অভিবাসীর যাপিত জীবন (২৬)

মাহমুদ রেজা চৌধুরী

দুপুরের দিকে একটা কাজে গিয়েছিলাম কুইন্সের ফরেস্ট হিল এলাকায়। জায়গাটা মূলত ইহুদিদের দাপটের এলাকা। গাড়ি পার্কিং বড় শহরের সর্বত্রই একই রকমের সমস্যা। তবুও একটা পার্কিং পেলাম। দু’ঘণ্টার মিটার পার্কিং, মানে ২ ডলার দিয়ে দু’ঘণ্টা রাখা যায়। ‘ম্যান্স ওয়্যার’ রিটেল চেইনের একটা দোকান আছে, ওখানের অস্টিন স্ট্রীটে। শুধুমাত্র পুরুষদের পোশাকের দোকান, সেখানে ঢুকলাম। সামারের জন্য দুটা হাফ স্লিপ শার্ট কিনলাম। কাপড়-চোপড়ের দাম এখন বেশ উচ্চমাত্রায় বলা যায়। যে ক্যাজুয়াল শার্টের দাম ছিলো ২৫-৩০ ডলার, সেগুলো এখন ৬০ ডলারের নিচেতো নাই, বলা যায়। কি আর করা, পছন্দ হলো তাই কিনে নিলাম। শপিংয়েও আমার ধৈর্য কম। এ দোকান, সেই দোকান করিনা।
সাধারণত যা কিছু কিনি, নির্দিষ্ট দোকানে যাই, চোখের সামনে যেটা ভালো লাগে নিয়ে নিই। ঐ দোকান থেকে বের হয়ে একই ব্লকেই মার্থার বেকারি, সাথে কফি শপ। ওখানে বসে একটা হট চকলেট নিলাম। ওয়েটার ভদ্রমহিলা বেশ বিনয়ী, হাসিখুশি ছিলো। তাই পাঁচ টাকার হট চকলেট খেয়ে মহিলাকে সমানই টিপ্স পে করলাম। পাশে বসা ছিল এলোমেলো সাদা পাকা চুলের এক ভদ্রলোক। হাতে গিটার নিয়ে কফি খেতে খেতে কি যেন গুণ গুণ করে গাচ্ছিল। যেচেই আলাপ করলাম। বললো, সে আফ্রিকার একটা লোকসঙ্গীত তুলছে গিটারে। আগামী সপ্তাহে এর উপরে কর্নসাট আছে। সে ওখানে গান গাইবে।
কথায়, কথায় জানতে চাইলো আমার দেশ কোথায়। বাংলাদেশ বলায় সে বললো বাংলাদেশে সে-নাকি গিয়েছে বেশ কেয়কবার কোন একটা এনজিও’র কাজে। আরো বলল বাংলাদেশের লোক সঙ্গীতে তার বেশ আগ্রহ, সেটা নাকি অনেক বেশি এলাকার গণমানুষের যাপিত জীবনের সাথে মিলে যায় বলে তার মনে হয়েছে। সুন্দর অবজারভিশন। জানতে চাইলো আমি কিছু জানি নাকি বাংলার লোক সঙ্গীত বিষয়ে। বলেছি না আমি এই জগতের মানুষ না। তবে দেশ যেহেতু আমারও তাই কিছু এর ভাষা, ভাষা বলতে পারবো। সে উৎসাহ দেখিয়ে আমার জন্য ‘কফি’ অর্ডার করে বললো -বলো শুনবো।
বললাম, এই গানের ঐতিহাসিক সময়কাল বলতে পারছি না, তবে পড়েছি এটার যাত্রা অনেক পুরনোকালের। ইতিহাসে যুগটাকে বৈদিক যুগ বলে ইতিহাসবিদরাও। এই সঙ্গীতকে জানাতে হলে ইন্ডিয়ান বা ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস বা এর প্রাচীন সুর এবং কৃষ্টিবোধও জানতে হয়।
আমাদের লোকসঙ্গীতকে অনেকটা বৃহত্তর ভারতীয় গ্রামীন জীবন সংস্কৃতির সাথে মিলিয়েও দেখতে পারো। এর সাথে কোথাও কোথাও পশ্চিমের গ্রামের কিছু মিল পেলেও ভারতীয় গ্রামবোধের কিন্তু নিজস্ব ও আলাদা একটা দর্শন আছে। বললাম, তোমরা বলতে পশ্চিমে যেটাকে আমরা ফোক মিউজিক বলে জানি, আমাদের অঞ্চলে এটাই লোকসঙ্গীত। যার অধিকাংশ সংগৃহীত।
