অবিশ্বাস থেকে বিদ্রোহ, তার থেকে বিপ্লব — শামসুল আরেফিন খান

বিভাজনরেখা এত গভীর যে তা কলঙ্কের মতো অনপনেয়। কোনো উপায় নেই মুছে ফেলার। এই বিভাজনের উৎসে রয়েছে মানুষের বিশ্বাস। সেটা সত্যোপলব্ধি না হয়ে অন্ধবিশ্বাসও হতে পারে। অন্ধবিশ্বাসের অপর নাম আনুগত্য। অন্ধবিশ্বাস না থাকলে আনুগত্য টলে যায়। পৃথিবীতে এখন উৎপন্ন সমস্ত সম্পদের ৮০ ভাগই কেবল এক ভাগ মানুষের কুক্ষিগত হয়েছে। এটা অনুমান নয়, পরিসংখ্যান। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র ভাগ্যহত মানুষ যদি অন্ধবিশ্বাসচ‚্যত হয়, অবাধ্য হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্বের স্থিতাবস্থার পরিণতি কী হতে পারে, তা-ও চিন্তার বা অনুমানের অগম্য নয়।
ফেরাউন যুগের ক্রীতদাস ২০ ঘণ্টা অমানুষিক শ্রম দিয়ে ভাবত, এটাই তার নিয়তি। ভাগ্যের লিখন বা তকদির। তকদিরের বিরুদ্ধে প্রথম তদবির শুরু হলো মুসা নবীর আগমনে। তারা বিদ্রোহী হয়ে দেশত্যাগী হলো। এখন তারাই অলক্ষ্যে বিশ্ববাসীর প্রধান ভাগ্যবিধাতা। ফেরাউন নিজেকে ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়ে বেশুমার শোষণ চালাত। মানুষ একসময় বিশ্বাস করত, রোম স¤্রাটই হলেন ঈশ্বর। এমনটা বিশ্বাস করাটায় ছিল বাধ্যবাধকতা। অনুগত নতজানু প্রজাকুল বিশ্বাস করত স¤্রাটের আদেশই বিধাতার হুকুম। ঈসা নবী মানুষের সে বিশ্বাস টলিয়ে দিলেন। তারপর সহ¯্রাব্দ ধরে ইনকুইজিশন যুগে ধরে-বেঁধে নব্য শোষকরা খড়্গ উঁচিয়ে, মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে জোর জবরদস্তি করে ঈসা নবীর কথা বিশ্বাস করানোর নির্মম প্রয়াস চালাল। ঈসা নবীর কথার অন্তরালে ছিল চার্চ ও চার্চের অনুগত রাজার প্রতি মানুষকে অন্ধ আনুগত্যে বেঁধে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। বিপরীত প্রক্রিয়াও যে বিজ্ঞানের নিয়মে সমান্তরাল ছিল, সেকথা বলাই বাহুল্য। দার্শনিক ভলতেয়ার, রুশো, মন্তেস্কু নতজানু অনুগত মানুষের মনে অবিশ্বাস ও অবাধ্যতার আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। বাস্তিল দুর্গের পতন হলো। তারপরও অনুগতরা নেপোলিয়নের হাত ধরে ক্ষমতায় ফিরে এল। ফরাসি বোদ্ধাদের অনেকে বলে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের স্বাধীনতাসংগ্রাম ফরাসিদের অনুপ্রাণিত করেছিল। মার্কিন বোদ্ধারা বলেছেন, ফরাসিরা এক বিপ্লবে ক্রীতদাস মুক্তি ঘটিয়েছে। আর মার্কিনরা সেটা করেছে শতবর্ষ পরে।
অবিশ^াস থেকে বিদ্রোহ, তার থেকে বিপ্লব! চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, কোরিয়াতেও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। কার্ল মার্ক্স অন্ধবিশ্বাসকে আফিমের নেশার সঙ্গে তুলনা করে মানুষকে জাগিয়ে তুললেন। লেনিন, মাও অন্ধবিশ্বাস ছাড়িয়ে বিদ্রোহের পতাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে মানুষকে বিপ্লবের বিজয় শিখরে পৌঁছে দিলেন। মহাত্মা গান্ধী, কামাল আতাতুর্ক, গামাল আব্দুন নাসের, সুকর্ন, শেখ মুজিব ‘বলো বীর বলো চির উন্নত মম শির’ মন্ত্রে উজ্জীবিত করলেন নিজ নিজ জনগণকে। বিদ্রোহ করতে শেখালেন। অন্ধবিশ্বাস ছেড়ে আলোর পথে হাঁটতে শেখালেন। শোষণের বধ্যভ‚মি থেকে উঠিয়ে এনে স্বাধীনতার স্বর্ণশিখরে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
