আমাদের একটি সুধীসমাজের গণতন্ত্র কি সোনার পাথরবাটি নয়?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : আমার একটি কলামে গণতন্ত্র সম্পর্কে একটু আলোচনা করেছি। তাতে নানাজন নানা কথা বলছেন। ঢাকার এক বন্ধু টেলিফোন করে বলেছেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগ সরকারের সাফাই গাওয়ার জন্য কলামটি লিখেছেন। তাকে বলেছি, যদি আওয়ামী লীগের সাফাই গেয়ে থাকি, তাহলে দোষটা কোথায়? আপনি আগে বলুন, আপনি কোন ধরনের গণতন্ত্র চান? ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপের গণতন্ত্রের টোরি ভার্সন না লেবার ভার্সন গণতন্ত্র? তিনি বললেন, গণতন্ত্রের একটাই ধরন বা পদ্ধতি। তার কোনো প্রকারভেদ নেই। বলেছি, এখানেই আপনাদের সঙ্গে আমার মতভেদ। ব্রিটেনে টোরিরা ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়ে। তাদের ওপর ট্যাক্সের বোঝা বাড়ে, বড়লোকেরা ট্যাক্স হলিডে পায়। ওয়েলফেয়ার স্টেটের সেবামূলক খাতে বিরাটভাবে অর্থ বরাদ্দ কমানো হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে যুদ্ধ ও অস্ত্র নির্মাণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলে ঘটে এর উল্টোটা। সেবা খাতের অর্থ বরাদ্দ বাড়ে। বড়লোকের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো হয়। ট্রেড ইউনিয়ন শক্তিশালী হয়। ঢাকার বন্ধুকে বলেছি, টোরি ও লেবার পার্টি দুটি দলই দেশ শাসন করে গণতন্ত্রের নামে। নির্বাচিত পার্লামেন্টে দুই দলই আইন পাস করে দেশ পরিচালনা করে। এখন এই দুই দলের গণতন্ত্রে কি প্রকারভেদ নেই? প্রকারভেদ থাকলে টোরি, না লেবারকোন দলের গণতন্ত্র আপনি অনুসরণ করতে চান? কোনটিকে আপনি খাঁটি ওয়েস্ট মিনস্টার ডেমোক্র্যাসি আখ্যা দেবেন? অবিভক্ত ভারত দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দুটি রাষ্ট্রই ওয়েস্ট মিনস্টার ডেমোক্র্যাসি অনুসরণ করবে বলেছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বরখাস্ত করতে পারেন। যে ক্ষমতা ইংল্যান্ডের রানির হাতেও নেই। এই গণতন্ত্রের নাম ইলেকটিভ ডিকটেটরশিপ। গণতন্ত্র নয়, এই ডিকটেটরশিপও উচ্ছেদ করে জেনারেল আইয়ুব খান বন্দুকের জোরে পাকিস্তানে যে শাসনপদ্ধতি প্রচলন করেছিলেন, তার নাম মৌলিক গণতন্ত্র বা নধংরপ ফবসড়পৎধপু। পাকিস্তানের এক চিফ জাস্টিস কায়ানি এই গণতন্ত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ওঃ রং হবরঃযবৎ নধংরপ হড়ৎ ফবসড়পৎধপু। এটা মৌলিক নয় এবং গণতন্ত্রও নয়।’ পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিকদের অধিকার খর্ব হয় এবং তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হন। গণতন্ত্রে এই ধর্মভিত্তিক ভেদাভেদ নেই। রাষ্ট্রে সবার সমান অধিকার। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে কেউ নেই। বাংলাদেশ এই অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে স্বাধীন হয়েছিল একটি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। বিশ্বে তত দিনে গণতন্ত্রের উন্নত পদ্ধতি হিসেবে সোশ্যালিজমের আবির্ভাব হয়েছে। তার নাম সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসিকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এটা বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রের, সামরিক বাহিনীর পাকিস্তানমনা একাংশ ও নতুন ধনীদের সহ্য হয়নি। তারা দেশে গণতন্ত্র নেই বলে প্রচারণা শুরু করে এবং দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়। জাতির পিতাকে সপরিবারের হত্যা করা হয়। সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে সংবিধান থেকে বিদায় করা হয় এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করেননি। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের আইয়ুব খানের অনুসরণে মৌলিক গণতন্ত্রের কায়দায় গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আসলে এই গ্রাম সরকারের কর্তৃত্বও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ছিল না। ছিল আমলাদের হাতে। গণতন্ত্রের যে মূল কথা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার বা ধর্মনিরপেক্ষতা, তা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের পরবর্তী সামরিক শাসক সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংস করে সেখানে বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের স্থান দেন। দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুজনের আমলেই ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল স্তম্ভগুলোকেই ভেঙে ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছে। তার পরও প্রচার করা হয় জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। এ কথা বর্তমান নির্বাচন কমিশনপ্রধানের মুখে শুনে বিস্মিত হয়েছি। রবীন্দ্রনাথ যাদের ‘প-িতমূর্খ’ বলতেন, বাংলাদেশে কি তাদের সংখ্যা বেড়েছে? জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় চেহারা হলো তার পুতুল পার্লামেন্টে একাধিক দল ছিল। কিন্তু তাদের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা বা বাজেটের ওপর ভোটাভুটির কোনো অধিকার ছিল না। এটা নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্র। যে ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপের গণতন্ত্র আমরা পছন্দ করি, তার চেহারাও