অস্ফুট কথা

সীমু আফরোজা: অবশিষ্টের মতো ছুড়ে ফেলেছ তুমি বারবার, তবু চেষ্টা করেই উঠে দাঁড়িয়েছি হার না মেনে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে যান্ত্রিক গতিতে। তবু অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতাই জানিয়েছি তোমায়, আজ যখন সুন্দর একটি স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে আর তুমি অমনি তা ম্লান করে দিলে? মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ।
পাঠক, আমি এতক্ষণ একজন যোদ্ধা নারীর কথা বলছিলাম।
মানুষ শুধু জন্মগতভাবেই বিকলাঙ্গ হয় না, অনেক সময় পরিবেশের কারণেও হয় কিংবা মানসিক চাপে পড়ে অথবা ভয়ের কারণেও হয়। আরো নানাবিধ কারণ রয়েছে, তবে এই মানুষগুলো খুব কম মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ এড়িয়েই চলার চেষ্টা করে। যারা তাদের হাতে হাত ধরে চলতে শেখায়, তারা জানেও না তাদের জন্য ওদের হৃদয়ে কতখানি মায়া, সে কত মহান ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকে।
আজ বলছি গল্পের দুটি নাম : রুবি ও সীমু। এরা সম্পর্কে ননদ-ভাবি।
এবার রুবির প্রসঙ্গে বলছি : দুই বোন ও পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে রুবি সবার ছোট। কথার ফুলঝুরি যেন সারাক্ষণ লেগেই থাকে। বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে কাউকে আর কথা বলার সুযোগ দেয় না। তবে একমাত্র বাবাকে ভীষণ ভয় পায়। ছুটির দিনে বাবা বাসায় থাকে বলে রুবি পুতুল নিয়ে বোবার মতো মনে মনে কথা বলে বলে খেলে।
চারদিকে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে-স্বাধীনতার যুদ্ধ। জিনিসপত্রের এত দাম, মা খুব হিসাব করে চলেন। রুবি খেলছিল পুতুল নিয়ে। মা বললেন, যা তেলের বোতলটা নিয়ে আয়। জোরে জোরে গান গাইতে গাইতে তেলের বোতলটা নিয়ে বের হতেই দেখে বাবা ঘরের দিকে আসছেন। হঠাৎ বোতলটা পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়। রুবি ভাবে, বাবা বুঝি ধরে মারবে, ভয়ে সে জামা ভিজিয়ে ফেলে।
যদিও বকাঝকা করা হয়, কিন্তু রাতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায় রুবি। সকালে মা ডাক দেন ওঠার জন্য, কিন্তু সে কোনো কথা বলে না। মা গায়ে হাত দিয়ে দেখেন বেশ জ্বর। তিন-চার দিন টানা জ্বর আর ভালোই হচ্ছে না। প্রতিদিন কপালে জলপট্টি দেওয়া হচ্ছে। উপায় না দেখে ডাক্তার আনা হলো বাসায়। ডাক্তার সব পরীক্ষা করে বললেন, টাইফয়েড হয়েছে। তবে খারাপ খবর হচ্ছে, কানে ইনফেকশন হয়েছে খুব বেশি। রুবির শ্রবণক্ষমতা লোপ পেয়েছে। সে ভবিষ্যতে হয়তো কানে একেবারে না-ও শুনতে পারে। ডাক্তার বলে চলে গেলেন। যুদ্ধের জন্য শহরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সবাই ওর সাথে ইশারায় কথা বলতে শুরু করে। তখন রুবির বয়স ৯-১০ বছর। দেশ স্বাধীন