কিন্তু এখন পÐিতরা বলছেন, পৃথিবীর সব বিপ্লব নাকি ছিল সংখ্যালঘু মানুষের বিপ্লব। বিল্পবীরা ছিল সংখ্যালঘু। তার মানে পরাজিতরা ছিল সংখ্যাগুরু। সে কারণে বিপ্লব জিতেও চ‚ড়ান্ত বিচারে হেরেছে। তার দৃষ্টান্ত ফরাসি বিপ্লব। তার নজির খোদ রুশ বিপ্লব। আর যুক্তরাষ্ট্রের সাত বছরের স্বাধীনতাযুদ্ধ, যার সবটা ছিল সশস্ত্র বিপ্লব, ব্রিটিশ রাজার সুশাসনের আড়ালে আপান্ত শোষণের বিরুদ্ধে। সে যুদ্ধও যে ছিল সংখ্যালঘু জনগণের যুদ্ধ, সেটাও বোধ হয় অনুপাতে সিদ্ধ। সে গল্পটা জানলে বাদবাকি সব জলবৎতরলং হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। যুদ্ধ যখন দখলদার ব্রিটিশকে অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলেছিল, তখনো অনেক মানুষ তারস্বরেই বলেছে, সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত না হলে ব্রিটিশ রাজার সুশিক্ষিত দুর্ধর্ষ সেনাদের হারাতে পারবে না নগ্নপদ নবিশ মুক্তিযোদ্ধারা। কোথায় মিলিশিয়া আর কোথায় বিশ্বসেরা ব্রিটিশ সৈন্য! কিসে আর কিসে ধানে আর তুষে! রাজানুগতরা ব্রিটিশের পক্ষে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্থা করল, নিকুচি করল, ল্যাং মারল। এত কিছু করে রাজানুগত্যের প্রমাণ রাখল। ফরাসি বন্ধুরা জর্জ ওয়াশিংটনের পাশে এসে দাঁড়াল। ব্রিটিশ পেঁ পেঁ করে পালাতে লাগল। তখন হাজার হাজার রাজভক্ত ক্রীতদাস তাদের জাহাজে গিয়ে উঠল। আর পলায়নরত ব্রিটিশ তাদের নিয়ে অন্য বন্দরে আবার ক্রীতদাস বানিয়ে বেচে দিল। সাদারা ব্রিটেনে গিয়ে পৌঁছাল বটে, তবে মানুষ তাদের মুখে থুতু ছিটাল। লয়ালিস্টদের (রাজাকার) মধ্যে যারা পালানোর পথ পেল না, তাদের হলো করুণ অবস্থা। তাদের মাথা মুড়িয়ে মুখে চুনকালি মাখিয়ে গাধার পিঠে উল্টো চড়িয়ে শহর ঘোরাল মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো। সম্পদগর্বী স্থ‚ল নারী ঘর হারিয়ে গোয়ালঘরে স্থান পেল। নিজের শস্যখেতে নিড়ানি দিয়ে তবে খিদের অন্ন পেল। সেই ভাগ্যবিড়ম্বিত লয়ালিস্টরাই একসময় আবার সব ব্যবসা-বাণিব্জ্য বাগিয়ে নিল নতুন শাসকদের তাঁবেদারি করে। তারাই ১ শতাংশ মানুষ, যাদের হাতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ ভাগ সম্পদ জমেছে। আর তাদের মোসাহেবদের হাতে রয়েছে বাকি ১৯ ভাগ। মোসাহেবরা জনসংখ্যার ৯ শতাংশ আর ১০ শতাংশ হলো তাদের তল্পিবাহক, পদলেহী ও সুবিধাভোগী। ৮০ ভাগ মানুষ ভাগ্যবঞ্চিত। কিন্তু সোনার শিকল পরা তোতাপাখি তারা। এ চিত্র এখন প্রায় পৃথিবীর সব দেশেই। কোথাও হয়তো ছবি ক্যানভাসে পরিণতি পাচ্ছে এখনো শিল্পীর তুলি বেয়ে। সে অসম্পূর্ণতা হয়তো পূর্ণ হবে অচিরেই। তবে বাস্তবতা এটাই যে, দেশে দেশে যে রক্তক্ষয়ী বিপ্লব হয়েছে, যুগে যুগে তাতে পৃথিবীর রং বদলে গেছে। শোষকের চেহারা বদল হয়েছে। কিন্তু শোষণের অবসান হয়নি। এখনো শোষকরা আনুগত্য চায়। আনুগত্য আর ধর্মান্ধতা টাকার এপিঠ-ওপিঠ। মানুষের অন্ধবিশ্বাস যদি অটুট থাকে, তাহলে শোষণ অক্ষয় হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানভাসে সে চিত্রের পরিপূর্ণতা দৃষ্টিগোচর হয় এ সময়।
