আগে প্রকৃত মানুষ হই

সুজানা মালিহা

একুশ শতকের একজন মেয়ে আমি। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ায় আমরা আজ খুশিতে আত্মহারা। আমি এমন একটি দেশের মেয়ে যেখানে স্বাধীনতা এসেছিল ৩০ লাখ মানুষের ১ কোটি ৫০ লাখ লিটার রক্ত বন্ধক দিয়ে। তাই ছোটবেলা থেকেই সবার সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে শিখছি ‘সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’। দেশের গান শুনলে, বিশ্ব মঞ্চের কোথাও বাংলাদেশের নাম শুনলে, সাত মার্চ এর ভাষণ শুনলে, দেশের গৌরবময় ইতিহাসের ঘটনা শুনলে আমার গায়ে কাঁটা দেয়। আমার তখন মনে হয় আমি বোধহয় আমার এই ছোট ভূখ-টাকে অনেক ভালোবাসি।
কিন্তু আমার এই ভালোবাসার দেশে, ভালোলাগার দেশে, প্রত্যেকদিন ভোরেই আমিসহ দেশের প্রত্যেকটা মেয়ে একটি অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। প্রত্যেকটা মেয়েই হয়ত ভেবে বের হয় যে, ফিরে আসার সময় সম্ভ্রম নিয়ে ঘরে আসতে পারব তো? ৪৭ বছর আগের স্বাধীন হওয়া একটি দেশ, ৬০ শতাংশ শিক্ষিত মানুষের দেশে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে চিৎকার করা একটি দেশে এতটা অনিশ্চয়তা নিয়ে কেন বের হতে হয়? অনেকেই পর্দা প্রথাকে টেনে আনি। মতামত দেই যে পর্দা করে চললে এসব হতো না। কিন্তু যেখানে অনেকের কাছে মেয়ে ধর্ষিত হয়, এক বছরের শিশুও বাদ যায় না। একটা মেয়ে যত শিক্ষিত হোক, আত্মনির্ভরশীল হোক, একা বের হওয়ার আগে একবার ভাবতে হয় সন্ধ্যার আগে আসতে পারব তো? তার বাবা-মা চিন্তা করতে থাকে। কিন্তু কেন? এতটা ভয় নিয়ে আজও কেন? দুই লাখ মেয়ে তাদের সম্ভ্রম দিয়ে দেশকে রক্ষা করেছিলেন এইজন্য? নাকি মেয়ের শরীরটা তার ভুল? নাকি তার মেয়ে হওয়াই ভুল?
আমরা অনেকে বলি শিক্ষার হার কম এ জন্য এত অরাজকতা চলছে। এটা একটা অযথা দোহাই। কথাটা হওয়া উচিত প্রকৃত শিক্ষার অভাব। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্ভবত মেধাবীদের মধ্য থেকেও বেছে নেওয়া কিছু মেধাবী আসে। কিন্তু এত শিক্ষিত লোকে ভরা জায়গায়, এত মেধাবীদের জায়গায় যৌন নিপীড়ন আরো বেশি। ১০টা ছেলে কোথাও বসে থাকলে তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নিজেকে খাঁচায় আটকা থাকা বাঘের সামনে মাংসপি-ের মতো মনে হয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে ছেলেদের দৃষ্টি এমন হয়? এতটা অনিশ্চয়তা নিয়েই যখন বাঁচতে হবে তাহলে একাত্তরে এত মায়ের কোল খালি করার কী দরকার ছিল? এতগুলো স্ত্রীকে বিধবা করার কী দরকার ছিল? এতগুলো মেয়েকে ভাইহারা করার কি দরকার ছিল?
শুধু জানতে ইচ্ছা করে একটি মেয়ে আসলে কোথায় নিরাপদ যখন সে এক বছরের শিশু, যখন সে ২০ বছরের যুবতী, যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যখন সে পুলিশ, যখন সে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, যখন তার নিজের কাঁধেই অস্ত্র, কোনো ক্ষেত্রেই তো আমি বা একটা মেয়ে নিরাপদ না।
শুধু সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত শারীরিক গঠনের কারণেই তো একটা মানুষ ক্রমশ মেয়ে হয়ে ওঠে। এই জন্য বারবার মনে হয়, ইস যদি মানুষ হয়ে বাঁচতে পারতাম
আসুন না, সবাই মিলে আগে নিজেকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়