আত্মকথনে সেই একুশ

ওয়াহেদ হোসেন
চট্টগ্রাম শহর। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর। সেই একুশের কথা। দৈনিক মিছিল। শুরু যে কবে মনে নেই। ১৯৫২ সাল। মাস ফেব্রুয়ারি। চট্টগ্রাম জেলা কোর্ট সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর। পাহাড়জুড়ে তিনতলা বিশাল বিল্ডিং। বর্তমানে চারতলা। তারই পূর্বে রাস্তার ওপাশে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই ইংলিশ স্কুল। সেটাও পাহাড়ের ওপরে। বইপত্র হাতে প্রত্যেক দিন স্কুলে যাই। ক্লাসরুমে ঢোকা সম্ভব হয় না। কলেজের ছাত্ররা আসেন, তারা স্কুলের ছাত্রদের আগলে বের করে আনেন। আমরা সড়কে নেমে আসি। সংগঠিত সারি ধরে বড়দের আদেশ-নিষেধ মেনে পথ চলি। স্কুল থেকে বেরিয়ে জেনারেল পোস্ট অফিস হয়ে রেয়াজউদ্দিন বাজারের পূর্ব পাশ দিয়ে পাবলিক লাইব্রেরির সামনের রাস্তা ধরে সিনেমা প্যালেসের সামনে দিয়ে লালদীঘি ময়দানে এসে জড়ো হই। শুরু হয় বক্তৃতা। কলেজ ছাত্ররাই বক্তা। তারা কি যে বলেন কে জানে। আমি সিক্সের ছাত্র, স্কুল করতে হয় না। মার্বেল ডাংগুলি খেলা খেলে বাড়িমুখো রওয়ানা দিই।
বায়ান্নোর সেই উত্তাল দিনে ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখে ঢাকার রাজপথে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপ দিতে ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছেন, এসব ওই সময়ে বুঝিনি। বোঝার বয়স হয়নি বলেই। কতদিন কত মাস অমন মিছিল করেছি, খতিয়ানে জমা নেই। কদমতলায় বাসা, আর স্কুল বেশ দূরে কোতোয়ালী থানার গা ঘেঁষে উত্তরে পাহাড়ের ওপর। বলতে গেলে তিন মাইল। প্রতিদিনই স্কুলে যাই; মিছিলে যোগ দিয়ে অন্যরকম আনন্দে দিন পার হয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধবই তখন আসল। তাদের সাথে আড্ডা না দিলে, তাদের সাথে নিত্য স্কুলসময় খেলায় না মাতলে আমাদের পেটের ভাত হজম হয় না। বাবা অফিসে, মা ঘরকন্নায়। স্কুল সময়টায় নিজেদের কাছে আমরা রাজা মহারাজা; আনন্দসাগরে ভাসি। লালদীঘি ময়দানে বড়রা যা বলেন তা আমাদের কানের এক পাশ দিয়ে ঢুকলেও অতি তাড়াতাড়ি অপর কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। মিছিলকালে আমাদের কণ্ঠে থাকে: ‘রাষ্ট্রভাষা রাষ্ট্রভাষা- বাংলা চাই, বাংলা চাই; পুলিশী জুলম পুলিশী জুলম- চলবে না চলবে না, নূরুল আমিনের নূরুল আমিনের- কল্লা চাই কল্লা চাই।’ প্রতিদিনের মিছিলে অংশগ্রহণ যেন এক একটা রাজ্য জয় করার মতো বিষয়। বলা দরকার, সে সময়ে আমাদের স্কুলে উর্দু সেকশন ছিল। সেখানে উর্দুভাষী ছাত্ররা পড়তো। তারা কোনোদিন আমাদের মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেনি।
দিন যায়, ইতিহাস সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের জনক ও বাংলাভাষার শত্রু কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ যারা বাংলাভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন তারা বাধ্য হন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে মেনে নিতে। উল্লেখ্য, বাংলা ভাষার চরম দুই শত্রু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান বায়ান্ন সাল আসার আগেই মরহুম হয়ে যান। ১৯৫৬ সালে উর্দুর সাথে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলাভাষাকে লালনে জন্ম হয় বাংলা একাডেমি। বাংলা উন্নয়ন বোর্ড আগে থেকেই ছিল।
