আজ ডেলফিনের জন্মদিন

হুমায়ূন কবির

আরো একজন প্রিয়দর্শিনী। এ শহরে আমার অসংখ্য বান্ধবীদের একজন। বছর পনেরো যাবত আমার রোগী। রিসেপশন রুমে বসে দিব্যি সবাইকে গল্প শুনায়, জানো, আমি চল্লিশ বছর এই ডাক্তারের কাছে আসছি। লোকেরা হাসে। অফিসের মেয়েরা অনেকবার শুধরে দেয়ার চেষ্টা করেছে। কাজ হয়নি। শেষমেষ বাদ দিয়ছে। থাকুক না ওইটুকু ভুল নিয়ে। কী আসে যায়।
ডেলফিন স্কুলে যায়নি। লিখতে পড়তে জানে না। জীবনে কখনো গাড়ি চালায়নি। লাইসেন্সও নেই। স্টেট আইডি কার্ড দিয়েই চালায় সব কাজ। এ শহরের সবই বড় হয়েছে ডেলফিনকে হাঁটতে দেখে দেখে। ডেলফিন দিনভর রাস্তায় হাঁটতো। ফেলে দেয়া অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান, প্লাস্টিকের বোতল এগুলো সংগ্রহ করে রিসাইক্লিং সেন্টারে নিয়ে বিক্রি করতো। এই করেই দিন চলতো বেশ। খরচ তো নেই তেমন। বিয়ে শাদি করেনি। পুরোনো একটা ট্রেইলরেই সংসার। আধপাগল একটা ছাট ভাই থাকে তাঁর সঙ্গে। একদিন বোতল কুড়িয়ে ঘরে ফিরে দেখে বাড়িতে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। দমকলের লোকেরা আগুন নেভাতে ব্যস্ত। সবার ধারণা, মাতাল ভাইটা সিগারেট হাতে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। বিছানায়ই মারা যায়। বের করা যায়নি।
ডেলফিনকে আমার কাছে পাঠিয়েছিল তার ডাক্তার। কাশিটা কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। শ্বাসকষ্টও বাড়ছে। লক্ষ করলাম হাসপাতালে ভর্তি করলে সামান্য চিকিৎসায়ই ভালো হয়ে উঠে। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরই আবার শুরু। তার মানে বাড়িতেই কিছু একটা সমস্যা। ডেলফিনের সঙ্গে আলাপ করে কোন সুরাহা হলো না। বাড়িতে হেলথ ডিপার্টমেন্টের লোক পাঠিয়ে খোঁজ খবর নেয়ার একটা ব্যবস্থা আছে এখানে। কিন্তু তার প্রয়োজন হলো না। বোন এসে দেখা করলো আমার সঙ্গে। জানো, সে তো সারাদিন কাটায় মুরগির সঙ্গে। কাশবে না কেন? কতো বার না করেছি। মানা শুনে না। আমার নার্স খোঁজখবর নিয়ে জানালো ঘটনা সত্যি। বাড়ির পরিবেশ খুবই অস্বাস্থ্যকর। শ’খানেক মুরগি রাখা আছে পেছনে বেড়া দেয়া একটা ঘেরায়। ডেলফিন দিনের অর্ধেকটা সময় চেয়ার নিয়ে বসে থাকে সেখানে। আর খুদ ছিটিয়ে ছিটিয়ে দেয় একটু পরে পরে। পরের ভিজিটে মিন মিন করে স্বীকার করলো বিষয়টা। তবে বললো, খাবার দেয়ার সময়ই শুধু যায় ওখানে। আরো অনেকেই এরকম করে। কই কারো তো অসুবিধা হয় না? আমার ডায়াগনোসিসের সমস্যা হলো না। সেরোলজিতেই ধরা পড়লো সব। তবে সমস্যা দেখা দিলো ডেলফিনকে নিয়ে। মুরগি ছাড়া বাঁচবে কি করে? কি করবে? কিছু তো করার নেই। এই একটাই আনন্দ তার। বাড়িটা আগুনে পুড়ে সমাধান করে দিলো সব।
সেই থেকে নিজ ঘর ছাড়া ডেলফিন। এক বোনের সঙ্গে থাকে। বড়ই নাজুক অবস্থা। বোন নিজেই অসুস্থ। ডেলফিনও অসুস্থ। কে কাকে দেখে? যে ডেলফিন হেঁটে হেঁটে চষে বেড়াতো সারাটা শহর এখন তাঁর হাঁটতেও কষ্ট। শ্বাসকষ্টটা নাই। তবে হাঁটুতে ব্যথা। কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করবে না। আজকাল আমার অফিসের মেয়েদের কেউ গিয়ে নিয়ে আসে। প্রায় সময়ই শার্লি এ কাজটা করে। মাঝে মাঝে ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে বাড়ি দিয়ে আসে। গাড়ি বারান্দায় শার্লির চড়া গলা শুনলেই বুঝি আজ ডেলফিনের দিন। ডেলফিন, ডাক্তারকে অযথা ঝামেলা দিও না। আজ তোমাকে ভর্তি করা যাবে না। সপ্তাহ খানেক আগেই তো হাসপাতালে ছিলে। আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। আজ শুধু ওষুধের রিফিল পাবে। বুঝেছো তো?…
