অর্থের কাছে রাজনীতির পরাজয়

নিজস্ব প্রতিনিধি : রাজনীতি সরকারের নীতি, অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। সব দেশে সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই তা হয়ে আসছে। উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এখানে অর্থনীতি, বিশেষত কালোটাকার মালিক, বিপুল অর্থবিত্তের মালিকেরাই রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের নিয়ন্ত্রক, পরিচালক। তার সর্বশেষ নজির পাওয়া গেল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মনোনয়নে। ষাটের দশক থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে আছেন অ্যাডভোকেট আজমতউল্লাহ খান। দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। টঙ্গী পৌরসভার দুই দফায় নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তার হাত ধরেই পৌরসভা সিটি করপোরেশনে পরিণত হয়েছে। মেয়র পদে আসীন হওয়ার ভাগ্য হলো না তার। এই করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে পরাজিত হন। তার কারণ ছিল প্রধানত এই নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে জনসাধারণের ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ। এ কারণে অপর চার সিটি করপোরেশনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। বিএনপিদলীয় প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত হলেও তারা এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারেননি। কারণ, সরকারের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সহযোগিতা না পাওয়ায় এবং মামলা, গ্রেফতার হওয়ার জন্য তাদের দায়িত্ব পালনে অসমর্থতা। এ জন্য মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার কথা থাকলেও তারা এই সমর্থন, সহমর্মিতা কুড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন। কর্মী, ভোটার সাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাও এর কারণ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গাজীপুরের মেয়র এম এ মান্নান ও খুলনার মেয়র মনিরুজ্জামান মনিকে এবার মনোনয়নবঞ্চিত করা হয়েছে। নতুন মুখ দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে হাসানউদ্দিন সরকার ও নজরুল ইসলাম মনাকে। সরকারি প্রার্থীরাও যত জনপ্রিয়ই হোন আর গোপনে সরকার যত সহযোগিতাই করুক, বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা, এলাকাবাসীর কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন এই প্রার্থীদের সঙ্গে তাদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে হবে। এমনই অভিমত ও পর্যবেক্ষণ ভোটার সাধারণ ও রাজনৈতিক মহলের। তাদের মতে টানা নয় বছর ক্ষমতায় থাকা, দলের নেতা-কর্মীদের জুলুম, অন্যায়, পুলিশের নির্যাতনমূলক আচরণের প্রথম খেসারত দিতে হবে সরকারি দলকে।
রাজধানীর সবচেয়ে কাছাকাছি গাজীপুর সিটি করপোরেশন। এখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে ধনাঢ্য শত শত কোটি টাকার মালিক এক ব্যবসায়ীকে। প্রধানত এই যোগ্যতাবলেই তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সরকারি কাজে গাজীপুর গেলেও মন্ত্রী তার আতিথ্য গ্রহণ করেন। আজমত উল্লাহর কর্মীদের ভাষ্য, ওবায়দুল কাদেরই জাহাঙ্গীরের মনোনয়ন লাভের ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কর্মীদের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে শক্তিশালী ভিত গড়ে নিয়েছেন। তারাই জাহাঙ্গীরের বড় শক্তি। প্রবীণ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা দর্শক হয়ে দেখছেন, কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে ব্যক্ত করেন না মান-সম্মানের ভয়ে। ভোটাররা শঙ্কিত গাজীপুর-টঙ্গীতে সন্ত্রাস উত্থানের আশঙ্কায়।
গোপনে আজমত উল্লাহর সমর্থক, কর্মী, নিরীহ ভোটাররা এলাকায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন জনদরদি হিসেবে সমাদৃত বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারকে বেছে নিলে বিস্ময়ের হবে না। কিন্তু খুলনায় চিত্র এর অনুরূপ নয়। তালুকদার আবদুল খালেক একজন প্রবীণ নীতিনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন। বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মনা কর্মীদের মাঝে গ্রহণযোগ্য হলেও সাধারণ মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবেন, তা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ।