুহিনের প্রতি ভালোবাসায় আবিষ্ট হয়েছিল সায়ন্তী। একেবারেই আকস্মিক, অপরিকল্পিত ভালো লাগা, ভালোবাসা।
ভাবির খালাতো ভাই তুহিনের সাথে এ নিয়ে মাত্র তিনবার দেখা হলো সায়ন্তীর। এবার দেখা হলো পাঁচ বছর পর। মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান পাওয়া ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মাসখানেক হলো বুয়েটেই জয়েন করেছে। কোরবানি ঈদের ছুটিতে এসে সবার বড় খালাতো বোন টুলু আপা, যিনি সায়ন্তীর বড় ভাবি তার সাথে দেখা করতে এসেছে। দরজা খুলল একপ্যাঁচে শাড়ি পরা এলো খোঁপায় শান্ত সৌম মায়াবতী এক যুবতী। অনেকক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তুহিন জিজ্ঞেস করল,
তুমি সায়ন্তী না, মাই গড, এত বড় হয়ে গেছ তুমি।
মায়াবতী যুবতী সায়ন্তী তুহিনকে অবাক করে দিয়ে কলকলিয়ে বলে উঠল,
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, আপনি কিন্তু পাঁচ বছর পর এসেছেন।
মিটিমিটি হেসে তুহিন বলল, থ্যাংক ইউ, মনে রাখার জন্য।
এমন মিষ্টি হেসে রিনরিন ধ্বনিতে ওয়েলকাম বলল সায়ন্তী, যে অনুরণনে আবিষ্ট হয়ে তুহিন স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল যেন এক অনন্য অপরিচিত অঙ্গনার দিকে।
সায়ন্তীদের বাড়ির পূর্ব দিকে অনেকখানি জায়গাজুড়ে সুপারি বাগান। সেই সুপারি বাগানের ঠিক মধ্যখানে মহাসড়ক বরাবর সরু গলি, সেই গলি পেরোলেই ঢাকাগামী বাস রুট। দোকানপাট, বাজার, আধা মাইল দূরেই শহর। গলির শেষ মাথায় রিকশা স্ট্যান্ড। কেন যেন সেদিন অতি আগ্রহে তুহিনকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল সায়ন্তী। তুহিন এমন উৎফুল্ল ভঙ্গিমায় কথা শুরু করল, যেন সায়ন্তীর সঙ্গ একটি বিস্ময়কর বাড়তি পাওয়া তুহিনের জন্য। চাঁদের আলোয় সেই সরু গলি ধরে পাশাপাশি নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে আধো-আলো, আধো-ছায়া এ রকম একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে এলোমেলো অনেক কথার ফুলঝুরি ছোটাল দুজনে। যতদূর দেখা গেল, তুহিনের রিকশার দিকে তাকিয়ে থাকল সায়ন্তী। বাড়ি ফিরতে মন চাইছে না। সুপারি গাছের ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁক দিয়ে ছোপ ছোপ চাঁদের আলোর ছায়াতরু দৃশ্য আর তুহিনের সান্নিধ্য উপভোগ করার সৌজন্যে অনন্যসুন্দর পৃথিবীতে জন্মানোর জন্য মনে মনে বিধাতার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করল সায়ন্তী। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে গুনগুন করে গেয়ে উঠল, ‘আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে।’
