আফ্রিকা ও এশিয়ায় ২৫ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যাবে

জাতিসংঘের আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিনিধি : জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আশঙ্কা, করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে কমপক্ষে ২৫ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ খাদ্যসংকটে পড়বে। কোনো কোনো দেশে তা মারাত্মক আকারে দেখা দিতে পারে। গত মে মাসে প্রকাশিত এফএওর প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই ভয়ংকর বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা তারা করছে। সাউথ সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তানে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তাদের। ভারত, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান, রাশিয়াসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বস্তিদায়ক ও সুখকর যে বিশ্বের দুই ডজনেরও বেশি দেশের দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যসংকট কবলিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও জাতিসংঘের এই তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নেই। জাতিসংঘ বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির প্রশংসা করেছে। তবে তাদের আশঙ্কা, মানুষের মধ্যে খাদ্যশস্য মজুদের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে তা সংকট তৈরি করতে পারে। বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে।
কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে সরকার বিশেষভাবে সতর্ক রয়েছে। উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ন্যায্যমূল্য যাতে নিশ্চিত হয়, সে ব্যাপারেও সরকার দৃষ্টি রাখছে। সরকারের হাতে এখন ১১ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে।
এবার বন্যা ব্যাপকভাবে দেখা দিলে তা মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। উজান থেকে সমানে পানি এসে বহু এলাকা প্লাবিত করছে। ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। সামনে বন্যা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের ভান্ডারে খাদ্যশস্য মোটামুটি সন্তোষজনক মজুদ থাকলেও করোনাভাইরাসে লকডাউন ও মানুষের কর্মহীনতা, অভাব-অনটনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনামূল্যে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে হয়েছে। শহরাঞ্চল, গ্রামাঞ্চলে প্রান্তিক কৃষক, দরিদ্র, স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, ঠেলাচালক, মুটে মজুর, পাড়া-মহল্লার হাটবাজারের ছোট ছোট দোকানি, শহরাঞ্চলে বাসাবাড়িতে কর্মরত লাখ লাখ দরিদ্র নারী কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাদের বাঁচিয়ে রাখার বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখছে। এ ব্যাপারে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও মানুষের অভাব-অনটন বিবেচনায় খুবই কম। বহু জায়গায় সরকারি ত্রাণ তারা পায়নি। ধনী, অবস্থাসম্পন্ন মানুষকেও খুব একটা সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করতে দেখা যায়নি। এবারের মতো দুস্থ, অতিদরিদ্র, অনাহারি মানুষের পাশে এগিয়ে না আসার ঘটনা অতীতে কখনোই দেখা যায়নি। সরকারি ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি, লুটপাটের ভয়ংকর চিত্রও আগে দেখা যায়নি।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের কোথাও যাতে খাদ্যসংকট দেখা না দেয়, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা না থাকে, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সতর্কবার্তার পর সরকার এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা নিয়েছে। কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি সর্বোচ্চ পরিমাণে সংগ্রহ, বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন, সংগ্রহ, সরবরাহ এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহ, মজুদ ও বাজার পরিস্থিতি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিয়মিত মনিটর করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে কেউ চালসহ খাদ্যসামগ্রী মজুদ, দ্রব্যমূল্য পরিকল্পিতভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি না তা নজরদারি করা হচ্ছে।
বন্যার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন সরবরাহ ব্যাহত হয় কি না তা সরকারের জন্য চিস্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যায় সম্ভাব্য উৎপাদন সংকট কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়ে ভাবছেন নীতিনির্ধারকরা। কোভিড-১৯-এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা করছে এফএও। তারা ক্ষুধা, দরিদ্র, অনটন, হাহাকার, অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বেকারত্ব ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষকবলিত হওয়ার আশঙ্কা করা না হলেও বাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে তিন কোটি মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হওয়ার পর দেশের চাহিদা মেটাতে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য প্রতিবেশী ভারত থেকে বৈধ, অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়। ভারতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হলে এবং অবৈধ পথে আমদানি নিয়ন্ত্রিত হলে স্থানীয়ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজসাধ্য হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গমের সরবরাহ ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখনই লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের খাদ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপর সরকার গোড়া থেকেই সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ৭৫-এর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করে আসছেন। চালের উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারমূল্য গত মেয়াদে ও বর্তমানেও স্বাভাবিক রাখতে পারার ঘটনা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত রেখেছে। তার পরও এবারের ভয়ংকর কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মানুষকে বিচলিত, অজানা শঙ্কায় শঙ্কিতও রেখেছে।