জীবনের চড়াই-উৎরাইয়ে ১৯৫৯ সালে ঢাকার বাসিন্দা হলাম। সংবাদপত্র অফিসে কম্পোজের কাজ শিখলাম। পত্রিকা অফিসে কাজ করি। লেটার প্রেসে অক্ষর সাজিয়ে পত্রিকার পাতা ভরাই একদল মানুষ। প্রুফবয়, হেলপার, মেসিনম্যান, প্রেস সেকশনের ফোরম্যান, প্রেস ম্যানেজার, প্রুফ রীডার, সাব-এডিটর, বার্তা সম্পাদক, স্টাফ রিপোর্টার, সম্পাদক এমনি নানা পদের একদল পত্রিকা-সেবাদাস। কর্মচারী হিসেবে নিয়মিত একটা পত্রিকা বিনে পয়সায় পাই, প্রতিদিন পড়ি, রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হয় মন-মানসে। একুশ ফেব্রুয়ারিতে সংবাদপত্রের ক্রোড়পত্র বের হয়। তাতে লেখা থাকে একুশের নানান কথামালা, স্মৃতিতর্পণ। একুশ যে কী জিনিস বুঝে উঠতে চেষ্টা করি। প্রত্যেকটা বছর ফেব্রুয়ারি মাস আসে, ছাত্র-জনতার মুখে প্রতিবাদ ওঠে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। বাংলাভাষা স্বীকৃতি মিললেও কার্যত আইয়ুবশাহীর মার্শাল ল’র দাপটে সবকিছু নীরব হয়ে যায়। একুশের স্মৃতির শহীদ মিনারকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।
কৌসুলী হন ছাত্র-জনতা ও নেতৃবৃন্দ। একুশের প্রহরের আগাম রাতে কালো ব্যাজ বানানো হয় হাজার হাজার। আলপিন সেফটিপিন দিয়ে বুকে সেঁটে দেন বা সেঁটে নেন ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ। একুশের প্রভাতফেরিতে রাজপথ নীরব মিছিলের নগর হয়। মহানগরের আনাচে-কানাচে থেকে বাকহীন মিছিল ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে আজিমপুর গোরস্থান হয়ে শহীদ মিনারে সমবেত হয়। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনারের পাদদেশ। আজিমপুর কবরস্থানে হাজার হাজার কবরের মাঝে ভাষা আন্দেলনের শহীদের মধ্যে কবর আছে মাত্র তিনজনের। শহীদ আবুল বরকত, শহীদ আবদুল জব্বার এবং শহীদ শফিউর রহমানের। আর কোনো কবরের খোঁজ পাওয়া যায়নি, যাবেও না কোনো কালে। আজিমপুরে আছে আরও একজনের কবর, তিনি শহীদ মিনারের স্থপতি হামিদুর রহমান। বাংলা একাডেমি চত্বরে আছে পাঁচজনের ভাস্কর্য: যথাক্রমে শহীদ আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান ও আবদুস সালামের।
সেই বায়ান্ন হতে আজ দু’ হাজার তেইশ পর্যন্ত একাত্তর বছরে কত শত সহস্র বাংলা বই লেখাজোখা হয়ে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে; কত গল্প প্রবন্ধ কবিতা গান সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর একটা কবিতা তো গানের মর্যাদা পেয়ে একুশের শোকানন্দ হয়ে রয়েছে। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি . . .”
সারা দুনিয়ায় এখন বাঙালির জয় জয়কার। যদি সেই বায়ান্ন সালে পাকিস্তানীদের রণদামামার জয় হতো, আমরা তখন নিজ দেশে পরাশ্রয়ী হয়ে সদা নাস্তানাবুদ থাকতাম। পাকিস্তানীদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর চলতো আমাদের জীবন। পৃথিবী জানতো না কখনো যে, বাঙালি একটা জাতি আছে যারা নির্ভীক, যারা অনেক কিছু জয় করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম হতেন উপেক্ষিত। বাংলাদেশে চাষ হতো উর্দুর গাছ-আগাছা। বাঙালি হারিয়ে যেতো চিরতরে। আজ গা শিউরে ওঠে এসব কথা ভাবতে।
একটু আত্মকথনের পাড়া বেড়িয়ে আসি।
১৯৬১ ও ৬৩ সালে ম্যাট্রিক ও এইচ এস সি পাস করলাম জেলা শহরে বসে। তারপর ঢাকা। দৈনিক সংবাদে প্রুফ রীডারের চাকরি। বেশির ভাগ সময় আমাকে নাইট ডিউটি করতে হতো। মধ্যরাতের পরে সম্পাদকীয় কম্পোজ হয়ে আসে প্রুফ সেকশনে। থার্ড প্রুফ সম্পন্ন হওয়ার পর এক গুরুদায়িত্ব। টেলিফোনে সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীকে ঐ দিনের সম্পাদকীয় পড়ে শোনাতে হবে। তিনি শুনবেন, কোথাও যোগ-বিয়োগ বা সংশোধন থাকলে তা পালন করে, তবেই যাবে প্রেসে ছাপার জন্যে। সম্পাদক এবং প্রুফ রীডারের পদের মধ্যে ব্যবধান ঢের। কখনো সামনাসামনি না হওয়ায় তার জলদগম্ভীর কণ্ঠের সাথে ফোনে কথা বলাও এক দুরূহ বিষয়। প্রুফ সেকশনের অনেকেই এ দায়িত্ব নিতে ভয় পেতেন। প্রুফ সেকশনের ইনচার্জ বললেন আমাকে, ‘তুমিই পড়ে শোনাও, আমি তো আছিই।’ নেতিয়ে থাকা অবস্থাতেও দুরু দুরু সাহস নিয়ে এ কাজটি করতাম। চুপি চুপি বলি, যেমন ছিলো সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর বিশাল বপু, তেমন ছিলো তাঁর কলমখানা। মোটা রাইটার কলম দিয়ে লেখা কালিতে লেপটে কতক শব্দ পড়া ছিল কষ্টকর।