কেন যেন বারবার তুহিনের কথা মনে পড়ছে সায়ন্তীর। ভালোবেসেই তুহিন বলত, এখানে লেখাপড়ার কত সুযোগ, চার-পাঁচ বছর দেখতে দেখতে চলে যাবে। এসব কথা বলে কত অনুনয়-বিনয় করেছে তুহিন কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য। সায়ন্তী যে এ ব্যাপারে ভাবেনি তা নয়। কত ভালো ছাত্রী ছিল সে। মাইক্রোবায়োলজিতে অনার্স শেষ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এমএসসিতে ভর্তিও হয়েছিল। শেষ করা হলো না। তুহিনের সাথে বিয়ের পরপরই একেবারে একটা দায়সারা গোছের ভাব নিয়ে খুব গোপনে আমেরিকার ডিভি লটারিতে একটা দরখাস্ত পাঠিয়েছিল সায়ন্তী। অলৌকিকভাবে পেয়েও গেল। তুহিন আর ওর পরিবারের কাছে আদরের অন্ত রইল না তার। ক্যারিয়ার গঠনে উচ্চাভিলাষী তুহিন তখনই যোগাযোগ শুরু করে দিল আমেরিকাপ্রবাসী বন্ধুদের সাথে। আর সায়ন্তীর মনে ছিল কত রঙিন স্বপ্ন, কত সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা। নভেম্বরের ৩০ তারিখে ফ্লাইট। ২২ তারিখে বঙ্গবাজার থেকে শপিং করে, চায়নিজ খেয়ে বাসায় ফিরতেই সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে প্যারালাইজড হয়ে বেঁচে রইলেন সায়ন্তীর বড় ভাই সিনিয়র প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান।
ভাবি একা হয়ে গেলেন। একজন বেসরকারি কলেজের অধ্যাপিকা কীভাবে এত বড় সংসার টানবেন-এ বিষয়টি সায়ন্তীর বিবেককে এতটাই নাড়া দিল যে বড় ভাইকে হসপিটালে রেখেই সে আমেরিকায় চলে এল। বন্ধুদের সহযোগিতায় দুই মাসের মধ্যেই তুহিন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে জয়েন করল। আর সায়ন্তী হন্যে হয়ে অড জব খুঁজতে লাগল।
সায়ন্তীর ডিভি পাওয়ার বদৌলতেই আমেরিকায় এসেছে তুহিন, এ জন্য তার কৃতজ্ঞতার শেষ ছিল না। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে প্রথমেই সে শোভনকে টাকা পাঠিয়ে দিল সায়ন্তীকে না জানিয়ে। সায়ন্তীর আত্মসম্মানে বিষয়টি খুব আঘাত করল কিন্তু কোনো উপায়ও নেই। বড় ভাইয়ের চিকিৎসা, মায়ের ওষুধ, শোভনের মেডিকেলে পড়ার খরচ তো চালাতে হবে। তুহিন বারবার নিষেধ করেছে কাজ না খুঁজে কলেজে কোনো কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য। একরোখা সায়ন্তীর এক কথা-তার পরিবারের দায়িত্ব সে-ই নেবে। তুহিনকে দয়া দেখাতে হবে না।
নিউইয়র্কের কুইন্স লাইব্রেরিতে একটা ইএসএল কোর্স শুরু করল সায়ন্তী। সেই সুবাদেই পরিচয় হলো ইকুয়েডরের মেয়ে মারিয়ার সাথে। মারিয়া স্কুলে টিচার এইড হিসেবে কাজ করে শুনে সায়ন্তী অবাক হলো। মাত্র হাইস্কুল ডিপ্লোমা, ইংরেজিও তেমন ভালো জানে না।
অবাক হয়েই মারিয়াকে জিজ্ঞেস করল সায়ন্তী,
তুমি কীভাবে স্কুলে কাজ পেলে?
মারিয়া তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্যারাপ্রফেশনাল এবং টিচার এইড বা অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করল।
টিচার এইড বা প্যারাপ্রফেশনাল শুধু স্পেশাল এডুকেশনে কাজ করে। যে ছাত্রছাত্রীদের জন্য আইইপি আছে এদের সাথে। টিচার এইড বা প্যারাপ্রফেশনাল আইইপি এসব কিছুই বুঝতে পারে না সায়ন্তী। মারিয়া তিন বছর থেকে এই কাজ করে। তাই সে ধীরে ধীরে অনেক কিছু শিখেছে।