হলো। এবার ওর চিকিৎসার পালা। বড় বোন ভারতেশ্বরী হোমসের সিনিয়র শিক্ষয়িত্রী। তিনি হোমসের কোয়ার্টারে থাকেন। তাই ওকে নিজের কাছে রেখে চিকিৎসা করান। কিন্তু সময় বেশি পার হয়ে যাওয়ায় রুবি বধির হয়ে যায়। বড় বোন ভাবলেন, তিনি রুবিকে লেখাপড়া শেখাবেন, সাথে কাপড় কাটা ও সেলাই শেখান। বেশি দিন সেখানে রাখতে পারেননি, কারণ হোমসে কারো ভালোটা সমাজের অনেকের কাছে ভালো লাগে না। বাধ্য হয়ে রুবিকে ফিরে আসতে হয় পরিবারের কাছে কিন্তু একেবারে মুক ও বধির হয়ে। কথা বলতে গেলে জড়িয়ে জড়িয়ে বলে, কিন্তু একদমই শুনতে পায় না। আশপাশের মানুষেরা ওর নাম বলার চেয়ে বোবাবুবি বলে খ্যাপাত। রুবি সব বুঝতে পারে কিন্তু বলতে পারে না। যখন খুব রাগ হয়, শুধু অস্ফুট কথা আর চিৎকার শোনা যায়।
রুবি বুঝতে পারে, সে আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে না। সুস্থ-সুন্দর জীবনটা নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে উঠল। রুবির বিয়ে হয় বড় বোনের আগে, ভাইয়েরা রুবিকে নিজের বাড়িতেই রাখে। দেখতে দেখতে রুবির দুটি পুত্রসন্তান হলো, তারা মায়ের মনের আশঙ্কা কাটিয়ে মা বলে ডাকে। কিন্তু আল্লাহর কী অপরূপ দান-ওরা রুবির সাথে ইশারায় কথা বলে। ভাইয়েরাও বিয়ে করেছেন। মেজো ভাই বিদেশে থাকেন কিন্তু তার মা, স্ত্রী ও কন্যা দেশে থাকেন। রুবির পরিবারসহ সবাই একসাথে থাকেন। জীবন চলছিল ভালোই। মা চাইলেন এবার তার ছোট ছেলে বিয়ে করে বউ আনুক। মেজো বউ তার স্বামীর কাছে চলে যাবে, তাই ছোট ছেলের বিয়ে দিলেন। নতুন বউকে পেয়ে সবাই খুব খুশি। বাড়িটা যেন আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠল। রুবি ছোট বউকে নতুবউ বলে ডাকে, বাকিরা সীমুই ডাকে। বিয়ের পর থেকে সীমু পরিবারের সবার সাথে খুব আন্তরিক হতে শুরু করল, কিন্তু কীভাবে ইশারায় কথা বলা যায়, না জানার কারণে কম কথাই বলত। কিন্তু কেউ হয়তো এটার অপেক্ষায় ছিল, তাই সে রুবিকে বোঝাত তুমি তো বোবা, তাই সীমু তোমার সাথে কথা বলতে পছন্দ করে না। রুবির আত্মসম্মানে বাধল, সে খুব কষ্ট পেল। সে সীমুর সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল। বিয়ের মাসেই শাশুড়ি খুব অসুস্থ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন। তাকে দেখাশোনা করার জন্য কে থাকবে ওনার কাছে। মেজোবউ যেকোনো সময় দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেবেন। রুবি কথা বলতে পারে না। তাই বাসরঘর ছেড়ে হাসপাতালের মেঝেকেই আশ্রয় করে নিল সীমু। দেড় মাস পর শাশুড়ি ঘরে ফিরলেন, আর মেজোবউ হাসপাতালে ভর্তি হলেন। এবারও সীমু তার দায়িত্ব হতে পিছপা হয়নি। নবজাতককে নিয়ে ঘরে ফিরল সবাই। সীমুর মাও এলেন। শ্বশুরবাড়িতে সীমুর দায়িত্ব পালন দেখে তিনি নিজেই মুগ্ধ হয়ে যান। কিছুদিন যাওয়ার পর জায়ের স্টিচে ইনফেকশন ধরা