মফস্বল থেকে শত শত নিজস্ব সংবাদদাতা খবর পাঠাতেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন আবদুল গফুর, আজও তার নামটা আমার স্মরণপটে। সম্ভবত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের সংবাদদাতা। তার হস্তাক্ষর উদ্ধার করা বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু লেখার আলাদা একটা ধাঁচ ছিল। সেটা যে পারতো, তার পক্ষে যেকোনো লেখাপাঠ সহজ সরল ডালভাত।
দৈনিক সংবাদ অফিসের শহীদ সাবের হলো এক না-বলা কথার কথকতা। বাড়ি চট্টগ্রাম। ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে তিনি পাগল হয়ে যান। পথে পথে ঘোরেন। কেউ কিছু দিলে খান, কিছু না পেলে অনাহারে দিন কাটে। দৈনিক সংবাদে সেই দিনে রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন ছিলেন চিন্তাশীল লেখক। বার্তা সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, শিশুকিশোরদের পাতা খেলাঘরের দাদাভাই, মনজুর আহমদসহ আরও কতজনÑ সবার নাম তো আর মনে থাকার কথা নয়।
বংশাল রোডে দৈনিক সংবাদ অফিসের সামনে সিনেমা হল। আশপাশে বেশ কটা রেস্টুরেন্ট। সেখানে বাজতো হিন্দি গান, ‘জিয়া বেকারার হ্যায় …’। ডিউটি শেষে শেষ রাতে চাপাতি চনাডাল খেয়ে ঘরমুখো হতাম।
বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে বিএ পাস করে এবারের চাকরি দৈনিক ইত্তেফাকে। সেই প্রুফ সেকশনে। সেখানে বার্তা সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেন, বার্তা সেকশনের ইনচার্জ আসাফউদ্দৌলা রেজা। প্রুফ সেকশনের প্রধান কাজী সিরাজ। উপরের পদের বিবরণে গেলাম না। আমি প্রুফে কাজ করি, অবসর সময় বার্তা বিভাগে সাব-এডিটর হওয়ার জন্যে শিক্ষানবীশ হয়ে হাত পাকাতে থাকি। ১৯৭০ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে চাকরি হয়ে যায়। সংবাদপত্র জগত থেকে ছিটকে পড়ি। এরপর জীবনে আসে সুখ-দুঃখ ও নানান টানাপোড়েন।
পাকিস্তানে নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে শেষ হয় একসময়। ১৯৭০-এ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বজ্রকণ্ঠের ভাষণ, পাকিস্তানের সামরিক জান্তার নানান কূটকৌশলে আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা না দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া, শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানে বন্দীত্ব, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে নিয়ে সরকার গঠন করে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও ভারতের সহযোগিতায় ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত গেরিলা লড়াই ও সম্মুখযুদ্ধে নতুন জাতীয় পতাকা নিয়ে বাংলাদেশ নামক এক নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটে। যে দেশটি বর্তমানে ‘বাংলাদেশ’ নামে পৃথিবীতে সমাদৃত।
একুশ আমার হৃদয়পটে চিরঅম্লান। বাংলা আমার প্রাণ। এখন নিউইয়র্ক নগরের বাসিন্দা। যাই সাহিত্য আসরে কখনো কখনো। বিশেষত হলিস কুইন্সের সাহিত্য সভায় আমার যোগদান হয় বেশি। কুইন্স লাইব্রেরির শাখা-প্রশাখা নিউইয়র্ক নগরজুড়ে বাংলাভাষীদের মনের খোরাক মেটায়, বাংলা ভাষার সুন্দর সুন্দর বই আমার প্রাণে শান্ত সমীরণ বহায়।
দু হাজার তেইশ সালের একুশও আমার পরাণে বাঁশি বাজাচ্ছে। আমার কণ্ঠে অনুরণিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’

-জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক