অভিযোগ করার আগে আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখুন

ঠিকানার সাথে অন্তরঙ্গ সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ক্ষমতার মোহে অথবা চেয়ার হারানোর ভয়ে হয়তো কেউ দেশের বাইরে আসতে অথবা দীর্ঘদিন অবস্থান করতে চাননি। আমার মধ্যে সে ধরনের মোহ অথবা ভীতি নেই। কেননা জনগণ আমাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাদের জন্য কাজ করলে কেউ আমাকে চেয়ার থেকে সরাতে পারবে না। শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা শুধু একটা দেশের রাষ্ট্রপতিকেই হত্যা করেনি তারা শিশু ও নারী হত্যা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এদের বিচার হওয়া উচিত। বিশ্বের কোন দেশেই এদের স্থান দেয়া উচিত নয়। যে দেশ স্থান দেবে সে দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশংকা থাকবে। সাপ্তাহিক ঠিকানাকে দেয়া এক অন্তরঙ্গ সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনা এ কথা বলেছেন। ফ্লোরিডার মায়ামী সমুদ্রের সৌন্দর্যে লালিত এর বাংলাদেশের মত প্রাকৃতিক বৈভবে পরিবেষ্টিত সিটির ফোর্টলডারডেলের নিরিবিলি পল্লীর হার্ভার কোভের চার নম্বর বিল্ডিংয়ের ২০২ নং এপার্টমেন্ট দোতলায় স্থান করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অস্থায়ী কার্যালয়। একটি ফোন আর ফ্যাক্স। একটি টেবিল। দর্শনার্থীদের বসার জন্য সোফা। পাশে সেই বাংলাদেশী কায়দায় চা-কফির কাপ চুলা আর চানাচুর -বিস্কুট। ছোট একটি কক্ষে বঙ্গবন্ধুর ছবি। এই কক্ষে ছিমছাম টেবিল। তেমন কোন ফাইল নেই। একটি সেক্টর কর্পোরেশনের ৬ জন কর্মকর্তাকে অবৈধভাবে বরখাস্তের তথ্য সংবলিত একটি ফাইল পেপার কাটিংসহ পেশ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সন্ধ্যা ৬ টায় রাজশাহী সিল্ক শাড়ি পরিহিত মাথায় ঘোমটা দিয়ে এলেন সেই কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শাশ্বত বাংলার অবয়ব ছড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই আগমন ছিল খুবই সাদামাটা। দিনটি ছিল ৩ আগস্ট, রোববার। আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল প্রোগ্রামটি। সে অনুযায়ী এলেন ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কে এম শিহাব উদ্দিন। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতকার শুরুর আগে ব্যক্তিগত কুশলাদি চলে কিছুক্ষণ। ঠিকানাকে ইতিপূর্বে প্রদত্ত সাক্ষাতকারের কথাও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। এরপর তিনিই তাগিদ দেন আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাতকার শুরুর জন্য। কেননা তাড়া ছিল তার। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাকে পৌঁছতে হবে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের একটি নৈশভোজে। ৬টা ৫ মিনিটে শুরু সাক্ষাতকারটি। শেষ হয় ২৫ মিনিটে। এ সময় তাকে খুবই প্রাণখোলা মনে হয়েছে। একটা বিষয় ক্ষণে ক্ষণেই তার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। আর তা হচেছ বাংলাদেশের সর্বশেষ খবর জানার আগ্রহ। মাতৃত্বের দায় যেমন অপরিসীম-নেতৃত্বের দায়কেও তিনি কম গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তবে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে একজন মহিলা হিসেবে তিনি সারা জনমের জন্য মা। নেত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রিত্ব স্থায়ী নয়।
বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকাকালীন বাক্যালাপ আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে অনেক বৈসাদৃশ্য মনে হয়েছে। প্রশ্নের উত্তরে তিনি ছিলেন খুবই সাবধানী আর সংযত। তিনি তার সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তির বদলে জনগণের মৌলিক কল্যাণের আর দেশের সুদূর প্রবাসী মঙ্গলের কী করছেন অথবা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা বেশি করে বলেছেন। নিজে ছাত্র রাজনীতি করেছেন। নেত্রী ছিলেন। এদসত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন যদি ছাত্র রাজনীতি বন্ধে অথবা এ ব্যাপারে সামগ্রিক কল্যাণকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সেটাতেও তিনি সহযোগিতা দেবেন বলে জানালেন।
সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে কথা বলতে বলতেই তার ব্যক্তিগত সহকারী কক্ষে প্রবেশ করে নৈশভোজে যাবার সময় হয়েছে বলে তাগিদ দেন। এ জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশীদের আকাঙ্খার পরিপূরক অনেক প্রশ্নই সে সময় উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর এই সাক্ষাতকারটি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, দেশের বাইরে কোন বাংলা সংবাদপত্রের সাথে প্রধানমন্ত্রী হবার পর এটাই তার প্রথম সাক্ষাতকার। এছাড়া বাংলাদেশে রাষ্ট্র প্রধান অথবা সরকার প্রধানের দায়িত্বে থেকে আর কেউ এই ধরনের সফরে দেশের বাইরে আসেনি ইতিপূর্বে।
অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার এই অন্তরঙ্গ সাক্ষাতকাররের বিবরণ এখানে হুবহু প্রকাশ করা হলো।
ঠিকানাঃ কেমন আছেন?
