আওয়ামী লীগে ভোটের প্রস্তুতি

দুইশ’ আসনে জেতার টার্গেট : ৩০০ আসনে দফায় দফায় বিভিন্ন সংস্থার জরিপ শতাধিক আসনে নতুন মুখ : শরিকদের ছাড় দেবে ১০০ আসন

ঢাকা : ২০০ আসনে বিজয় টার্গেট করে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার লক্ষ্য নিয়ে আগেভাগেই আটঘাট বেঁধে নির্বাচনী মাঠে প্রচারণায় নামছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকারের ৯ বছরের উন্নয়ন কর্মকা তুলে ধরে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপশি প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির বিরুদ্ধে ‘আগুন সন্ত্রাস’ চিত্র তুলে ধরে জনগণকে সজাগ করতে ডিজিটাল প্রচারণার মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে জোটের শরিকদের জন্য শতাধিক আসনে ছেড়ে দেয়ার চিন্তাভাবনা মাথায় রেখেই নির্বাচনী মাঠ সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মাঠের অবস্থা যাচাইয়ের মাধ্যমে মনোনয়ন চূড়ান্তের জন্য একের পর এক জরিপ করা হয়েছে। জরিপে দলের অনেক এমপি বিতর্কিত কর্মকারে চিত্র উঠে আসায় শতাধিক আসনে নতুন মুখকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে টার্গেট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, কর্মিসভা এবং মতবিনিময় সভা করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করার কাজ চলছে। প্রার্থীদের মনোনয়নের খসড়া হওয়ার পর তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নেতৃত্বেই আসনভিক্তিক আরো ব্যাপকভাবে প্রচারণা শুরু হবে।
জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে ন্যূনতম দুই শতাধিক আসনে নিজ দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করছে আওয়ামী লীগ। সরকারের ‘নাটাই’ নিজের হাতে রাখতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চায় তারা। সেজন্য ২০০ থেকে ২২০ আসনে নিজের প্রার্থী দেবে দলটি। বাকি আসনে শরিক ১৪ দল ও শরিক দলের বাইরে অন্য দলগুলোকে ছাড় দেয়া হবে। নির্বাচনের ‘হ্যাটট্রিক বিজয়’ সামনে রেখে বর্তমান শরিক দলগুলোর বাইরে শক্তিশালী দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আলাপ ফলপ্রসূ হলে ওই দলটিকে ১২ থেকে ২২টি আসনেও ছাড় দিতে প্রস্তুত ক্ষমতাসীনরা।
সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন বা প্রার্থী নির্ধারণে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি জরিপ কাজ শেষ করেছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিষয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। আলাদা জরিপ চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে ২০০৮ সালের নির্বাচনের চেয়ে বেশি আসনে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগে। দলীয় কোন্দল দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। মনোনয়ন নিয়ে প্রায় প্রতিটি আসনেই এমপিদের সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেয়রদের বিরোধের চিত্র মুছে ফেলতে হবে কেন্দ্রীয় নেতাদের। জরিপের আলোকে সারাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রায় শতাধিক নতুন নেতাকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার বিষয় চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বাদ দেয়া হচ্ছে দলের নেতাকর্মীদের কাছে বিতর্কিত হয়ে উঠা, কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া, দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন, ক্ষমতাকে পারিবারিককরণ, সন্ত্রাস ও মাদক বিষয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়া নেতাদের। প্রয়োজনে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িত নেতাদের ঢাকায় তলব করে আনা হবে।
দলীয় সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে অংশগ্রহণ করল আর কে করল না তা নিয়ে চিন্তা করছে না ক্ষমতাসীন দলটির নীতি নির্ধারকেরা। তারা সংবিধানের বিধান অনুযায়ী যথাসময়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে যাবে। এ লক্ষ্যে দলীয় কোন্দল-বিভেদ এবং নানাভাবে বির্তকে জড়িত-মাদক, সন্ত্রাস ও জনপ্রিয়তা তলিনিতে নেমেছে এমন শতাধিক আসনে শক্তিশালী বিকল্প প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে এসব আসনে মনোনয়ন পাবেন এমন নেতাদের গ্রিন সিগন্যাল দেয়া হয়েছে। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও তৃণমূলের নেতাদের মনজয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দিবসভিত্তিক দলীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা ধরনের সভা-সমাবেশ ও ঘরোয়া আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে মাঠ গোছাচ্ছেন একাদশ নির্বাচনের এমপি প্রার্থীরা।