ডেলফিনের হাসপাতালে থাকার আবদার সবসময়। বেশ বুঝতে পারি, হাসপাতালের পরিবেশ তার কাছে ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে যদি ভর্তি করি। সামান্য অসুখকেই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলবে। তার নিরাশ চোখ দেখে না বলতে খুব খারাপ লাগে। তাই শার্লিকে বলা আছে, আসার সময়ই যেন বুঝিয়ে শুনিয়ে আনে। সেবার সত্যি সত্যিই খুব অসুস্থ। বাড়ি থেকেই শার্লির টেলিফোন। ডেলফিনকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে কেন? একশ দুই ডিগ্রি জ্বর। শ্বাস নিতে পারছে না। অথচ ভর্তির কথা বলছে না। তার মানে অবস্থা আসলেই খারাপ। কথাটা ঠিক। অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তবে ভালো হয়ে উঠলো। এবার আরো দুর্বল অবস্থা। নার্সিং হোম ছাড়া উপায় নেই। আবারো সমস্যা। ডেলফিন জেদ ধরলো, নার্সিং হোমে যাবে না। সেখানে গেলেই মারা যায় মানুষ। তাহলে উপায়? প্রথমে হোম হেলথ নার্সিং ভিজিট চললো যতোদিন পারা যায়। কিন্তু এভাবে বেশিদিন চালানে যায় না আজকাল। আধপাগল বয়স্কদের থাকার জন্য সরকারি একটা ব্যবস্থা আছে। তবে সামান্য খরচ দিতে হয়। ডিমেনসিয়ার কথা বলে আর একটু ধরাধরি করে শেষমেশ সেখানে একটা ব্যবস্থা হলো। সবার সঙ্গে থাকার এই অনভ্যস্ত জীবন মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছে প্রথম প্রথম। তবে এখন ভালোই আছে।
সেদিন দেখা গেলো ডেলফিন বসে আছে রিসেপশনে, সবার সঙ্গে গল্প করছে। আমার রিসেপশনিস্ট কেলি এসে বললো, জানো, আজ ডেলফিনের জন্মদিন। সে মনে হয় জানেই না। মেয়েরা বললো, একটা সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়? ঝটপট ব্যবস্থা হয়ে গেলো। একটু পরেই ডেলফিনের ডাক পড়লো। কুঁজো হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ঢুকলো ডেলফিন। আমার সামনের চেয়ারে বসতে বসতে কথার শুরু।
তোমার মা কেমন আছেন, ডাক্তার।
সাধারণত আমার কুশলাদি দিয়েই শুরু হয়। এরপরে বলা হবে, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। কয়েকদিন রাখা যায়না হাসপাতালে? একটু ঠিকঠাক করে দিবে। পেছন থেকে শোনা গেলো শার্লির গলা।
ডেলফিন, আজ তোমার বিশেষ দিন। বলো তো কি?
ডেলফিনের সরাসরি উত্তর।
বুঝেছি। ভর্তি করবে হাসপাতালে।
শার্লি গলা চড়িয়ে বললো, না ডেলফিন। আজ তোমার জন্মদিন। মেয়েরা সবাই একসেঙ্গে বলে উঠলো, হ্যাপি বার্থডে।
ডেলফিনের মুখে হাসি দেখা যায় না খুব একটা। গিফট ব্যাগটা হাতে নিয়ে আজ একটা দুর্লভ হাসি দিলো। সলজ্জ হাসি। অনেকটা আমাদের গ্রামের বধূদের লাজুক হাসির মতো। একটু পরেই ধাতস্থ হয়ে কথা শুরু করলো।
তাহলে আজ আর ভর্তি করবে না। তাই তো?
এবার আমরা সবাই শব্দ করে হেসে ফেললাম। ডেলফিনও হাসলো। তবে দাঁত বের করা নিঃশব্দ হাসি।
খ্যাতনামা চিকিৎসক ও মননশীল লেখক, টেনেসি।