শেখ হাসিনাঃ আছি মোটামুটি।
ঠিকানাঃ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নয়া অতিথি আদরের নাতনীকে পেয়ে কেমন লাগছে।
শেখ হাসিনাঃ যখন নানা হবেন তখন বুঝতে পারবেন।
ঠিকানাঃ আপনার সফর কেমন হলো?
শেখ হাসিনাঃ এটাতো ঠিক সফর নয়। মেয়ে অসুস্থ। তাকে দেখতে এসেছি। মেয়ের পাশে দাঁড়াতে এসেছি। আমার মেয়ে জীবনে প্রথম মা হতে যাচ্ছিল। কাজেই সেই অবস্থায়-আমি মা হিসেবে তার পাশে থাকার জন্য এসেছি।
ঠিকানাঃ আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এবারই প্রথম একটানা ২০ দিন দেশের বাইরে কাটালেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রাইভেট সফরের ঘটনাও এবারই প্রথম -এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
শেখ হাসিনাঃ এর মধ্যে আবার প্রতিক্রিয়া কি আছে। তবে আমার পূর্বে যারা ক্ষমতায় এসছেন তাদের ক্ষমতার চেয়ারের প্রতি এতবেশী মোহ, এতবেশী মায়া যে চেযার থেকে বেশি দূরে থাকা বা চেয়ার ছেড়ে যাচ্ছি- এ কথাটা বলতেই বোধ হয় একটা ভীতি তাদের মধ্যে কাজ করেছে। ক্ষমতা হারাবার অথবা চেয়ার ছাড়ার বা অন্য কিছু। আমার ভিতরে সেই সমস্ত দৈন্য নেই বলেই আমি সিদ্ধান্ত নিতেও পেরেছি এবং ২০ দিন বাইরে থাকতে পেরেছি। তাছাড়া এই আধুনিক যুগে তো পৃথিবীটা ছোট। যে কোন যোগাযোগ করা…. আপনারাতো দেখতেই পাচ্ছেন আমার এটা অফিস এবং আমি রীতিমত এখানে কাজ করছি। সব সময়ই দেশের সাথে যোগাযোগ আছে। সব সময়ই দেশের সাথে যোগাযোগ আছে। খুব দূরে মনে হলেও আমি আমর কাজ থেকে দূরে থাকিনি। হয়তো ফিজিক্যালী আমি সেখানে নেই, কিন্তু কাজ থেকে আমি দূরে থাকিনি। আমি এদিকে মা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করেছি, নানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছি আবার দেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার দায়িত্ব আমি পালন করে যাচ্ছি।
ঠিকানাঃ বিদেশে পলাতক বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের গ্রেফতারে কার্যকরী কোন উদ্যোগ নিয়েছে কি?
শেখ হাসিনাঃ বিচার কাজ চলছে। এটা কোর্টের দায়িত্ব। ীটষ ষধফফর্ টপণ র্ধ্র মষভ উমর্লর. তবে তারা খুনী। এই খুনীরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। শুধু মানাবিধকার লঙ্ঘন নয়- জঘন্যতম অপরাধ। তারা একটা দেশের রাষ্ট্রপতিকেই শুধু হত্যা করেনি তারা শিশু হত্যাকারী, নারী হত্যাকারী। মানুষ হত্যাকারী। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। বিচার হওয়া উচিত। কোন দেশেই এদের স্থান দেয়া উচিত নয়। যে দেশ তাদের স্থান দেবে সে দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হবার আশঙ্কা থাকবে। সে দেশের জন্যই একটা আশংকার কারণ হবে। ওদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা আছে।
ঠিকানাঃ আপনার পুনরায় উপজেলা পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছেন। সেখানে বিচার বিভাগ থাকবে কি?
