আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান

মেহেদী হাসান : আগামী অক্টোবরে জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। বারবার হাইকমান্ডের সতর্কতা, ডেকে এনে বোঝানো ও ধমক দিয়েও কাজ না হওয়ায় এবার সরাসরি অ্যাকশনে গেছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া দেড় শতাধিক নেতার কাছে শোকজ নোটিশ পাঠানো গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তাদেরকে বিদ্রোহী প্রার্থী ধরে নিয়েছে দলটি। কেন দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না এই মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ সংবলিত চিঠি গত ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচ বিভাগের বিদ্রোহীদের কাছে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব বিভাগের বিদ্রোহীদের কাছে শোকজ নোটিশ যাবে। এ ক্ষেত্রে তালিকা আরো বড় হতে পারে। অতীতে কখনো এত সংখ্যক নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা দেওয়ার নজির নেই।

এদিকে বিদ্রোহীদের মদদদাতা কেন্দ্রীয় নেতা, ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ৬২ এমপি, সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীল নেতারাও রয়েছেন। তাদের কাছে শোকজ নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে আওয়ামী লীগ। জানা গেছে, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ও কোন্দল বাড়ার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী ও জনপ্রিয় কিছু সংসদ সদস্যকে শোকজের চিঠি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তাদের শোকজের চিঠি না দিয়ে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হবে। গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় বিষয়টি উঠলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে বিদ্রোহীদের শোকজ পাঠানোর নির্দেশ দেন। আর মদদদাতাদের বিষয়ে নানা ধরনের কথা আসায় পরবর্তীতে তাদের বিষয়ে আরো খোঁজখবর নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি। গত ১২ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলটির উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় ওই নেতাদের শোকজের সিদ্ধান্ত হয়। জানা গেছে, সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সজাগ দৃষ্টি রাখার পাশাপাশি এবার দলের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিচ্ছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দুর্বল হয়ে পড়া দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর হচ্ছে। শোকজের জবাবের জন্য তিন সপ্তাহ সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ডাকযোগে অভিযুক্তদের ঠিকানা বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে দেড় শ জনের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হলেও তা বেড়ে দুই শতাধিক হতে পারে। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিদ্রোহী) হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হওয়া প্রায় ১৪০ উপজেলা চেয়ারম্যানের নামও রয়েছে। কয়েক ধাপে নোটিশ যাবে।
অন্যদিকে নোটিশের জবাব পাওয়ার পর আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড তা যাচাই-বাছাই করে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের চূড়ান্তভাবে দল থেকে বহিষ্কারের জন্য একটি তালিকা প্রস্তুত করে তা দলের পরবর্তী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে উপস্থাপন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় ওই বৈঠকে আলোচনা শেষে চ‚ড়ান্ত বহিষ্কার হওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদদদাতাদের তালিকা গণমাধ্যমে প্রকাশ করবে। জানা গেছে, শোকজের জবাবের মধ্যেই জানতে চাওয়া হয়েছে কোন কোন কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী-এমপি কিংবা জেলার নেতারা তাদের উৎসাহিত করেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী হতে। কারা কারা তাদের মদদ কিংবা সমর্থন দিয়েছেন। এসব বিষয় শোকজ পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের জবাবের মধ্য থেকেই সংগ্রহ করে পুনরায় তা যাচাই-বাছাই করে মদদদাতাদের সতর্ক করা হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত ৪৭৩টি উপজেলার নির্বাচনে ১৪৯টিতে চেয়ারম্যান পদে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১৪০ জনই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাউকে দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের আগে শোকজ নোটিশ জারি করে দোষী নেতাদের কাছ থেকে জবাব চাওয়া হয়। জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের বিধান রয়েছে। আর দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের একমাত্র এখতিয়ার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় দুই মাস নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, তৃণমূল থেকে আসা লিখিত অভিযোগ এবং তদন্ত করে এসব বিদ্রোহী ও তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করেছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। দলটির কেন্দ্রীয় তিনজন নেতা জানান, জাতীয় সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তৃণমূল, বিশেষ করে জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের সম্মেলনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়া বিদ্রোহীদের কাউকে পদ-পদবি দেওয়া হবে না।