এর একটি প্রধান দিক, এর কথার সরলতা এবং এর সুরের সাবলীলতা গ্রাম থেকে শহরের মানুষকেও ছুঁয়ে যায় তাড়াতাড়ি। ঐ ভদ্রলোক বলল, তুমি জানো কি না জানি না, আমেরিকার লোকসঙ্গীতও কিন্তু অনেকটাই তেমন। বললাম, আসলে আফ্রিকা বলো, বা আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা পূর্ব ইউরোপ, সব জায়গায় লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য কম-বেশি একই রকম- কথা এবং সুরের দিক থেকে। মূলত গ্রামের সঙ্গীত বা আমরা যাকে বলি পল্লীগীতি, এর আরেক নামই লোকসঙ্গীত। কালের পরিক্রমাতে, সম্ভবত ১৯৫৪-তে, অনেক মতবিনিময়ের পরে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত পরিষদ বা International Folk Music Council Folk Song-এর বাংলা নাম হয় লোকসঙ্গীত। এই লোকসঙ্গীত মূলত তিনটি বিষয়কে টার্গেট করে এর ভিত্তির সূচনা, বললাম তুমি জানো তো। বলল, সে জানে না। বললাম, লোকসঙ্গীতের সংজ্ঞা নির্বাচনে তিনটি বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়- ঐতিহ্য, উদ্ভাবন ও নির্বাচন। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Continuity, Variation Ges Selection। বলল ব্যাখ্যা দাও।
যেমন Continuity এর সাথে ঐতিহ্য বা Heritage রিলেটেড। Variation বলতে বৈচিত্র্যের মূল ব্যাপার Selection-এর সাথে গ্রামের মানুষের একটা নাড়ীর টানের ব্যাপারকে বোঝায়। আমাদের দেশের লোকসঙ্গীতের ধারাগুলো, যেমন- পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ বাংলা এই কয়টি ধারা আছে। তাই তুমি যখন আমাদের লোকসঙ্গীত শুনবে, এই কয়টি এলাকার গ্রামের মানুষের ঐতিহ্য এবং তার ধারাবাহিকতা পাবে।
লোকসঙ্গীতের সুরের ক্ষেত্রে মনে হয় বিশ্বের সর্বত্রই আমরা কোথাও না কোথাও একই সূত্রে বাঁধা। তাই তুমি একটু লক্ষ্য করলে বুঝবে, চীনের লোকসঙ্গীত আবার মধ্যপ্রাচ্যের লোকসঙ্গীত বা পূর্ব বা পশ্চিমের লোকসঙ্গীতের মূল সুর অভিন্ন বলে কানে বাজে, হৃদয়ে টানে।
যা হোক, এ নিয়েই দুজন ভিনদেশি একে অপরের কাছে এক ভাবনার বিষয় নিয়ে বিকেলটা কাটালাম। আরেকটা দিনও কাটল। এই অভিবাসীদের দেশে আমরা প্রায় সবাই অভিবাসীই। এমন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মি. ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তার আদিবাসীরা পশ্চিম ইউরোপের। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে এক একটা ‘গ্রাম’ আছে, যার লোক সঙ্গীতের সুর ও যেন অভিন্ন লাগে।
বাইরে থেকে আমরা বুঝি না, কার ভেতরে কি এবং কতটা অভিন্ন প্রকৃতি আছে। যেমন- আলোচিত মানুষটাকে প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল ড্রাগ এডিকটেড কি না! সে ড্রাগ এডিকটেড, তবে সেই ড্রাগটা অপরকে জানবার, নিজেকে জানাবার নেশা! অভিবাসীর যাপিত জীবন যাপনের এটা এক বৈশিষ্ট্য বটে।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক।
৪ মে, ২০১৮।
ই-মেইল: [email protected]