শেখ হাসিনাঃ আপনি জানেন, আইন সংস্কারে কমিশন করেছি। ল’ ইনস্টিটিউটও করেছি। এছাড়া লোকাল গভর্নমেন্টের কমিশনও করা হয়েছে। তারা সুপারিশ দেবে। সেই সুপারিশমালা দেখার জন্য আমরা আলাদা একটা কমিটিও করেছি। তারাই দেখছেন। কী থাকবে, না থাকবে সেটা তারাই নির্ধারণ করবেন।
ঠিকানাঃ বিচার বিভাগ পৃথিকীকরণ করার ব্যাপারে ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করেছেন কিনা।
শেখ হাসিনাঃ বিচার বিভাগ পৃথক করার জন্য আমরা একটা বিল তৈরি করেছিলাম এবং এ ব্যাপারে একটি কমিশনও গঠন করেছিলাম। বর্তমানে বিষয়টি হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। কাজেই এটা নিয়ে আমাদের আর কিছু করণীয় নেই।
ঠিকানাঃ রেডিও টেলিভিশনে স্বায়ত্ব শাসন প্রদানের অগ্রগতি কদ্দুর?
শেখ হাসিনাঃ আমরা কমিশন গঠন করেছি। কমিশন ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড গিয়েছিল। এরপর পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ভারত বিভিন্ন দেশে গিয়েছে। একটা সুপারিশমালা তারা দিয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে সুষ্ঠু নীতিমালা আমরা করবো। তাছাড়া আমরা রেডিও টেলিভিশন -আপনারা জানেন, এখনতো পার্লামেন্টের প্রতিটি স্পীস রেডিও টিভিতে প্রচার করা হচ্ছে। সবাইকে সমান সুযোগ দিচ্ছি। এমনকি বিরোধী দল তাদেরকেও সমান সুযোগ দিচ্ছি। তাদের সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। যদিও টিভি ক্যামেরা কভারেজের জন্য গেলে তারা (বিরোধী দল) পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়। আর তার পরে বলে টিভিতে আমাদের (বিএনপি) ছবি দেখায় না। তো-এসমস্ত চোগলখুরীপনা- এ গুলি আমি পছন্দ করি না।
ঠিকানাঃ ছাত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে কিছু বলবেন কি?
শেখ হাসিনাঃ ছাত্র রাজনীতি করেই কিন্তু আমি রাজনীতিতে এসেছি। আমি একটা কলেজের ভিপি ছিলাম। তবে ছাত্র রাজনীতি যদি টেন্ডার দখল, অস্ত্রবাজী আর সন্ত্রাস হয় -এই রাজনীতিতে আমি বিশ্বাসী নই। এগুলো আমি ঘৃণা করি। আমি বরাবরই এসবের বিরোধী। এবং এর বিরুদ্ধে আমি অনেক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছি।
ঠিকানাঃ কিন্তু সম্প্রতি ঢাকার ইডেন কলেজে সংঘর্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল দখলের যে সব ঘটনা-
শেখ হাসিনাঃ হ্যাঁ, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ’৯১ সালের নির্বাচনে ভিপি হয়ে ’৯৭ সাল পর্যন্ত কীভাবে ক্ষমতায় থাকে? আমি নিজেও কলেজে ভিপি ছিলাম -আমরাতো থাকতে পারিনি। এই অনিয়মগুলো যারা সৃষ্টি করে গেছে- সেই অনিয়মের ফল এটা। আপনি বলতে পারেন যে ছাত্র না অথচ কলেজের ভিপি। এটা কখনও হতে পারে? একটা কলেজে ইলেকশন করতে গেলে তার পূর্বশর্তই হচ্ছে-প্রার্থীকে কলেজের ছাত্র হতে হবে। কেউ ছাত্র না অথচ তারাই নাকি এখন ভিপি হচ্ছে। এবং তাদের দখলেই এটাা থাকতে হবে এবং হলগুলোও দখলে রাখতে হবে। শুধু দখল নয়- অবাক লাগে, এদের বিরুদ্ধে অনেক অনিয়ম-দুর্নীতিও ঢুকে গেছে। যেটা উচিৎ না। তবে যাদের রাজনীতি ছাত্রদের হাতে অস্ত্র দিয়ে, অস্ত্রধারীদের উপর নির্ভরশীল তারাই এগুলোর মদদ দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি কিন্তু ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে-তাদের উপর নির্ভরশীলতা না।
ঠিকানাঃ বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকির ফলে প্রশাসন সন্ত্রাস দমনে সক্রিয় হচ্ছে না বলে কানাঘুষা রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানাবেন কি?
