আমার ভালোবাসার নাম ‘বাংলাদেশ’

মাঝে মাঝে মনে হয় হঠাৎ ছুটে যাই প্রিয় দেশটায়। বাংলাদেশের সবুজ জমিনের ভেতর দিয়ে যে আলপথ চলে গেছে, তার উপর দিয়ে ছুটে চলি। প্রাণভরে টেনে নেই সোঁদা মাটির গন্ধ। হাজারো ব্যস্ততায় কখনো কখনো বুকের ভেতরটায় কেমন যেন কেঁপে কেঁপে ওঠে, বুঝতে পারি সেটা দেশের জন্যে ভালোবাসা। আজকে দেশকে তীব্রভাবে অনুভব করার একটি গল্প আপনাদের বলবো। দেশের ক্ষতি করার জন্যে একদল কুচক্রি যেমন ছিল-আছে, সংখ্যায় তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি দেশটাকে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যা। তেমনি একজন মানুষের গল্প বলবো আজ।
পেশায় যেহেতু আমি একজন চিকিৎসক, অনেক ধরণের মানুষের সাথে নিয়মিত পরিচয় ঘটে। প্রায় বিশ বছর হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করছি। সময়ের পরিক্রমায় নানা ধরণের ঘটনার মুখোমুখিও হয়েছি। পেশাগত জীবনে কিছু ঘটনা আছে, যা সারাজীবনই মনে থেকে যায়। যে ঘটনাটি তুলে ধরছি, এটি বেশ কয়েক বছর আগের কথা; যখন আমাদের গর্বের পতাকা উঠেছিল রাজাকারের গাড়ীতে। তখন অন্যরকম একজন মানুষের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তার কথা ভুলিনি, কখনো ভুলবোও না। মানুষটার নাম আনিস পাটোয়ারি। কুমিল্লা অঞ্চলে বাড়ি। অনেক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এলেও, কোনভাবেই খাপ খাইয়ে চলতে পারছিলেন না। মোটামুটি ধরণের একটা কাজ করে কেবল থেকেছেন পেটেভাতে। এদেশে ছিলেন বৈধ, কাগজের কোন সমস্যা ছিল না। অথচ অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেননি। সেই আগ্রহ তার মধ্যে এতটুকু ছিলও না। প্রায়ই দেখা হতো। জানতে চাইতাম, “কেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেননি বা নিচ্ছেন না”? তার একটাই উত্তর, “নেবো না”। এর চেয়ে বেশি কিছু তিনি বলতে চাইতেন না। আসল কথা হচ্ছে, এ নিয়ে বিস্তারিত উত্তর তিনি দিতে চাইতেন না।
আনিস ভাইয়ের এক মেয়ে, যার স্বামী বিদেশি; আমেরিকান। তার স্ত্রী টেইলার হিসেবে কাজ করেন। স্বামী স্ত্রী থাকেন। মেয়ে থাকে পাশেই কোথাও। আনিস ভাইয়ের সাথে দেখা হলেই বলতেন, “দেশে যেতে মন চায়। সুযোগ পেলেই দেশে চলে যাবো। একটা টিকেটের টাকা পেলেই চলে যাবো”। কিন্তু টিকেটের টাকা আর জোগাড় হয় না তার। হঠাৎ করে একদিন গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হলেন তিনি। পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেলেন। হাসপাতালে ছিলেন বেশ কিছুদিন। তারপর ফিজিক্যাল থেরাপি নিলেন, অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখালেন। অপারেশনও হবার কথা। তবে এটি এমন একটি অপারেশন, যা না করলেও চলবে। আমি অনেক রোগী দেখেছি, এমন পরিস্থিতিতে অপারেশন না করেও ভালো ছিলেন। বিশেষ করে উনার বয়স ৬৮ কিংবা ৬৯ হয়ে গেছে। আমার বাবা হলে, আমি অপারেশন করাতাম না।
একদিন আনিস ভাই এলেন আমার কাছে। অপারেশন করাবেন, সেই কাগজে সই করাতে এসেছেন। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এটি এমনই সমস্যা, অপারেশন না করালেও চলবে। কিন্তু তিনি কোন কথাই শুনছেন না। বললেন, তিনি সেটা করাবেনই। যে ধরণের দুর্ঘটনা হয়েছে, স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে আমরা সেটাকে বলি ‘নো ফল্ট’। অ্যাকসিডেন্টের ক্ষেত্রে কোন দোষ হয়নি প্রমাণ করতে পারলে, ভালোই অর্থ পাওয়া যায়। আনিস ভাইয়ের কথায় যেটা বুঝলাম, উনার আইনজীবী হয়তো বলেছেন, অপারেশন করালে তিনি তাকে দেশে যাওয়ার জন্যে খরচ দেবেন। কেননা যে টাকা পাওয়া যায়, তার বড় একটি অংশ আইনজীবীর পকেটে ঢোকে। উনার কাছে জানতে চাইলাম, কেন অপারেশন করাতে চান? তিনি বললেন, ‘আমি দুই হাজার ডলার পাবো। সেখান থেকে টিকেট কেটে দেশে চলে যাবো।
