অরাজনৈতিক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা

দেশে হযবরল পরিস্থিতি : বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে চলছে টালমাটাল অবস্থা। চারদিকে অস্থিরতা, উত্তেজনা। ক্ষমতাসীনদের দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর যা খুশি তা-ই করার প্রবণতায় দেশে অন্যায়-অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা-হরিলুট অবস্থায় জনমনে অস্থিরতা, অসন্তোষ। ব্যাংকে অস্থিরতা, রাজনীতিতে অবক্ষয়, খুন-রাহাজানি, শিক্ষাঙ্গনে সরকারদলীয় ক্যাডারদের নৈরাজ্য আর বাইরে যুবলীগের তাণ্ডব। বিশেষ করে, অন্যদিকে নিজ দলীয় মানুষের মানুষের এসব নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগ প্রধান ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার আকস্মিক কঠোর অবস্থান গ্রহণে যুবলীগ-ছাত্রলীগের কোণঠাসা অবস্থা। এখন এই হযবরল অবস্থায় অন্ধকারের জীবনের যারা বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি, তারা মাথা তোলার চেষ্টা চালিয়েছে। সেই স্বাধীনতার সুবিধাভোগীরাও প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান মেনে নিতে না পেরে নানা চক্রান্তে মেনে ওঠার পথ খুঁজছে। এর ফলে অরাজনৈতিক শক্তির আশঙ্কা করছে অনেকেই। এ নিয়ে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে সতর্কবার্তা সংকেত দিয়েছে বলে নানা সূত্রে বলা হচ্ছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও সরকার তার ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা প্রশ্নহীনভাবে বাড়াতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা দ্রুত নিম্নমুখী হচ্ছে। অভিজ্ঞ, পুরোনোদের বিদায় করে নতুন প্রজন্মের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে চমক দেখিয়েছেন, তরুণ মন্ত্রীদের কার্যক্রমে সে প্রদীপ ক্রমে যেন নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। তার পরও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, দুর্নীতি, দলীয় কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর যথেচ্ছাচার ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আরো মনে করেন, সংসদের ভেতরে বাইরে কার্যকর, বলিষ্ঠ বিরোধী দলের অনুপস্থিতি সরকারকে বিব্রতকর এবং রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক অবস্থা থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হচ্ছে না। কোণঠাসা অবস্থায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি একটা পর্যায়ে উঠে দাঁড়াতে পারে এবং তাদের কর্মসূচিতে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণে তা সরকারবিরোধী বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেও পারে, এমনি আশঙ্কাও রয়েছে। তার ওপর রয়েছে জঙ্গি উত্থান এবং নতুন করে হামলার আশঙ্কা। এমনই অবস্থায় অরাজনৈতিক শক্তির উত্থান আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিদেশি একটি অত্যন্ত শক্তিধর গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে এমনই পূর্বাভাস দিয়েছে। ওই দেশটি ভারতে অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থায় রয়েছে। ভারতের সাথে তাদের সামরিক, ক‚টনৈতিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সহ বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কোনো মুসলিম দেশই ওই দেশটির সাথে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেনি। যদিও সৌদি আরব তার প্রতিবেশী এই দেশটির সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইরানকে কমন শত্রু হিসেবে তারা পরিগণিত করে আসছে। দেশটি ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা-চীনসহ উপ-আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশ দেশটিকে স্বীকৃতি না দিলেও সৌদি-ভারত মাধ্যমে বাংলাদেশকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে বিদেশি কয়েকটি প্রভাবশালী সংস্থা।

আগামী বছরের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা কোনো রকম হটকারী পরিণাম ডেকে আনে, এমন কোনো কর্মপন্থা ও কর্মপরিকল্পনায় দলকে সম্পৃক্ত করার পক্ষে নন। কিন্তু দলটির লন্ডনে অবস্থানরত নেতা কোন পথে পা বাড়ান, তা নিয়ে চিন্তিত ও শঙ্কিত তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো বিডিআর বিদ্রোহের দিন ভোরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসা ত্যাগ করে আত্মগোপনে যাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করেন। সে রহস্য আজও উদ্্ঘাটিত ও প্রকাশিত হয়নি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার কথাও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা স্মরণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর খুনি নুর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। কানাডার আইনি প্রক্রিয়ায় তা সম্ভব হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি আবদুর রশীদকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে নমনীয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও চলছে। শিগগিরই ব্রিটেন ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বছরের প্রথমার্ধের মধ্যেই তারেক রহমানকে ফিরিয়ে এনে শাস্তি ভোগের ব্যবস্থা করার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, বিরোধী পক্ষ আগামী বছরের প্রথম ভাগে দেশে একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। ঢাকার দুই ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে তার সূচনা হতে পারে। সরকার এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটা অবাধ, সুষ্ঠু হয় সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নির্বাচনে ছোটখাটো ত্রু টি, গোলযোগ হলেও তা বড় করে সামনে আনা হবে। কারচুপি, জালিয়াতির অভিযোগ এনে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরিণামদর্শী লক্ষ্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে সিটি নির্বাচনকেই পুঁজি করা হবে।