শেখ হাসিনাঃ হুমকি দিচ্ছে। এটাকে তারা রাজনৈতিক হয়রানী বলে দেখাবার চেষ্টা করছে। সন্ত্রাস দূর করার জন্য যত পদক্ষেপই নিচ্ছি তাদের (বিএনপি) কো-অপারেশন পাচ্ছি না। তবুও আমি বলবো -আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। এবং বিরোধী দল যদি সন্ত্রাসীদের মদদ না দিত তারা (বিরোধী দল) তাদের ভূমিকা না রাখতো তাহলে এ ব্যাপারে আরো দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া যেত।
ঠিকানাঃ জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও ঐক্যমতের সরকার যে প্রত্যয় নিয়ে গঠন করেছেন -গত এক বছরে তার কতোটুকু সফল হয়েছে?
শেখ হাসিনাঃ আমাদের দেশে একটা টেন্ডেন্সী -একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল ক্ষমতা দখল করার। যে যেভাবে পারো খুন করে হউক, হত্যা করে হউক, ষড়যন্ত্র করে হউক, যেভাবেই হউক ক্ষমতটা দখল করে নেয়া। আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া এবং গণতন্ত্র যে শুধু ভোগ নয় ত্যাগ, গণতন্ত্রের মাধ্যমে সহনশীলতা দেখানো এবং গণতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে সমঝোতামূলক মনোভাব নিয়ে চলা, উমবযরমবধ্রণ করা -এগুলো গণতন্ত্রের মূল কথা। আমি সেটাই প্রমাণ করতে চেয়েছি। সে জন্যই আমি ঐক্যমতের ডাক দিয়েছিলাম। এই কারণে যে আমার দেশের মানুষ দরিদ্র। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী আমরা উদযাপন করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে দারিদ্র্য দূর করার জন্য জাতির জনক দেশ স্বাধীন করেছিলেন, যে কাজ তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি। তাকে হত্যা করে দুখী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা ছিল-সেই সম্ভাবনাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে। অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য ঐক্যমতের সরকার গঠন করেছি। আমরা অন্তত সবাইকে নিয়ে মিলে মিশে এক হয়ে জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করবো। দুর্ভাগ্য, প্রধান বিরোধী দল-বিএনপি সে ডাকে সাড়া দেয়নি। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন যে বাংলাদেশের ইতিহাসে যারাই ক্ষমতায় (যেভাবেই যাক) গিয়েছে, সরকার গঠন করেছে- তারা নিয়মে পরিণত করেছিল যে, আগের সরকারের মন্ত্রী -টন্ত্রি সবাইকে এ্যারেস্ট করো, গ্রেফতার করো, হয়রানী করো, জেলে ভরো। জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসেছে- আওয়ামী লীগের সমস্ত নেতাকর্মী জেলে। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এলে বিএনপির নেতা কর্মী সব জেলে যায়। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছে- জাতীয় পার্টির নেতকর্মী সব জেলে। একমাত্র ব্যতিক্রম আমরা করেছি। আমরা কাউকে গ্রেফতার করিনি রাজনৈতিক কারণে। বরঞ্চ সহযোগিতার জন্য হাত প্রসারিত করেছিলাম। তাদের ডেকেছি। একটাই কারণ সেটা হচ্ছে, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। আমরা অনেকাংশে অবশ্যই সফল, কারণ আমাদের ডাকে অনেকেই সাড়া দিয়েছেন। তবে সকলে দেয়নি। বিরোধী দল যদি সাড়া দিত তবে আমরা হয়তো আরো দ্রত কাজ করতে পারতাম। ৪৫ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। সেখানে বাম্পার ক্রপ হয়েছে। ৫.৭ ভাগ প্রবৃদ্ধির হার আমরা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। কোন ইস্যু পাচ্ছে না। নিজেরা আর্টিফিশিয়্যালী ইস্যু তৈরি করে সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। এই ইস্যুর খোঁজে ছোটাছুটি না করে -বরং তারা যদি দেশের জন্য দশের কল্যাণের জন্য গঠনমূলক কাজ করতো- তাহলে অন্ততঃ দেশটার কল্যাণ হতো, দেশটার মঙ্গল হতো।
