আদর্শ সাংবাদিকতা সংকোচনের পরিণতি

স্বাধীন সাংবাদিকতা, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা, সমাজ অগ্রগতিতে সাংবাদিকতার ভূমিকা, আদর্শ সাংবাদিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা সংকোচনের পরিণতি-এসব নিয়ে সাংবাদিকতার সূচনাকাল থেকেই বহুমুখী কথাবার্তা, বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা হয়ে আসছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মুখে ঢালাওভাবে চিকিৎসকদের সম্পর্কে শোনা যায় ‘কসাই’ আর সাংবাদিকদের সম্পর্কে শোনা যায় ‘আদর্শহীন, চামচা-দালাল, তদবিরবাজ, বিবেক বিক্রেতা’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব কথা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে একটি তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে এই বক্ষ্যমান সম্পাদকীয়তে। তাতে সাংবাদিকেরা এসব অপবাদ মাথায় নিয়েও কতটা ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, সে কথা কিছুটা হলেও বুঝতে পারা যাবে। সেই ঝুঁকির মুখে রয়েছে সম্মানহানি, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়া, ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া, এমনকি জীবনহানি পর্যন্ত।
তথ্যটি হচ্ছে এমন : ‘জাতিসংঘের ইউনেসকোর হিসাব বলছে, সারা বিশ্বে প্রতি ৫ দিনে কর্তব্যরত অবস্থায় একজন করে সাংবাদিক নিহত হন। বিভিন্ন পত্রিকার সূত্র থেকে জানা যায়, গত দেড় যুগে বাংলাদেশে অন্তত ৪০ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আহত কিংবা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন অসংখ্য সাংবাদিক। সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, মুক্ত সাংবাদিকতায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ওপর থেকে নিচ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। সংস্থাটির হিসাবে বাংলাদেশ ২০১৬-এর তুলনায় দুই ধাপ নেমেছে!’
বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অবস্থা নিয়ে আরও দুটি আন্তর্জাতিক সংগঠন তথ্য দিয়েছে, যা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন প্রটেক্ট টু জার্নালিস্টের তথ্যমতে, ‘বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যাকারীদের দায়মুক্তির ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল (ভয়াবহতার তীব্রতায় ওপর থেকে নিচে) ১১-তে।’ অন্যদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকেল-১৯ মনে করে, ‘বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি, আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার ৩৫৫ বার লঙ্ঘিত হয়েছে।’
এ রকম একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে সাংবাদিক নিপীড়নে দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থার দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু থাকার কারণে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী-পুলিশ, র‌্যাব কিংবা মন্ত্রী-এমপি এবং সরকারি দলের ক্যাডার হিসেবে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালালে, হয়রানি, অসম্মান, অমর্যাদা করলে তাদের দায়মুক্তি পেতে দেখা যায়। এতে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা হ্রাস না পেয়ে আরো বৃদ্ধি পায়। অন্য দেশে বাংলাদেশের মতো দায়মুক্তির সংস্কৃতি নেই। সেখানে সাংবাদিক নির্যাতন হলে কর্তৃপক্ষ হাত গুটিয়ে যেমন বসে থাকে না, অপরাধীরাও দায়মুক্তি পায় না। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু নেই। উল্টো জবাবদিহির সংস্কৃতি চালু রয়েছে। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় একটি প্রতিষ্ঠান আছে। তার নাম প্রেস কাউন্সিল, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এতটাই গভীর ঘুমে অচেতন যে সাধারণ মানুষ দূরে থাক, সাধারণ সাংবাদিকেরাও তার অস্তিত্ব টের পান না।
বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা, অভিযোগ পাওয়া যায়, ইদানীং ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডারদের দ্বারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রকাশ্যে তারা সাংবাদিক পিটিয়ে রক্তাক্ত করেও দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পাকিস্তান আমলের চেয়েও বেশি স্বাধীনতা ভোগ করার কথা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময় থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বাঙালি সাংবাদিক সমাজ গৌরবময় ভূমিকা পালন করে আসছে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র হিসেবে ইত্তেফাক, সংবাদ এবং সাংবাদিক হিসেবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, আবদুল আওয়াল খান, মোহাম্মদ ইদ্রিস, সিরাজুদ্দীন হোসেন, এবিএম মূসা, ফয়েজ আহমেদ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন স্বাধীনতাসংগ্রামকে সংগঠিত করতে এবং মুক্তিযুদ্ধকে সফল পরিণতি দিতে। এ জন্য তারা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুর শিকার হয়েছেন বারবার। মুক্তিযুদ্ধে বহু সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন ১৯৭১ সালে।
এসব উজ্জ্বল অবদানের পুরস্কার হিসেবে স্বাধীন দেশে যে পরিবেশ এবং সহযোগিতা সাংবাদিক সমাজের পাওয়ার কথা ছিল, তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন স্বাধীনতা অর্জনের শুরু থেকেই। ১৯৭৪ সালে প্রথম আঘাত আসে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠন করে ৪টি সংবাদপত্র রেখে আর সব পত্রিকা বন্ধ করে দেন এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ক্ষেত্র সংকুচিত করা হয়। তখন থেকেই স্বাধীনতার বয়স যত বেড়েছে, ক্ষমতায় থাকা মানুষের মুখে সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও কল্যাণের কথা যত উচ্চারিত হয়েছে, সাংবাদিকতার পরিবেশ এবং সরকারি আইন তত কঠিন এবং কঠোর হয়েছে। বাকশালের পর প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট, সংবিধানে ৫৭ ধারা সংযোজন, তা বাতিল করে সর্বশেষ কড়াই থেকে সরাসরি চুলায় ফেলে দেওয়ার মতো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার দৃষ্টান্ত। যেখানে খুন করলেও একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ধরার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার বিধান করা হয়েছে, সেখানে সামান্য একজন কনস্টেবলও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিনা অনুমতিতে শুধু সন্দেহ হলেই যেকোনো পর্যায়ের একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করতে পারবে! তার ক্যামেরা, কম্পিউটার, অন্যান্য কাগজপত্র জব্দ করে নিয়ে যেতে পারবে!