শতাধিক আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী বিকল্প প্রার্থীরা একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তাদের অনেকেরই মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারি দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতাদের পর্যবেক্ষণে এসব প্রার্থীদের শক্তিশালী অবস্থান এবং জনপ্রিয়তার বিষয়টিও উঠে আসছে। তবে তাদের কারো মনোনয়নের বিষয় নিশ্চিত না হলেও প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে রয়েছে তাদের নাম। নির্বাচনী মাঠ আরো গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিএনপির তৎপরতা দেখে প্রার্থী বাছাইয়ের চূড়ান্ত কাজটি সারবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
দলীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে বেশ পরিবর্তন আসতে পারে। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী কয়েক দফায় এমপিদের সতর্ক করে বলে দিয়েছেনÑ কারো মুখ দেখে তিনি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেবেন না। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের কয়েকটি জরিপ হয়েছে। সর্বশেষ জরিপে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার বিষয়টি বিশেষ কোড দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে এ হিসাব করেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ দলের প্রার্থী বাছাই করবেন। বর্তমান সংসদের এমপিদের মধ্যে অন্তত দেড়শ’ জনপ্রিয় এমপি পুনরায় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। তবে বিভিন্ন জরিপ পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো কারো নাম চূড়ান্ত করেননি। বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রার্থী বাছাই দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গেছে। তবে হাইকমান্ডের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে অন্তত শতাধিক আসনে বর্তমান এমপির বিকল্প শক্তিশালী প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে কাজ শুরু করেছেন। জোট শরিকদের ছেড়ে দেয়া অনেক আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছেন নির্বাচনী মাঠে। এসব প্রার্থীদের তালিকাও আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের হাতে রয়েছে। এসব প্রার্থীর অনেকেরই জনপ্রিয়তা রয়েছে।
এ দিকে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নেতৃত্বে পরিকল্পনার প্রস্তুতি শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। এ পরিকল্পনার অন্যতম হচ্ছে দেশব্যাপী ব্যাপক জনসংযোগ। আওয়ামী লীগের প্রথমসারির নেতারা এতে একযোগে যোগ দেবেন।নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকেই নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু হবে। তার আগেই দলকে নির্বাচন উপযোগী করে তুলতে যা যা দরকার তা নেয়া হচ্ছে। চলতি মাসের ২৬ তারিখ থেকেই সারা দেশে সাংগঠনিক সফর শুরু করবেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করবেন তারা। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা জানবেন। সেই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করবেন। এরই একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করবে। পাশাপাশি কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করা হবে। প্রশিক্ষণ দেয়া হবে পোলিং এজেন্টদের। সরকারের উন্নয়নচিত্র সম্পর্কে বিশদ ধারণা ভোটারদের সামনে উপস্থাপনে অন্যতম দিক হিসেবে থাকবে এতে। পার্থক্য তুলে ধরা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনামলে বিভিন্ন খাত ও দিক নিয়ে।একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় জনসংযোগে যাবেন। নির্বাচনে দলের চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায়-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং সরকারবিরোধী সম্ভাব্য আন্দোলন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করে তুলবেন তিনি। এর পাশাপাশি শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও জনগণের পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে যেসব জেলা এবং উপজেলায় যাননি এবার সেসব জায়গান যাবেন তিনি। তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে একান্তে বৈঠকও করবেন। স্থানীয় নেতাদের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেবেন।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, কর্মিসভা এবং মতবিনিময় সভা করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করার কাজ চলছে। এটি আরা ব্যাপকভাবে করা হবে। তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলে তার অবসান করা হবে। পাশাপাশি ভোটারদের কাছে সরকারের বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরা হবে।
আওয়ামী লীগের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলকে আরো শক্তিশালী এবং গতিশীল করতে তৃণমূলের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। ভোটারদের কাছে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- তুলে ধরা হবে। কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা হবে।