অভিবাসী জীবনে ট্রাম্পের শাসন

আধুনিক যুগের রাজা-বাদশাহদের নিয়ে তেমন মুখরোচক বা রোমাঞ্চকর গল্প-কাহিনি তৈরি হয় না। যেমন আগের আমলে হতো। আরব্য রজনীর মতো রূপকথার গল্পে তো বটেই, ইতিহাসে ধারণকৃত রাজা-বাদশাহ সম্পর্কেও অনেক গল্প লোকমুখে শুনে শুনে, গল্পের বই পড়ে পড়ে জানা যেত। এসব চরিত্রের মধ্যে যেমন প্রজাপালক উদার, হৃদয়বান রাজা-বাদশাহ ছিলেন, তেমনি প্রজা শাসক, নির্মম-নিষ্ঠুর, অত্যাচারী রাজা-বাদশাহও ছিলেন। বাদশাহ হারুন অর রশিদ, রানি ক্লিওপেট্রা, স¤্রাট আকবর, আওরঙ্গজেব, হিটলার, মুসোলিনি, চিয়াংকাইশেকÑহরেক নামের চরিত্রই মনে পড়বে অনেকের।
আধুনিক যুগে রাজা-বাদশাহর শাসন নেই। আরব বিশ্বে সৌদি আরবসহ আফ্রিকার দু-একটি দেশ অবশ্য ব্যতিক্রম। তারা আধুনিক সভ্যতার বিজ্ঞানের অবদানে বিদ্যুতের আলো ভোগ করলেও আঁধারেই পড়ে আছে। আধুনিক রাষ্ট্র শাসনে রাজা-বাদশাহর স্থলে এসেছে গণতন্ত্র, শাসক নামের প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী। নাম-চেহারা বদলালেও, প্রজারা নাগরিক নামধারী হলেও তাদের রাষ্ট্রের মালিক এবং সাম্য ও গণতন্ত্রের নামে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলেও আসলে প্রজাকুলের প্রতি শাসককুলের দৃষ্টিভঙ্গির তেমন পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে করা যায় না। এখনো শোষণ আছে। সাম্যের নামে বৈষম্য আছে। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র আছে। প্রজাতন্ত্রের নামে রাজতন্ত্রও আছে।
বরং আজকের এই আধুনিক যুগেও এমন শাসক আছেন, যাঁরা সাধারণ নাগরিকের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে প্রথমেই খড়্গহস্ত হন ওইসব নাগরিকের বিরুদ্ধেই। এমনকি রাষ্ট্রের জন্ম বা আবির্ভাব ঘটে যেসব উপাদান, আদর্শ ও চেতনাকে ভিত্তি করে, তারা সেসব আদর্শ ও চেতনাকেই পাল্টে দেওয়ার ব্যবস্থা নেন। তাদের শাসনে নাগরিক জীবনের সকল স্বস্তির অবসান ঘটে। ভয়ে-আতঙ্কে তাদের জীবন অস্থির হয়ে ওঠে। কখন কী ঘটে যায়Ñএই দুর্ভাবনায় তারা সময় পার করে। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন স্তব্ধ হয়ে যায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার পরিচালনা দুঃসহ হয়ে ওঠে। মানুষের সুখস্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। হতাশা নেমে আসে।
যারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, বিশেষ করে যারা বসবাসের বৈধ কাগজপত্র ছাড়া এ দেশে প্রবাসী জীবনযাপন করছেন, তারা এখন এই পরিস্থিতির শিকার। নিজেদের দেশ ছেড়ে, মাটি ও স্বজন ছেড়ে জীবনকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে যারা এ দেশে এসে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন একটু প্রতিষ্ঠা পাওয়ার, সন্তানসন্ততিদের এ দেশে টিকে থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলার আশায়, তারা আজ চরমভাবে আশাভঙ্গের শিকার। এ দেশের অগ্রগতিতে, সমৃদ্ধি অর্জনে সব রকম অবদান রেখে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের ভূমিকা, অবদান, অস্তিত্ব সবকিছু অস্বীকার করার একটি মরিয়া অভিসন্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে।
এ প্রচেষ্টা বহুকাল থেকে ভেতরে ভেতরে থাকলেও তা দৃশ্যমান এবং প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে ধনকুবের ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর। তিনি বিশেষ পরাক্রমশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েই যুদ্ধ ঘোষণা করেন, বিশেষ করে মুসলমান ও এ দেশে বসবাসকারী ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটির বিরুদ্ধে। আসলে অভিজ্ঞ মহলের মতে, শুধু ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটি নয়, একটি বিশেষ ধনিক-বণিক গোষ্ঠী বাদে প্রায় সব আমেরিকানকেই একটি দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালির শিকার এমনটা আর কোনো প্রেসিডেন্টের আমলে কাউকে হতে হয়নি। এ জন্য ট্রাম্প নিজেও প্রতিনিয়ত কম সমালোচিত হচ্ছেন না। নানা কর্মে ঘৃণা এবং ধিক্কারও জুটছে তার কপালে, কিন্তু কোনো কিছুই তাকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হচ্ছে না।