বর্তমানে বাংলাদেশে জনগণের মুখে অভিযোগ শোনা যায়, স্বাধীন সংবাদপত্র, মুক্ত সাংবাদিকতা এসব এখন বন্দী, সরকার এবং মালিকের হাতে। সমাজের দর্পণে এখন সরকারের কালো থাবা এবং মালিকের হস্তক্ষেপ। কতিপয় সাংবাদিককে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, লোভের টোপ ফেলে কিংবা দমন-পীড়নের ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকতার আদর্শ ও মানবিকবোধকে সংকুচিত ও খর্ব করা হচ্ছে, পরিণতির কথা না ভেবেই। আজ সাংবাদিকতার পরিবেশের যে অবস্থা, তাতে সাধারণ মানুষ গভীরভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, ইদানীং সরকারের সংকোচন ও নিবর্তনমূলক নীতি এবং মুষ্টিমেয় সাংবাদিকের লোভের কাছে সৎ ও আদর্শ সাংবাদিকতা এবং মুক্ত বিবেকের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। সৎ ও সঠিক সাংবাদিকতার অনুপস্থিতির ফলে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে সর্বস্তরে। এই ফাঁকে ঘটে চলেছে সমাজের এক অশুভ রূপান্তর। সেই রূপান্তরে সমগ্র সমাজটাই কলুষিত হতে চলেছে। এ রকম পরিবেশে মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাংবাদিকদের কলম ব্যর্থ হচ্ছে।
অন্যদিকে সাংবাদিকতায় অনৈতিকতা ও অবক্ষয় যত বাড়তে থাকবে, সমাজের পতন তত ত্বরান্বিত হবে। সমাজে অন্ধকার তত ঘনীভূত হতে থাকবে। আমরা যে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বিশ্বাস করে আসছি সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ এবং দুর্বল ও অসহায়দের ভরসা, বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রে সমাজের সেই কাক্সিক্ষত চেহারা দেখা যায় না। মানুষ সেই ভরসাও আর পায় না।
এই অবক্ষয়ের বড় কারণ, সমাজের ক্ষমতাবানরাই কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের মর্যাদায় বিশ্বাস করে না, তা নয়। সাংবাদিক সমাজকেও নিজেদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় পূর্বের ন্যায় তৎপর দেখা যায় না। অথচ সংবাদপত্র এবং সাংবাদিক সমাজ যদি সম্মান, মর্যাদা এবং স্বাধীনতা ফিরে না পায়, তবে দেশ, সমাজ এবং মানুষও মর্যাদা পায় না। সমাজ থেকে অন্যায় এবং অন্ধকারও দূর হয় না। একটি সমাজ ও রাষ্ট্র সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গুজব-গুঞ্জনে। স্বাধীন সাংবাদিকতা না থাকলে গুজব এবং গুঞ্জন পল্লবিত হয়ে সত্যকে ঢেকে দেয়। অন্ধকারকে ঘনীভূত করে।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রথমেই সাংবাদিকতার শত্রু ও মিত্রকে চিহ্নিত করতে হবে। সাংবাদিকদেরকেও তাদের করণীয় নির্ধারণ করে ‘কোর্স অব অ্যাকশন’ ঠিক করতে হবে। লোভের খোলস থেকে বের হয়ে এসে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হতে হবে। বিবেককে মুক্ত করে সৎ সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। আদর্শ সাংবাদিক এবং সৎ সাংবাদিকতার নিদর্শন সমাজে কম নেই। সাহসের সঙ্গে সেই পথ অনুসরণ করে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারলে বর্তমানের কাঁটা বিছানো পথ এবং আঁধার পাড়ি দিয়ে আলোর ঠিকানায় পৌঁছা খুব কঠিন নয়। তাতে ব্যর্থ হলে আজকের পরিবেশ আগামীতে আরও কঠিন ও দুর্গম হবে। জনগণ, সরকার, রাষ্ট্র সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।