আমরাও সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারতাম। অন্ততঃ আমাদের সরকার তা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে না। আমরাতো পরিশ্রম করি। দেশের জন্য কাজ করি।
ঠিকানাঃ দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আন্দোলন করে বিএনপিকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাবার পর আপনার সরকারতো আন্দোলনকালীন অনেক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।
শেখ হাসিনাঃ এ কথা সত্য নয়। আমার সরকার প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমরা সকলে মিলে দেশটা গড়তে চাই। সে জন্যেই ঐক্যমতের সরকার গঠন করেছি। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, সেই নির্বাচনে ভোট চুরি, কোটি কোটি টাকার অপচয়, সেই পার্লামেন্ট ৩ দিনের বেশী সংসদে বসতে পারেনি। এ জন্য তাদের বিচার হওয়া উচিত।
ঠিকানাঃ সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনাঃ এ অভিযোগ একেবারে মিথ্যা নয়। তবে আ-লীগ সরকারে যাবার পর সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্তদের প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। অনেকেই জেলে রয়েছে। আত্মগোপনও করেছে। কেউ কেউ সুবোধ বালকের মতো সুস্থ জীবন-যাপন করছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দলের সন্ত্রাসীদের হাতে-নাতে গ্রেফতার করার পরও তারা নির্লজ্জের মতো প্রতিবাদ জানাচ্ছে। দলীয় সন্ত্রাসীদের মুক্তির দাবীতে গাড়ি ভাংচুর করছে।
ঠিকানাঃ রাষ্ট্রপতি ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার সপক্ষে যে বক্তব্য দিয়েছে সে ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
শেখ হাসিনাঃ রাষ্ট্রপতি যদি কোন পদক্ষেপ নেন- তবে আমরা সরকারের তরফ থেকে অবশ্যই সহায়তা দেব।
ঠিকানাঃ আপনার ঐক্যমতের সরকারে এখন যদি বিএনপি এবং জামায়াত যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে তবে তাদের নেবেন কি?
শেখ হাসিনাঃ (মুচকি হেসে) খবর আছে কি? খবর আছে আপনার কাছে?
ঠিকানাঃ আগে তো আপনি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনাঃ আপনার কাছে খবর আছে কিনা- আগে বলুন। যদি খবর থাকে বলুন- তারপর আমি জবাব দেব। ঠিকানাঃ আপনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমশঃ উত্তপ্ত হচ্ছে। স্কপ ধর্মঘটে গিয়েছিল। মৌলবাদীরা সংগঠিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত বলবেন কি?
শেখ হাসিনাঃ যখনই যা ঘটছে আমি তা তখনই জানতে পারছি। এবং এখান থেকে যা ডিসিশন দেবার, আলোচনা করার, সব আমি করছি। কোনটাই থেমে থাকছে না। মানে আনএটেনডেন্টে থাকছে না। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।
ঠিকানাঃ তাহলে আপনার অনুপস্থিতিতেও কোন সমস্যা হচ্ছে না।
শেখ হাসিনাঃ কোন সমস্যা হচ্ছে না। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সাথে বৈঠকে বসাও হয়েছে। কিন্তু আপনারা জানেন যে বিএনপি সমর্থিত যারা শেষ পর্যন্ত তারা কোন সমঝোতায় আসবেই না। এই সিদ্ধান্তের কারণেই কিন্তু তারা ধর্মঘটটা করেছে।
ঠিকানাঃ টিভিতে প্রচারিত সংসদ কার্য বিবরণীতে বিএনপির গঠনমূলক বক্তব্য আলোচনা দেখানো হচ্ছে না- শুধু ঝগড়া-ঝাঁটির বিষয়গুলো দেখিয়ে তাদের ভাবমূর্তি বিপন্ন করে তুলেছেন- বিএনপির এ অভিযোগ প্রসঙ্গে কিছু বলবেন কি?