এর আগে অনেক প্রেসিডেন্টের শাসনকালেই, যাদের বৈধ কাগজপত্র ছিল না এমন অনেকে, দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকলেও বর্তমান আমলের মতো প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বাস করতে হয়নি। এখন শুধু অবৈধ নয়, গ্রিনকার্ডধারীদেরও ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছেÑকখন না জানি কী হয়! ‘গ্রিনকার্ডধারীরাও রেহাই পাচ্ছে না’ শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয়েছে ঠিকানার ২৬ জানুয়ারি সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায়। সেই খবরে দেখা যায় ডাক্তার লুকাজ আর নাইস ২৬ বছর আগে মাত্র ১৭ বছর বয়সে একটি অপরাধ করেছিলেন। এরপর গত ২৬ বছরে লুকাজ আর নাইস ডাক্তারি পাস করে এ দেশে মানবসেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। মাত্র ৫ বছর বয়সে আসা ডা. লুকাজ ২৬ বছর পূর্বে করা অপরাধের জন্য গ্রেফতার হন গত ১৬ জানুয়ারি, মিশিগানে। তাকে পোল্যান্ডে বহিষ্কার করা হচ্ছে। পরিবারের কারও সঙ্গে তিনি সাক্ষাতের অনুমতিও পাচ্ছেন না।
বিষয়টি শুধু লুকাজ আর নাইসেই সীমাবদ্ধ নয়। হাজার হাজার মানুষকে ট্রাম্পের এক বছরের শাসনেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিপোর্ট করা হয়েছে তুচ্ছ সব কারণে। যেসব স্টেট কাগজপত্রহীন ইমিগ্র্যান্টদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছিল, সেসব স্টেটের মানুষও ট্রাম্প প্রশাসনের হাত থেকে রেহাই পাননি। অনেকে পরিবার থেকে, সন্তান-সন্ততি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। চারদিকে অসন্তোষ, ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ-প্রতিবাদ গড়ে উঠছে। নাগরিক সমাজে একটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, যা আমেরিকার মতো একটি অভিবাসীনির্ভর সমাজের জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। এ দেশের সংবিধানে ইমিগ্র্যান্টদের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় আড়াই শ বছর ধরে এ দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে ইমিগ্র্যান্টরা যে ভূমিকা পালন করে আসছে, তার স্বীকৃতিস্বরূপ ইমিগ্র্যান্টরা যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে, তাকে ট্রাম্প প্রশাসনের অস্বীকার করার প্রবণতার পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। যে কারণে প্রায় সর্বমহলেই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ধূমায়িত হয়ে উঠছে।
এ অবস্থা থেকে সবাই যার যার মতো করে মুক্তির পথ খুঁজছে। কেউ কেউ আদালতের সাহায্য নিচ্ছে। কোনো কোনো কমিউনিটি ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ রকম পরিস্থিতিতে কী করণীয়, সেসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করছে। বিভিন্ন ল ফার্মের পরামর্শ গ্রহণ করা হচ্ছে এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো পথ খুঁজে বের করার উপায় নিয়ে। বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও নানা তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, যেখানে বাধা থাকে, সেখানে সে বাধা অতিক্রম করার উপায়ও থাকে। পরাধীনতাই মুক্তির উপায় বের করার সন্ধান দেয়। পৃথিবী যেমন অগ্রসর হয়েছে, বিবর্তনের লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তেমনি সব বিপদ, সংকট দুর্যোগ-দুর্ভাবনাতেও লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ বের করে নিতে হয়। সাহস হারালে চলবে না। এ জন্য চাই ঐক্যবদ্ধতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা।
আমরা আশা করব, সাহস না হারিয়ে ঐক্যবদ্ধ থেকে চলমান পরিস্থিতির মোকাবিলা করা হলে লড়াকু মানুষের মুক্তির পথ একটা বের হয়ে আসবেই। অভিবাসী জীবনটাই হচ্ছে সংগ্রামের। ‘মেঘ দেখে তুই করিস না ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ আমরা সেই সূর্যের প্রত্যাশায়। জয় মানুষেরই হয় অবশেষে।