মারিয়া বলল, তুমিও এ কাজ করতে পারবে। মারিয়া তাকে বোঝাল যে অন্য দেশ থেকে এমএস বা পিএইচডি থাকলেও এ দেশে স্কুলে কাজ করতে চাইলে প্যারাপ্রফেশনাল বা টিচার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেই কাজ করতে হবে। টিচার হতে চাইলে পাঁচ থেকে ছয় বছর পড়তে হবে। লাইসেন্স পরীক্ষায় পাস করতে হবে। টিচার এইডের জন্য কোনো ঝামেলা নেই, শুধু টিচারকে সাহায্য করতে হবে কাগজ কাটা, বুলেটিন বোর্ড তৈরি, ফটোকপি করা, স্পেশাল এডুকেশন হলে শিক্ষার্থীদের বাথরুমে নেওয়া, ডায়াপার বদলানো, ক্লাসরুম, ডেস্ক পরিষ্কার করা এসব কাজ। এসব কাজ করতে হয় প্রাইভেট স্কুলে। পাবলিক স্কুলে অনেক সুবিধা। সাবস্টিটিউট টিচার বা প্যারাপ্রফেশনাল টিচার হিসেবে কাজ করা যায় কিন্তু বিভিন্ন স্কুলে কাজ করতে হয়।
মারিয়া সায়ন্তীকে বোর্ড অব এডুকেশনের ফোন নাম্বার আর ঠিকানা দিল। টিচার, সাবস্টিটিউট টিচার, প্যারাপ্রফেশনাল-এসব বুঝতেই অনেক সময় লাগল সায়ন্তীর। টিচার বা সাবস্টিটিউট টিচারের জন্য এ দেশের সমমানের ব্যাচেলর ডিগ্রি ও প্যারাপ্রফেশনালের জন্য সমমানের হাইস্কুল ডিপ্লোমা হলেই হবে কিন্তু এ দেশের স্কুলের প্রিন্সিপালের কাছ থেকে একটি নমিনেশন লেটার নিতে হয়, যদি কেউ পাবলিক স্কুলে কাজ করতে চায়। দক্ষতার সাথে কাজ করে অনেকেই সাবস্টিটিউট পদ থেকে পারমানেন্ট পদে বহাল হয়েছে। পাবলিক স্কুলে এই প্যারাপ্রফেশনাল টিচাররা ওয়ান টু ওয়ান অর্থাৎ শুধু একজন শিক্ষার্থীর সাথে কাজ করে। ক্লাস ওয়ার্কে সাহায্য করা। শিক্ষার্থীর হুইলচেয়ার ঠেলে নেওয়া, এডুকেশন ডিভাইস যেমন হিয়ারিং এইড পরানো, কম্পিউটার এসব ক্লাসে সাহায্য করা। অন্য দেশের অনেক মানুষ যারা উচ্চশিক্ষিত বা অন্য প্রফেশনের হয়েও এখানে টিচার এইড হিসেবে কাজ করছে। এসব বিস্তারিত তথ্য তুহিনকে জানাল সায়ন্তী।
এসব শুনে চিৎকার করে উঠে তুহিন বলল,
না না, ওসব কাজ করা হবে না বরং কলেজে ভর্তি হও।
তুহিনের কথা শুনল না সায়ন্তী। উঠেপড়ে লেগে গেল টিচার অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজের খোঁজে। আর তুহিন ছুটির দিনগুলোতে বুয়েটের অনেক জুনিয়র আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠল, শুরু করল শর্ট পরা, মদ্যপান করা। মাঝেমধ্যেই সায়ন্তীকে উদ্দেশ করে বলতে লাগল নিজেকে এবার একটু বদলাও। সায়ন্তী একটা প্রাইভেট ¯ু‹লে জয়েন করল টিচার এইড পজিশনে। ইন্টারভিউয়ের ধরন দেখে রীতিমতো অবাক হলো সায়ন্তী। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজন এসে একটি ক্লাসে নিয়ে ২০ মিনিট অবজারভেশন করতে বলল। ক্লাসে সাড়ে তিন বছর বয়সের ছয়টি শিশু, একজন শিক্ষক ও দুজন প্যারাপ্রফেশনাল শিক্ষক। এই শিশুদের বলা হচ্ছে চিলড্রেন উইথ অটিজম। এক সপ্তাহ বেশ কয়েকটি ক্লাস অবজারভেশনের পর সায়ন্তী একটি ক্লাসে নিয়মিত হলো। এই ক্লাসে ছয়টি শিশুর কেউই কথা বলতে পারে না কিন্তু নানা ধরনের শব্দ করে। তিনজন টিচার এইড। একজন একটি শিশুর সাথে ওয়ান টু ওয়ান কাজ করে। সব সময় শিশুটির সাথে সাথে থাকে। শিশুটি সুযোগ পেলেই টেবিলের নিচে ঢুকে যায়। নিজের হাত নিজে কামড়ায়।