পড়ে। ডাক্তারের কাছে গেলে নতুন করে সেলাই দিতে হবে বলে বসতে বলা হয়। কিন্তু সেলাইয়ের রখা শুনে তিনি ভয়ে সীমুকে নিয়ে বাসায় ফিরে যান। সীমু প্রতিদিন রুটিন করে দুই বেলা ড্রেসিং করে করে সুস্থ করে তোলে জাকে। বাসার সবাই সীমুর প্রতি বেশ খুশি, বিশেষ করে শাশুড়ি। রুবিও বুঝতে পারে তাকে ভুল বোঝানোর কথা। জায়ের মেয়ে আর রুবির ছেলে দু-এক বছরের ছোট-বড়। তাই জায়ের মেয়ে যখন ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হলো, তার পরের বছর রুবির ছেলেও ভর্তি হবে। কিন্তু সীমুকে বোঝানো হলো তারা বিদেশে যাবে, তাই ইংলিশ স্কুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রুবি তো এত টাকা বেতন দিতে পারবে না। তা ছাড়া ওদের পড়াশোনার দায়িত্ব কে নেবে? সীমু বুঝে গেল তার কথার অর্থ। একদিন সকালে সীমু ব্যাগে কিছু টাকা নিয়ে ছেলেকে ভর্তি করল ইংলিশ স্কুলে, তবে একই স্কুলে নয়। প্রতিদিন স্বামী কাজে বের হয়ে যাওয়ার পরই সীমু ওদের পড়াশোনা করায়, সকাল-বিকাল ওরা (রুবির ছেলেরা) রুটিন করে মামির (সীমু) কাছে লেখাপড়া করে। আজ রেজাল্ট বের হয়েছে। সীমু শাশুড়িকে বলে, যদি ফেল করে আমার সাথে কি রাগ করবেন? মা হাসেন। রেজাল্ট নিয়ে বাসায় ফিরেই সীমু রুবিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে, মা জানতে চান কী করেছে। সীমু উত্তরে বলে, মা, ও দ্বিতীয় হয়েছে। খুশিতে মায়ের চোখে পানি এসে যায়। তিনি সীমুকে অনেক দোয়া করতে থাকেন। কিন্তু স্বামীর সাথে সংসার করার জন্য জায়ের মতো সীমুও বিদেশে পাড়ি দেয়। দুই ভাই এখন আমেরিকায় থাকেন। সীমু যখন বিদেশে পাড়ি দেয়, রুবির ছেলেদের বয়স তখন ৯-১০ বছর। ওরা সীমুকে মামানি ডাকত। ওদের সাথে ফোনে কথা বলতে গেলে সীমু শুরু খেকে শেষ পর্যন্ত শুধু কাঁদত।
পাঠক, সময়ের পরিবর্তনে সীমুর শাশুড়ি চলে আসেন তৃতীয় ছেলের কাছে কানাডায়। মৃত্যুর পর ওনাকে সেখানেই কবর দেওয়া হয়। রুবির বড় বোন সুলতানা নাজনী বেগম হোমসে অসুস্থ হয়ে পড়লে সীমুর স্বামী বাংলাদেশে গিয়ে তার চিকিৎসা করান, কিন্তু তিনি ফিরে আসার পর বোনের মৃত্যুর খবর পান। রুবির দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে বিয়ে করেছে, বাকি দুজন অবিবাহিত।
আজ থেকে চার বছর আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গল্পের মূল চরিত্র রুবি মৃত্যুবরণ করে। সীমু তখন পহেলা বৈশাখের উৎসব নিয়ে ব্যস্ত নিউইয়র্কে। বারবার এই আয়োজনের জন্য সবার সাথে কথা বলার মাঝেই সীমুকে জানানো হয় রুবির মৃত্যুসংবাদ। হঠাৎ এই খবরে অনেক দিন সীমুর পরিবার বিষাদময় জীবন অতিবাহিত করে।
রুবির সন্তানেরা বড় হয়েছে। সীমুর সাথে ওদের মা-ছেলের সম্পর্ক বিদ্যমান।
আজও ওরা সীমুর মাঝে ওদের মাকে খুঁজে পায়। সীমুও ওদের ঠিক আগের মতোই ভালোবাসে। পাঠক, এই ছিল এক বাস্তব জীবনের গল্প।-নিউইয়র্ক।