শোষণের আরেকটি হাতিয়ার হলো মানুষের ভাষা। মোগল শাসনামলে ফারসি ভাষার মোড়কে ভারতবর্ষের সমস্ত শিক্ষা, সংস্কৃৃতি, ঐতিহ্য শ্বাসরুদ্ধ হয়েছিল। ব্রিটিশ এসে ইংরেজি ভাষার জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দিয়ে শোষণ পাকাপোক্ত করেছিল। রাজকাজে ফারসি ভাষার বিলুপ্তি ঘটাতে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ঠাঁই পেয়েছিল ১৮৩৫ সালে। কিন্তু শিক্ষায় ছিল ভিন্ন চিত্র। ১৯৩৬-৩৭-এর আগে ম্যাট্রিক (স্কুল ফাইনাল) পরীক্ষা অব্দি ইংরেজি বাধ্যতামূলক ছিল।
ভাষা আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শাসিত ও পদানত জাতিসত্ত¡াকে বিলীন করে দিয়ে শোষণ শাসন পাকাপোক্ত করার প্রাচীন তত্তে¡র আবিষ্কারক হচ্ছেন স্প্যানিশ ভাষাতাত্তি¡ক এলিও অস্তানিও ডি নেব্রিহা। স্পেনের রানি তখন ইসাবেলা। কথিত আছে, রানিকে তুষ্ট করার জন্য ভাষাবিদ নেব্রিহা ক্যাস্তিলিও ভাষায় একটি ব্যাকরণ বই লিখে রানিকে উপহার দেন। সেই বইয়ের ভ‚মিকায় তিনি লেখেন, ‘ভাষাই সেই হাতিয়ার, যা সব সময় সা¤্রাজ্যের দোসর হয়ে থেকেছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। একযোগে তারা বিকশিত হয়। তাদের অবক্ষয়ও হয় একসঙ্গে। ভাষাই হবে মানুষের মন ও মস্তিষ্কের ওপর রাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের প্রধানতম হাতিয়ার।’ নেব্রিহার এই অভিনবত্বই সম্ভবত পাকিস্তানের নব্য শোষকগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করেছিল। সেই প্রভাব খাটাতে আমাদের পথ দেখিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। রাজপথে সংগ্রামের সূচনা করে মুক্তি ও স্বাধীনতার মহাকাব্য রচনা করেছিলেন রাজনীতির কবি আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিমূলে ন্যস্ত প্রথম শিলাখÐ। ভাষা দিয়ে শোষণ পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যেই দেশ বিভাগের ছয় মাসের মাথায় ইংরেজির সঙ্গে উর্দু জুড়ে ১৯৩৫ সালের ব্রিটিশ আইনের সংশোধনী আনা হলো গণপরিষদে। সরকারি সেই বিলের সংশোধনী আনলেন সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি দাবি করলেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৪ শতাংশ ৪ কোটি ৪০ লাখ নাগরিকের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। তাঁর সেই বেসরকারি সংশোধনী প্রস্তাব সমর্থন করলেন কংগ্রেস সদস্য শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভ‚পেন্দ্র কুমার দত্ত ও হেমহরি বর্মা। প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নাকচ করলেন সে সংশোধনী প্রস্তাব। সরকারি বেতারযন্ত্র এবং সংবাদমাধ্যম গোয়েবলসীয় কায়দায় জোর ডঙ্কা বাজাল, হিন্দুরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবি করে দেশের সংহতি নষ্ট করার প্রয়াস পাচ্ছে। মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভাষাসংগ্রাম দুর্বার হলো। সহ¯্র বছরের দ্ব›দ্ব ভুলে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান এক কাতারে দাঁড়িয়ে ভাষাসংগ্রামকে সেক্যুলার