শেখ হাসিনাঃ ওটা হচ্ছে টিভি থ্যারাপী। তাদের আচার আচরণ যাতে আরো সংযত হয়, আরো গঠনমূলক হয় এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা জনগণের কাছে যাতে বাড়ে তার ট্রিটমেন্ট দেয়া হচ্ছে এবং এর শুভ ফলও পাওয়া যাচ্ছে। আর এটা ঠিক না যে গঠনমূলক দেখানো হচ্ছে না। আমার মনে হয় বিরোধীদল কোন অভিযোগ করার আগে আয়নায় নিজেদের চেহারাটা দেখা উচিত। কারণ তারা ক্ষমতায় থাকতে টেলিভিশন রেডিও মিডিয়াকে তারা কীভাবে ব্যবহার করেছে; আর তারা যখন ক্ষমতায় ছিল বিরোধী দলের সাথে কী আচরণ করেছে সেটা তাদের দেখা উচিত। আমরা যতো লিবারেল হচ্ছি, যতোটা সুযোগ তাদের দিচ্ছি এতে তারা যদি সন্তুষ্ট না হয়, তখন আমি বলবো যে তারা যেভাবে যে প্রক্রিয়া করেছিল সে খাতা খুলে আমরা যদি সেই প্রক্রিয়ায় ফিরে যাই তাতে যদি তারা খুশী হোন- তাহলে আমরাও তাদের মতোই করবো?
ঠিকানাঃ বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলাদেশের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত-এতদসত্ত্বেও পি.জি. হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নামে করা হচ্ছে কেন?
শেখ হাসিনাঃ এতে আমার কিছুই বলার নেই। যারা করেছে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন। এবং জনগণ এটা গ্রহণ করলো কিনা সেটাও দেখবেন।
ঠিকানাঃ ঘন ঘন টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এর কারণ কি?
শেখ হাসিনাঃ এটা সব সময়ই হয়ে থাকে। সবসময় ঋসযমর্র -এর স্বার্থেই করা হয়ে থাকে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই সবদেশেই করা হয়। তবে আমরা সহনশীলতা প্রদর্শন করে যাচ্ছি এজন্য যে একচোটে বেশি করলে তার একটা ধাক্কা আসতে পারে- সেটা যাতে না হয় সে জন্য একটু ধীরে ধীরে করা হচ্ছে।
ঠিকানাঃ প্রবাসীরা যাতে প্রবাসে থেকেই ভোট দিতে পারেন সে ব্যাপারে কোন পরিকল্পনা আছে কি?
শেখ হাসিনাঃ আপনি ভোটার হতে পারেন। এটা উমর্ভধভধমল্র যরমডণ্র্র. আপনি যখনই যাবেন দেশে তখনই উদধণত ঋফণর্ডধমভ কমিশনের অফিসে যাবেন। সেখানে গিয়ে ভোটার হবেন। এবং নির্বাচনের সময় দেশে গিয়ে ভোট দেবেন। তবে প্রবাসে থেকে ভোট দেয়া সম্ভব নয়।
ঠিকানাঃ প্রবাসীদের জন্য কিছু বলবেন কি?
শেখ হাসিনাঃ তাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা। দেশের মানুষের জন্য যেন তারা কাজ করেন। দেশের ভাবমূর্তি যাতে বিদেশে গড়ে উঠে সে দিকে দৃষ্টি রেখে কাজ করেন। এমন কোন আচরণ যেন না করেন, যেটা দেশের মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে। আর ঠিকানাই হারিয়ে যেতে বসে। সে ধরনের কাজ যেন না করেন। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য যেন কাজ করেন। আমরা যতোটুকু পারছি দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তবে বিকৃতভাবে কোন কিছু পরিবেশন না করাটাই ভাল। যদি কোন অপরাধ হয় -দোষ হয়- তা গঠনমূলকভাবে তুলে ধরুন- আমরা কিছু মনে করবো না। তবে মিথ্যা, বিকৃত খবর দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বই বিলুপ্ত করা হয়। ঠিকানা হারাবার মতো কাজ করবেন না। তাতে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষের ক্ষতি করবেন না।
ঠিকানাঃ আপনার নাতনীকে দেখাবেন না?
শেখ হাসিনাঃ (প্রাণখোলা হাসি)-আমার নাতনী লজ্জাবতী। ৪০ দিন না গেলে কাউকে দেখাবো না।