কিন্তু দেশে কেন যেতে চাইছেন? এমন প্রশ্নের উত্তর কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। এক পর্যায়ে কেবল বললেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশটাকে স্বাধীন করেছেন। প্রিয় সেই দেশটাকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে তাদের মতো মানুষকে মাঠে থাকতে হবে।
তার কথা পরিস্কার বুঝলাম না। এই বয়সে তিনি দেশে গিয়ে কী করবেন! তখন যে পরিস্থিতি চলছিল, স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে ছিল দেশের ক্ষমতা। সেই পরিস্থিতিতে দেশটাকে বদলানোর জন্যে, একজন বৃদ্ধের নি:স্বার্থ এমন ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হলাম বটে, তবে পুরো বিষয়টা গদ্যের মতো শোনালো। মনে হলো বিষয়টি বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। তবে আনিস ভাইয়ের কণ্ঠ ইস্পাত কঠিন। গলায় অদ্ভূত এক দৃঢ়তা। দেশপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধাদের যেটা থাকে। ফলে তার কথা শুনে মনটা কেমন যেন তরল হয়ে গেল। শক্তিও পাচ্ছিলাম। বললাম, “আমি কি আপনাকে দেশে যেতে আর্থিক সহায়তা করতে পারি”? উত্তরে তিনি বললেন, “কারো দান নিতে চাই না। প্রয়োজনে নিজের অঙ্গহানী করতে রাজি”। কথা শুনে চমকে উঠলাম আমি। আনিস ভাইয়ের কথাগুলো এখনো যেনো কানে বাজছে। মানসিকভাবে কতটা শক্ত এই মানুষ। দেশটাকে কতটা ভালোবাসে। হৃদয় নিঙরানো সেই ভালোবাসা। তার প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে আসলো আমার মাথা।
এরপর বেশ কিছুদিন আনিস ভাইয়ের দেখা নেই। চার সপ্তাহ পরে আবারো এলেন। অপারেশন হয়ে গেছে। ডলারও হাতে পেয়ে গেছেন। এবার দেশে যাওয়ার পালা।এসেছিলেন আমার সাথে দেখা করতে। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “৭১-এ অস্ত্র ধরেছি দেশকে স্বাধীন করতে। এখন রাজাকারের গাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা (তখন তারা ক্ষমতায় ছিল) উড়ছে। জীবদ্দশায় তা আমি মানতে পারবো না”।

কী করবেন দেশে গিয়ে? চলবেন কীভাবে? প্রশ্ন করলাম। উত্তরে আনিস ভাই বললেন, “দেশের মাটির কাছে কিছু ফেরত চাই না। একজন মানুষের চলা থেমে থাকবে না’। আরও একবার চমকে উঠলাম। তিনি চলে গেলেন। তার চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলাম। আমি ভাবতে থাকলাম, দেশের প্রতি একজন মানুষের ভালোবাসা কতটা খাঁটি হতে পারে! কতটা নির্ভেজাল হতে পারে! ভাবতে ভাবতে চোখে জল এসে গেলো। একজন মানুষ কেবল দেশে যাওয়ার জন্যে নিজের শরীরের অঙ্গকেও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। সেই মানুষের দেশের কাছে কোন চাওয়া নেই। কারো দান নিতে চান না। এইতো সত্য মানুষ, খাঁটি মানুষ। স্যালুট, আনিস ভাই আপনার প্রতি। কেউ হয়তো আপনাকে চেনে না। কিন্তু আমি ভুলিনি। কোনদিন ভুলবো না। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। দেশের প্রতি ভালোবাসার শিখাটা আমিও যেন আপনার মতো সবসময় তুলে ধরতে পারি। কেননা আমার ভালোবাসার নাম “বাংলাদেশ”।
-নিউ ইয়র্ক।