বিপ্লবে রূপান্তরিত করল। শাসকগোষ্ঠী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ৪৯-৫০ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে হাজার হাজার মানুষকে দেশছাড়া করল। প্রাণভয়ে ১০ হাজার ভাষাসংগ্রামী বামপন্থী দেশ ত্যাগ করলেন। ৫২ সালের ২১-২২ ফেব্রæয়ারি শহীদের রক্তে রাঙা হলো বাংলার সবুজ মাটি। ভাষা আন্দোলনের রক্তসিঁড়ি বেয়ে ইতিহাস এগিয়ে গেল একাত্তরের পটভ‚মিতে। রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা করলেন মুক্তি ও স্বাধীনতার মহাকাব্য। ৩০ লাখ হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান অকাতরে প্রাণ দিয়ে লিখল সেক্যুলার বিপ্লবের নতুন ইতিহাস। হানাদাররা ২৫ মার্চ ’৭১ নিরস্ত্র জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কয়েক দিনের ভেতর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নির্মম হত্যার শিকার হলেন।
যারা বলেছিলেন ভাষা আন্দোলন ব্যর্থ হবে, কারণ ইংরেজি বাদ দিলে শিক্ষার মান পড়ে যাবে, তারা আবার বললেন, পাকিস্তান না থাকলে ইসলাম পথ হারাবে। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লুঙ্গি পরা গেঁয়ো মাল্টুষের যুদ্ধ হাতির সঙ্গে ব্যাঙের পাল্টা দেওয়ার মতো। মতের ও পথের সেই যে বিভাজন, তা আজও বহাল আছে। আলোকিত মানুষ আর কুয়োর ব্যাঙদের মনস্তাত্তি¡ক সংঘাত কোনো দিনও শেষ হওয়ার নয়। তবে অন্ধবিশ্বাস টিকিয়ে রাখার প্রবল প্রচেষ্টা বলবৎ হয়েছে। সবারই মন এখন ঘুমের ঘোরে ‘জিহাদ জিহাদ’ করছে। কারণ, মানুষ ধর্মান্ধতা হারিয়ে বিদ্রোহী হলে কতিপয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভ‚ত সম্পদ নিয়ন্ত্রণ হারাবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সম্পদের এই বৈষম্য দূর করতে মরিয়া হয়েছেন। কারণ, এমন ব্যবধান ১৩০ কোটি মানুষের সমাজে শান্তি বিনষ্ট করবে। ইউরোপের অবস্থাও তথৈবচ। চীন, রাশিয়াও সমাজের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তরে সম্পদের বিশাল ব্যবধান কমিয়ে আনতে গলদঘর্ম হচ্ছে।
লেখক : ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

নামটা সাপ্তাহিক ঠিকানার প্রধান সম্পাদক প্রিয় মুহম্মদ ফজলুর রহমানের পরামর্শেই বেছে নিলাম। ঠিকানা পত্রিকার সম্পাদক লাবলু আনসার, বার্তা সম্পাদক মিজানুর রহমানও বলছিল ঠিকানার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটা লেখা দিতে। বলেছিলাম আপনাদের পত্রিকাতে প্রতি সপ্তাহেই আমার লেখা কিছু না কিছু তো যাচ্ছেই, আলাদাভাবে বর্ষপূর্তি নিয়ে কী লিখি। তখনই ফজলু ভাই পত্রিকার সম্পাদকমÐলীর সভাপতি অনুজপ্রতিম এম এম শাহীনের কক্ষ থেকে বেরিয়ে উল্লিখিত শিরোনামে একটা লেখা দিতে বলেন।
সাপ্তাহিক ঠিকানা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের জীবনে আরেক ঠিকানা, নিঃসংকোচে বলা যায়। এই প্রবাসে নিউইয়র্কে কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা ঠিকানার আগেও প্রকাশিত হতো, এখনো হচ্ছে। বলতে গেলে প্রতি সপ্তাহে নিউইয়র্ক থেকে দশের অধিক বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয়। এসবের মধ্যে ‘ঠিকানা’ একটি বিশেষ জায়গা দখল করে নিতে পেরেছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের যাপিত জীবনে। খবরের পরিবেশনা, ধরন ও নানান বিচিত্রতার কারণেও। পাশাপাশি ঠিকানার সঙ্গে যারা আগে জড়িত ছিলেন এবং এখনো যারা আছেন তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পেশাগত মান ও দক্ষতাকেও অগ্রাহ্য করা যাবে না।