সব সময় এক ধরনের ছিল না, ৯০০ বছর আগে যখন ম্যাগনাকার্টা স্বাক্ষরিত হয় এবং রাজার হাত থেকে স্বৈরাচারী ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন মনে করা হয়েছিল, জনগণের হাতে বুঝি ক্ষমতা এসে গেল। কিন্তু আদপে তা হয়নি। দেখা গেল, ক্ষমতা এসেছে ব্যারন ও লর্ডদের হাতে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করতে হয়েছে। ব্রিটেনে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার এই সেদিনও ছিল না। গত শতকে ভোটাধিকার আদায়ের জন্য নারীদের আত্মাহুতি দিতে হয়েছে। ব্রিটেনের গণতন্ত্র প্রথমে সামন্তবাদ, পরে ক্যাপিটালিস্টদের কবজায় চলে যায়। গত শতকের গোড়ায় রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার পর ব্রিটেনসহ ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র তাদের দেশেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হওয়ার ভয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে আপস করে ওয়েলফেয়ার বা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়। গণতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ যুক্ত হয়ে জন্ম নেয় সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র বা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি, ব্রিটেনে লেবার পার্টি একটি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল। টোরিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা বারবার ক্ষমতায় বসেছে। আমেরিকা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করেনি। তারা প্রেসিডেনশিয়াল গণতন্ত্রের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফ্রান্সে দীর্ঘকাল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তাদের আর্থ-সামাজিকব্যবস্থার সঙ্গে তার সংগতি না থাকায় তারা প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি গ্রহণ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ব্রিটেনের শাসনাধীন এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ স্বাধীন হয়। তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ গণতন্ত্র অনুসরণ করে। কিন্তু কিছুদিন পর অনুন্নত সমাজব্যবস্থার জন্য বহু দেশ তা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট সুকর্ন গণতান্ত্রিকব্যবস্থার অনেক ছাঁটকাট করেছিলেন এবং তার নাম দিয়েছিলেন কন্ট্রোলড ডেমোক্র্যাসি বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। গণতন্ত্র কোনো ধর্ম বা ইজম নয়। একটি প্রক্রিয়া মাত্র। গত ৩০০ বছরে তার পদ্ধতিগত অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। গণতন্ত্র একটি বিকাশমান ধারা। কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে তার বিকাশ জড়িত। রাতারাতি কোনো দেশে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রের বিকাশ বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সমাজের কায়েমি স্বার্থ তার জন্য দায়ী। সামরিক ও অসামরিক কায়েমি স্বার্থ বারবার নিজেদের স্বার্থে গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে উৎখাত করেছে এবং রাষ্ট্র ও আর্থ-সামাজিকব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছে। জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে এই হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়ে এখন গণতন্ত্রের কাঠামো ফিরে এসেছে। কিন্তু সমাজ ও অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরনো প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার আধিপত্য টিকে রয়েছে। এই আধিপত্য উচ্ছেদ করার জন্য অতি বিপ্লবী বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে কোনো লাভ হয়নি। বরং প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ সমাজশক্তিকে সাহায্য করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মধ্যপন্থা হলো, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিকব্যবস্থাকে কায়েমি স্বার্থবাদীদের কবজা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু তা রাতারাতি করা সম্ভব নয়। প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তিশালী চক্রান্তের মুখে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং কখনো দুই পা পিছিয়ে, এক পা এগিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গতা দিতে হবে। রাতারাতি তা সম্ভব নয়। আরেক পদ্ধতিতে এটা করা যায়। যদি দেশে সমাজ বিপ্লব ঘটানো যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমাজ বিপ্লব ঘটানোর দল নয় এবং সমাজ বিপ্লব ঘটানোর মতো আর্থসামাজিক অবস্থাও বাংলাদেশে এখন বিরাজিত নয়। এ অবস্থায় সামন্তবাদ ও উগ্র ধর্মান্ধদের হুঙ্কার এবং নব্য পুঁজিবাদীদের আগ্রাসী থাবা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হলে আপাতত আওয়ামী লীগের মধ্যপন্থায় কিছুটা আপস এবং কিছুটা লড়াই করে গণতন্ত্রের দুর্বল কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানানো ছাড়া উপায় নেই। বাংলাদেশের যেসব বুদ্ধিজীবী গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করেন, তাদের বলতে হবে তারা কোনো গণতন্ত্র চান এবং তা অর্জনের উপায় কী? ড. কামাল হোসেনদের ও রাজপথের শহীদ নূর হোসেনদের গণতন্ত্র তো অভিন্ন গণতন্ত্র নয়।