অলিম্পিকের স্বপ্ন আরিফুলের

স্পোর্টস রিপোর্ট : মাত্র চার মাসেই তার জীবনটা কেমন বদলে গেল ফ্রান্সের ছোট্ট একটা শহরে বসে এক বাংলাদেশি সাঁতারু ভাবছেন কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন রচনার কথা। সাঁতারু জীবনে সাত-আট মাস আগেও দোলা দেয়নি মনে, আরিফুল ইসলাম এখন তারই পিছু নিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ভর করে এগুচ্ছেন। ওয়াইল্ড কার্ডের দাক্ষিণ্যে নয়, টাইমিংয়ের যোগ্যতাবলে সরাসরি টোকিও অলিম্পিকের পুলে নামাই এখন তার ধ্যান। এ দেশের সাঁতারুদের স্বপ্ন এসএ গেমসেই বাঁধা। স্বপ্নচূড়ায় তারা দেখেন শুধু এই আঞ্চলিক গেমসের সোনা। সাফের বৃত্তবন্দি এই জীবন থেকে বেরিয়ে একজন সাঁতারু ভাবছেন সরাসরি অলিম্পিকে যাওয়ার কথা। না, বাগাড়ম্বর নয় মোটেও। আগে কেউ যা কল্পনাও করেননি, সেটাকেই লক্ষ্য করেছেন আরিফুল ইসলাম। ফ্রান্স থেকেই ফোনে বলছেন, ‘ফ্রান্সে আসার পর চার মাসে আমার যে উন্নতি হয়েছে সেটা অব্যাহত থাকলে অবশ্যই আমি পারব। হাতে অনেক সময় আছে, আমার আছে আত্মবিশ্বাস আর চেষ্টা। আর ৪ সেকেন্ড কমাতে পারলেই আমি সরাসরি ২০২২ টোকিও অলিম্পিক খেলব। আসলে ফ্রান্সের এই ট্রেনিং ক্যাম্পে আসার পর মনে হচ্ছে আমি পারব।’ গত ৬ সেপ্টেম্বরে আরিফুল ফ্রান্সে যান আইওসির (আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি) বৃত্তি নিয়ে। ট্রেনিং করছেন প্যারিস থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট শহর রুয়েনের ভেকিংস সুইমিং ক্লাবে। উন্নত ট্রেনিংয়ের চার মাস পূর্তি আজ। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে এই সাঁতারুর টাইমিং ছিল ১ মিনিট ৭ সেকেন্ড। চার মাসে তার উন্নতি হয়েছে ২ সেকেন্ড। আর ৪ সেকেন্ড কমাতে পারলেই আরিফুলের জন্য আপনাআপনি খুলে যাবে অলিম্পিকের দুয়ার। ‘জুলাই মাসে কোরিয়ার ওয়ার্ল্ড সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ আছে, এটা টার্গেট করেই আমি এগোচ্ছি’ আরিফুলের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের ঝনঝনানি। ১ মিনিট ১ সেকেন্ডে নিজের ইভেন্টটা শেষ করতে পারলেই অলিম্পিক পুলে সরাসরি নামার ছাড়পত্র পাবেন এই ব্রেস্ট স্ট্রোকার।
শুধু এই এক ইভেন্টে নয়, ২০০ ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকেও আরিফুলের টাইমিংয়ের উন্নতি হয়েছে। ২০০ মিটারেই উন্নতিটা বেশি। ঢাকায় করেছিলেন ২ মি ২৯ সেকেন্ড, ফ্রান্সে সেটা কমিয়ে এনেছেন ৯ সেকেন্ড। ৫০ মিটারে ৩০১০ সেকেন্ড থেকে কমে হয়েছে ২৯৭০ সেকেন্ড। এই উন্নতি যেন তার এসএ গেমসের সোনার স্বপ্নটা সহজ করে দিয়েছে। নৌবাহিনীর এই সাঁতারুর ঘোষণা, ‘এসএ গেমসে দুটি সোনা জিতব আমি। ১০০ মিটার ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে গতবারের সোনাজয়ী ভারতের প্রকাশের টাইমিং আমার জানা আছে। সেপ্টেম্বরে এসএ গেমস হলে আমার টাইমিং ওর চেয়ে ভালো হবে আশা করি।’ গত গেমসে সঞ্জু প্রকাশ ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক ১ মিনিট ২ সেকেন্ডে এবং ৫০ মিটারে ২৮ সেকেন্ডে সোনা জেতেন। সেই সোনাজয়ীকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো আত্মবিশ্বাস হয়ে গেছে তার এ চার মাসেই। এই কদিন কেটেছে তার ট্রেনিং আর কম্পিটিশনে। ফ্রান্সের ওই শহরে বিভিন্ন ক্লাবভিত্তিক এবং এলাকাভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ১১টি প্রতিযোগিতায় ৫টি সোনা ও ২টি রুপা জেতার পর আরিফুলের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে তরতরিয়ে।
আইওসির ট্রেনিং ক্যাম্প আরিফুলের সাঁতার ক্যারিয়ারে টনিকের মতো কাজ করেছে। দেশে-বিদেশে ট্রেনিংয়ের পার্থক্যটাও বুঝছেন তিনি, ‘দেশের ট্রেনিংয়ের সঙ্গে এখানে মিলবে না। এখানে তিনজন কোচ আমাদের নিয়ে কাজ করেন। আসার পর প্রথমে আমার পায়ের পজিশন ঠিক করে দেন কোচ। এর পরও কিছু ছোটখাটো ভুল হয়, সেগুলো শুধরে দেন কোচরা। আসলে প্রতিদিনের ট্রেনিংয়ে তারা থাকেন এবং আমাদের এক-আধটু টিপস দেন এটাই উন্নতির প্রক্রিয়া। ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন চার-পাঁচটা ট্রেনিং সেশন থাকে। এর মধ্যে ওয়েট ট্রেনিংও থাকে। অথচ দেশে সাঁতারুদের ওয়েট ট্রেনিং বলে কিছু ছিল না, এখানে এসে বুঝেছি সেটা খুব জরুরি।’
তিনজনের কোচিং স্টাফে মূল কোচ দামিয়েন কাঁতি ভিদালও একজন অলিম্পিয়ান। ইনজুরির কারণে অল্প বয়সে অবসরে যাওয়ার পর কোচ হিসেবেই কাজ করছেন। এই ফ্রেঞ্চ কোচও বলছেন আরিফুলের সম্ভাবনার কথা, ‘সে (আরিফুল) এখনও তরুণ, সে পরিশ্রম করতে পারে আর সেরা সাঁতারু হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এটাই তাকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে।’
আইওসির বৃত্তিতে ফ্রান্সে ট্রেনিং ক্যাম্পে আছেন বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ৯ জন ক্রীড়াবিদ। সাঁতারে দুজন, এক সিরিয়ান মহিলা সাঁতারু ও বাংলাদেশের আরিফুল ইসলাম। কিন্তু ১৯ বছর বয়সী বাঙালি তরুণের অনুপ্রেরণা টোগোর এক স্প্রিন্টার, ‘রুয়েন শহরে একটা বিল্ডিংয়ে কয়েকটি ফ্ল্যাটে আমরা সবাই থাকি। টোগো থেকে আসা এক স্প্রিন্টার কিছুদিন আগে অলিম্পিকের টিকিট নিশ্চিত করেছে। সে আমার দারুণ বন্ধু, ওর সঙ্গে গল্প করে আমি প্রতিদিন অনুপ্রাণিত হই। স্বপ্ন দেখি।’ ঊনিশের এ তরুণের স্বপ্ন আবার ছুঁয়ে যায় পুরো বাংলাদেশকে। সরাসরি অলিম্পিকের পুলে ঝাঁপ দেয়ার সুযোগ যে এখনও এ দেশের কারও হয়নি।