সাপ্তাহিক ঠিকানা তার ২৮ বছর অতিক্রম করে ২৯-এ পা দিল। ঠিকানা ২১ ফেব্রæয়ারি ২০১৮-তে একেবারে টগবগে যৌবনে, ঠিকানা তাই যেকোনো যুদ্ধেও যেতে পারে। আপাতত একটা যুদ্ধ তো ঠিকানা করছে। এই শহরের প্রতিটা সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা সম্প্রতি বিনা মূল্যেই পাঠকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সেখানে একমাত্র সাপ্তাহিক ঠিকানাই বিনা পয়সায় পাঠকের কাছে যাচ্ছে না। এটা একরকমের যুদ্ধ চলতি চাহিদার বাজার এবং এর প্রতিযোগিতায়। ১ ডলার দিয়ে কিনতে হয় সাপ্তাহিক ঠিকানা। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ঠিকানার এই সিদ্ধান্ত সঠিক এবং এটাই অক্ষুণœ থাকুক। পয়সা দিয়ে পাঠক যখন ঠিকানা পত্রিকা কিনে পড়ছেন, নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে বৈকি এর ইতিবাচক ভ‚মিকা আছে অভিবাসী পাঠকের কাছে। ঠিকানা কোনো প্রকার গড্ডালিকা স্রোতে না চলুক। এই যুদ্ধ বা লড়াইয়ে প্রমাণিত হবে অভিবাসীদের যাপিত জীবনে সাপ্তাহিক ঠিকানার ভ‚মিকা এবং আবেদনের গুরুত্ব। আজ থেকে ২৮ বছর আগে উত্তর আমেরিকায় সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে ঠিকানার যাত্রা শুরু। এর আগে ১৯৮৮ সালে সম্ভবত ২১ ফেব্রæয়ারিতে সাপ্তাহিক ঠিকানার অন্যতম অধিকর্তা ও মালিক এবং সম্পাদকমÐলীর সভাপতি এম এম শাহীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত একটি সংকলনের নামও ছিল ‘ঠিকানা’। সাপ্তাহিক ঠিকানা নামটি এম এম শাহীনের ব্রেইন চাইল্ড বলা যায়। আমার সুযোগ হয়েছিল সেদিন এম এম শাহীনের সঙ্গে বসে সাপ্তাহিক ঠিকানার শুরু নিয়ে কিছু কথা শোনা ও জানার।
এম এম শাহীন বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন সাংসদও ছিলেন। সিলেটে তার এলাকা কুলাউড়াতে বেশ জনপ্রিয় এক ব্যক্তিত্ব শাহীন। অত্যন্ত বিনয়ী ও ভদ্র এম এম শাহীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে ছিলেন জার্মানিতে। দেশ ছেড়ে প্রবাসী হয়েছেন ১৯৭৮-এ। একসময় জাসদ রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন, পরে সাপ্তাহিক ঠিকানার আত্মপ্রকাশ ঘটান। ১৯৮১-তে চলে আসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। শুরু থেকেই নানা সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাÐে যুক্ত ছিলেন। একসময় তারা কয়েকজন মিলে গঠন করেন বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা। উল্লেখ্য, এই লীগ অব আমেরিকার একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশিত সংকলনের নাম ছিল ‘ঠিকানা’।
শাহীনের কথামতো সব সময় তার ইচ্ছা ছিল অভিবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে স্থানীয় যোগাযোগ বা একটা ঠিকানা হয়ে কাজ করার এবং নিজস্ব কমিউনিটির প্রবাসে বিকাশে এর সহায়ক এবং বন্ধু হিসেবে থাকার। এই মনোভাব থেকেই তার নেতৃত্বে এবং পরিকল্পনায় সাপ্তাহিক ঠিকানার আত্মপ্রকাশ। বিনয়ের সঙ্গেই এম এম শাহীন স্মরণ করেন ঠিকানা পত্রিকার যাত্রাকালে যাদের চিন্তা, পরিশ্রম, পরিকল্পনা এবং সুনেতৃত্বে ঠিকানা তার পথচলা শুরু করে। এদের মধ্যে অন্যতম সাপ্তাহিক বাঙালী পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক কৌশিক আহমেদ এবং একসময়ের বাংলা পত্রিকারও মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক মাহবুবুর রহমানকে। এই পত্রিকার গুণগত মান গঠনে কৌশিক আহমেদের তৎকালীন ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করেন এম এম শাহীন।
’৯০-এর শুরুতে এম এম শাহীন বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে বিএনপি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর দীর্ঘ একটানা লম্বা সময় ঠিকানাকে নেতৃত্ব দেন ও পরিচালনা করেন এম এম শাহীনের ইমিডিয়েট বড় ভাই অনুজপ্রতিম সাঈদ-উর-রব। প্রবাসীদের কাছে ঠিকানাকে আরো ব্যাপক ভ‚মিকা পালনে এবং বিকাশে সাঈদ-উর-রবের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দৃঢ় নেতৃত্ব বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে ঠিকানার জনপ্রিয়তাকে আরো বেশি গ্রহণীয় করে গড়েছেন সাঈদ-উর-রব নিজেও। ঠিকানার গুরুত্ব ও ভ‚মিকা অভিবাসীদের কাছে আজ যে সফলতার চ‚ড়ায় এর পেছনের নেতৃত্ব বিগত এক যুগ পালন করেছে সাঈদ-উর রব।
সময়ের পরিক্রমায় ঠিকানায় যোগ দেন আরেক বিনয়ী, গুণী ও প্রবাসের অনেকের কাছে ভীষণ শ্রদ্ধার মানুষ মুহাম্মদ ফজলুর রহমান। ফজলু ভাই দীর্ঘ একটানা কয়েক বছর এই পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। বর্তমানে এর প্রধান সম্পাদকের আসনে বসে কাজ করছেন। ফজলু ভাইয়ের জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্ব বিশেষ করে নিউইয়র্কের অভিবাসীদের কাছে সাপ্তাহিক ঠিকানার গুরুত্বকে আরেক মাত্রায় সহযোগিতা করছে বলা যায়।
এই অভিবাসে আমাদের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে সংগঠন। নানান কর্মকাÐ, ব্যবসা-বাণিজ্য। রাজনৈতিক উৎসব অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এর কোনোটাতেই অভিবাসী বাংলাদেশিরা অন্য কোনো গোষ্ঠী বা কমিউনিটি থেকে পিছিয়ে নেই। আমাদের নিজেদের দুটি টিভি চ্যানেলও আছে। এগুলোর যত রকম ইতিবাচক বিকাশ ও বৃদ্ধি এর সবকিছুর সঙ্গে সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, যুক্ত আছে। এখানে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচার ও প্রসারে মালিক বা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রচারে সাপ্তাহিক ঠিকানাকে একধরনের স্ট্যাটাস কোর মধ্যেই বিবেচনা করেন। প্রবাসে এখন অভিবাসীদের নানা ব্যক্তিগত প্রতিভার, দক্ষতার বিকাশে ঠিকানা সবার একরকম ডানা যেন। ঠিকানা এদের পাশে থাকে, ছিলও সব সময়। ঠিকানায় বাসা ভাড়ার বিজ্ঞাপনের চাহিদাও বেশি। কারণ পত্রিকাটার পাঠক কমেনি, বাড়ছেই। এটাও তো এক নিদর্শন, ইতিবাচক নিদর্শনই অভিবাসীদের কাছে ঠিকানার জনপ্রিয়তা মেপে দেখার এবং ঠিকানার ভ‚মিকা কতটা ব্যাপক, তা বুঝে নেওয়ায়।