সপ্তাহে এক দিন করে প্রায় এক বছর অ্যাপ্লাইড বিহেভিয়ার অ্যানালিসিস (এবিএ) ট্রেনিং নিয়েছে সায়ন্তী। কত সুযোগ এ দেশে। এখানে এক বছর দক্ষতার সাথে কাজ করার পর টিচার হতে চাইলে হায়ার এডুকেশনের জন্য সব খরচ স্কুল দেবে। এ স্কুলে প্রায় চার বছর হলো সায়ন্তীর এই চিলড্রেন উইথ অটিজম শিশুদের সাথে কাজ করছে আর দেশে সংসার টানছে। সে টিচার এইডই থেকে গেল। সায়েন্টিস্ট হওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না সায়ন্তীর। সায়ন্তীর সাথেই টিচার এইড পজিশনে কাজ করছে প্রিন্সিপালের বোন, ডাক্তারের স্ত্রী। এরা আমেরিকান। অথচ বাংলাদেশি তুহিনের স্থান এদের চেয়েও অনেক ঊর্ধ্বে। তার স্ত্রী টিচার এইড পজিশনে কাজ করতে পারবে না। এরা কাজকে যে কত সম্মান করে, তা দেখে নিজেকে অনেক ছোট মনে হয় সায়ন্তীর। অনেক সময় টিচার এইড বা টিচার উপস্থিত না থাকলে প্রিন্সিপাল বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিন্সিপাল এদের জায়গায় কাজ করে। শিশুদের বাথরুমে নিয়ে যায়, লাঞ্চ সার্ভ করে। অনেক যত্ন করে মুখের লালা মুছিয়ে দেয়। সায়ন্তী ভাবে আমরা কিছু মুসলমান এদেরকে বলি বিধর্মী।
তরতর করে উপরে উঠতে লাগল তুহিন। এক বছর হলো শিকাগোতে একটি বড় কোম্পানিতে জয়েন করেছে। সায়ন্তী যায়নি বলে মনোমালিন্য চলছে। নতুন জায়গায় কাজ না পেলে দেশে টাকার জোগান দিতে পারবে না, সে কারণেই যাওয়া হয়নি। আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে স্বামীর টাকা বাবার বাড়িতে দিতে পারবে না সায়ন্তী। এই তুচ্ছ কারণটির বিচার-বিশ্লেষণ আর সমাধানের পথ খুঁজতে খুঁজতে ঘুমিয়ে পড়ল সায়ন্তী।
ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল। চোখ খুলেই সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে পাঁচটা বাজে। বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ঝরঝর শব্দ আর মেঘের গর্জনের সাথে পাল্লা দিয়ে যেন ফোন বাজছে। মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হলো তার, ফোন তুলে বিরক্তিজড়িত স্বরে সে বলল,
হ্যালো।
ও পাশে ছোট ভাই শোভন মিনমিনে গলায় বলল,
কেমন আছিস আপা? আমার বেশ কিছু টাকা দরকার।
শোভনের কথা শেষ না হতেই চিৎকার করে বলে উঠল সায়ন্তী, আমি কি সারা জীবন ধরে তোদের পালব। খোঁজ রাখিস কীভাবে টাকা রোজগার করি।
চুপ হয়ে গেল শোভন। শান্ত স্বরে বলল, অসুবিধা হলে থাক। ভালো থাকিস বলে আস্তে করে ফোন রেখে দিল।
নিজের ব্যবহারে নিজেই হতভম্ব হয়ে গেল সায়ন্তী। মেডিকেলের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র শোভনের অপমানিত, অসহায় মুখটি যেন দেখতে পেল সে। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা চাপ অনুভব করল সে। মনে হলো এখনই বুঝি তার হৃৎস্পন্দন থেমে যাবে। দুই চোখ ফেটে কান্না এল তার। প্রয়াত আইনজীবী জনাব কপিল উদ্দিনের হীরার টুকরো মেয়ে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজির শেষ বর্ষের ছাত্রী সায়ন্তী নিউইয়র্কের একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে এক ঝড়-ঝঞ্ঝার প্রত্যুষে বেদনাদগ্ধ হয়ে একাকী হু হু করে কাঁদতে লাগল।
-নিউইয়র্ক।