লেখক, কবি, গল্পকার, প্রবন্ধকারÑএই প্রবাসে বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই আছেন। বলতে গেলে তাদের সবার জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতির প্রচারে ঠিকানার কাছে এই গোষ্ঠীর ঋণ অপরিসীম। পত্রপত্রিকা মূলত একটি সমাজ এবং সেই সমাজব্যবস্থার অবকাঠামোর দর্পণ। সাপ্তাহিক ঠিকানাও এই যুক্তরাষ্ট্রে তেমনি অভিবাসীদের যাপিত জীবনের দর্পণ। যুক্তরাষ্ট্রের কেবল একটি রাজ্য নিউইয়র্কেই এর বাজার বা চাহিদা এবং সরবরাহ অন্যান্য সাপ্তাহিক পত্রপত্রিকার মতো সীমিত নয়। শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম প্রান্ত, মধ্য রাজ্য ও উত্তরের অনেক অঙ্গরাজ্যেও ঠিকানা যাচ্ছে। এসব রাজ্যের বাঙালি পাঠকরাও ঠিকানা পড়েন।
অভিবাসীদের যাপিত জীবনে এর ভ‚মিকা না থাকলে এতটা পথ ও সময় সাপ্তাহিক ঠিকানা সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করতে পারত না।
সব পাঠকের চাওয়া বা সন্তুষ্টি কোনো প্রচারমাধ্যম বা পত্রিকা পূরণ করতে পারে না, ঠিকানাও এই না পারার ঊর্ধ্বে নয়। কোনো কোনো পাঠক বলেন আমি ঠিকানা পড়ি না, কেউ বলেন ঠিকানাতেও ইয়েলো জার্নালিজম চলে! হয়তোবা কখনো কখনো এই কথা সত্যিও হয়। পাঠকের প্রত্যাশা পূরণে ঠিকানাকে আরেকটু পরিচ্ছন্ন বা চুজি হলে ভালো হবে। যেমন কারো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিজ্ঞাপন বা কোনো শুভেচ্ছাবাণী বা দলীয় রাজনীতির খবরাখবর পরিবেশনে আরেকটু চিন্তাশীল ও ক‚টনীতিক হওয়া। হ্যাঁ এটা ঠিক, প্রচারে অন্যকে সতর্ক বা নিজেকেও শুধরানোরও সুযোগ থাকতে পারে; কিন্তু পাশাপাশি এতে নিজেদের কমিউনিটির নেতিবাচক চিত্রটাও কখনো কখনো ব্যক্তির একেবারে ব্যক্তিগত ইমেজকেও ক্ষুণœ করে। আমরা মানুষ, ফেরেশতা তো নই। তাই সবার দোষ-ত্রæটিকে অভিবাসী সমাজে প্রকটভাবে প্রকাশ করে দেওয়ার ব্যাপারে আরেকটু কৌশলী হলে ভালো। আরেকটি বিষয় কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতেও পারে। এখানে কবিতা, প্রবন্ধ, বিশ্লেষণ বা আলোচনায় প্রবাসীদের লেখাকে সব সময় অগ্রাধিকারে রাখা।
পত্রিকার চিঠিপত্রের পাতাকে আরেকটু বৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় করা যায় কি না, এটাও ভাবা যেতে পারে।
পত্রিকার ছাপার মান এবং এর গুরুত্বে সাপ্তাহিক ঠিকানায় একধরনের উপেক্ষা বা কম যতœবান বলে মনে হয়।
এসবের মানোন্নয়নে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং এর জোগানের একটা ঝুঁকি ও চাহিদা তো অবশ্যই আছে। তাই আমরা যারা ঠিকানার আরো প্রসার ও বিকাশে আশাবাদী, তারা যেন ঠিকানার পৃষ্ঠপোষকতায় কার্পণ্য না করি, দ্বিধা না করি। ঠিকানা এখন ঠিকানার ভেতরে যে আট-দশ জন পরিশ্রম করেন তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ঠিকানা এই প্রবাসে অভিবাসীদের আরেক ঘর। এর যতœ নিতে আমরা সবাই যেন আরেকটু যতœবান হই।
অভিবাসীদের যাপিত জীবনের মহাসড়কে সাপ্তাহিক ঠিকানা আমাদের জীবনবোধের উইন্টারে কমফোর্টার, সামারে টি-শার্ট।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক