আমার রোগী বন্ধুরা: যোসেফের স্বাধীনতা

হুমায়ূন কবির

রুমে ঢুকেই হৈ হৈ করে খবরটা দিলো।
– ডাক্তার। আমার কিন্তু পঞ্চাশ বছর এখন!
খবরটা আগেই জানা ছিলো। শার্লি নোট লাগিয়ে দিয়েছিলো চার্টের ওপরে, ‘ওর জন্মদিন গেলো মাত্র। হ্যাপি বার্থডে বলতে ভুলো না যেনো।’ কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না। ভয়ানক উত্তেজিত! পঞ্চাশ বছর হয়েছে। চাট্টিখানি কথা! সাথের মেয়েটা শান্ত করার চেষ্টা করছে। লাভ নেই। বলেই চলেছে।
– পঞ্চাশ বছর হওয়া তো বিরাট কিছু! কি বলো তুমি? আর ডেভিড বলেছে পঞ্চাশের পরে নাকি মানুষের বুদ্ধি বাড়ে! আমারও এখন বুদ্ধি বাড়বে! আমি তো পার্ট টাইম কাজ পাই এখন। নিশ্চয়ই ফুল টাইম দেবে এবার। কী বলো?
আমি কিছু না বুঝেই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। পাশের মেয়েটাও দেখলাম মুচকি মুচকি হাসছে। এবার দাঁড়িয়ে বললাম, ‘হ্যাপি বার্থডে জোসেফ। কাম, গিভ মি এ হাগ।’
কিন্তু জোসেফের নজর এবার আমার সেলফের চাবির রিংগুলোর প্রতি। ওগুলো আমি বিভিন্ন দেশ থেকে যোগাড় করেছি। আমার ছোট হবিগুলোর একটা। নতুন কোনো দেশে গেলেই নিয়ে আসি একটা স্যুভিনির হিসেবে। বিষয়টাতে যোসেফের দারুণ কৌতুহল। যতোবার আসবে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে সবগুলো। শেষে প্রতিবারেই একটা না একটা কিছু কমেন্ট করবে। আজও করলো।
-কতো দেশ ঘুরেছো তুমি! আমি শুধু একটা দেশে। না, একটা দেশে না, একটা ঘরে। বন্দির মতো থাকি। কি বলো তুমি লেনা? ঠিক বলিনি?
এই বলে দাঁত বের করে হাসতে লাগলো। লেনা মেয়েটা দেখলাম একটু অপ্রস্তুত।
– না জোসেফ। ঠিক বলোনি। তোমাদের তো ঘন ঘনই বাইরে নিয়ে যাই। এই তো কয়দিন আগেই সার্কাসে গেলে। এছাড়া এখন তুমি বাইরের রেস্টুরেন্টে কাজ করছো। তারপরেও এভাবে বলছো কেন?
জোসেফের উত্তর দেয়ার গা নেই। ওর প্রয়োজন শুধু কথা বলার। বলেই যাচ্ছে। Ñ এটা বুঝি তোমার বউয়ের ছবি? না গার্লফ্রেন্ড?
– না, ওটা আমার বউয়ের ছবি।
– ডাক্তার তোমার ওই হাতির চাবিটা খুব সুন্দর।
যোসেফের আঙুল থাইল্যান্ড থেকে আনা চাবির রিংটার ওপরে। ওতে একটা কাঠের হাতি ঝুলানো।
– আমি হাতি খুব পছন্দ করি। চিড়িয়াখানায় দেখেছি। অনেক মোটা হয় ওরা। জানো রাগ করলে ডেভিড বলেÑ আমিও নাকি খেয়ে খেয়ে হাতির মতো হচ্ছি! লেনাও বলে মাঝে মাঝে।
এবার লেনার সত্যিই অপ্রস্তুত হওয়ার পালা। যদিও জানে এ সব কথার কোন মানে নেই। জোসেফ মোটেও বলছে না কিছু। তবুও শুনতে অভিযোগের মতোই মনে হয়।
কথা ঘুরাবার জন্য বললাম, এসো জোসেফ। তোমার একটা ছবি তুলি।
– আগেও তো তুলেছো একবার।
– আজ না হয় আবার তুললাম।
– তাহলে ওই চাবিগুলোর সাথে দাঁড়িয়ে তুলবো।
যুদ্ধজয়ীর মতো ‘ভি’ সাইন দেখিয়ে ভঙ্গী করে দাঁড়ালো যোসেফ।
এই যোসেফ লোকটা আমার স্লিপ ক্লিনিকের রোগি। বছর কয়েক আগে নিয়ে এসেছিলো তার কেস ওয়ার্কার। প্রথম প্রথম ভয়ানক বিরক্ত হয়ে থাকতো। তিরীক্ষি মেজাজ। নাই বিষয় নিয়ে কেস ওয়ার্কারের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকতো। পরীক্ষা করে পাওয়া গেলো মারাত্মক স্লিপ এ্যাপনিয়া। ভয় হচ্ছিলো সিপেপ মেশিনটা ব্যবহারে রাজি হবে কি না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে খুব সহজেই মেনে নিলো যোসেফ। আর পরের ভিজিটেই দেখা গেলো অন্যরকম মানুষ সে। আগের মতো খিটখিটে মেজাজ নেই। ঝগড়াঝাঁটি নেই। শুধু আমাকে নানা প্রশ্ন করা শুরু করলো ফালতু সব বিষয়ে। আমিও অকপটে জবাব দিতাম তার সব সরল মনের প্রশ্নের। এভাবেই ভাব হয়ে গেলো খুব।
জন্ম থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বাবা মারা গেছে ছোট বয়েসে। মা মারা যায় পরে। ততোদিনে যোসেফ হয়ে উঠে ভয়ানক বেসামাল। এক সময় ওকে জোর করে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। সুস্থ হতে লাগলো কয়েক বছর। ছাড়া পাওয়ার পর কেউ আর নিতে আসে না। যাওয়ার কোন জায়গাও নেই তার। তাই বাধ্য হয়ে এবার রাজ্য সরকার ওর দায়িত্ব নিলো। পাঠিয়ে দিলো আমাদের কাছাকাছি একটা হোমে।
এসব তথ্য সব কেস ওয়ার্কারের ফাইল থেকে নেয়া। যোসেফের স্মৃতি এই হোম থেকেই শুরু। আগের কথা কিছুই মনে নেই। এমন কি মার স্মৃতিও মনে নেই। মাঝে মাঝে শুধু মিস টেইলর বলে একজনের কথা বলে। কেস ওয়ার্কারের অনুমান মিস টেইলর হয়তো ওর এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। যোসেফ এমনিতেই খুব ভদ্র আচরণ করে। প্রায়ই মিস টেলরের উপদেশের উল্লেখ করে। মিস টেলর বলেছে এটা করবে না। মিস টেলর বলেছে ওটা ভালো না। ইত্যাদি। সবার ধারণা মিস টেইলর যিনিই হোন, খুব আদর করে আদব-কায়দা শিখিয়েছেন যোসেফকে।
– যোসেফ, মার কথা তোমার মনে পড়ে না?
– না।
– কাউকে ভালোবেসেছো কখনো?
– হ্যাঁ।
– কাকে?
– এই তো লেনাকে ভালোবাসি। জেনিফারকেও ভালোবাসি। ডেভিডকেও ভালবাসি। আমি সবাইকে ভালোবাসি।
লেনা জানালো জোনিফার হচ্ছে আরেক কেস ওয়ার্কার। ডেভিড হচ্ছে সিকিউরিটি গার্ড। যোসেফের ভালোবাসার জগৎ এদের ঘিরেই। হোমের নথিপত্রে যোসেফের বাড়ির একটা ঠিকানা আছে। কিন্তু কেউ কখনো ভিজিট করতে আসেনি।
– তাহলে ওর পাওয়ার অব এটর্নি কে? স্টেট?
– হ্যাঁ, এতোদিন স্টেট গার্ডিয়ানশিপ ছিলো। তবে সাম্প্রতিক সাইকোলজিক্যাল রিপোর্টের পর কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যোসেফ নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
যোসেফ তখনো চাবির রিংগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলো। লেনার এ কথা শুনে দৌঁড়ে আসলো আমার কাছে।
– ডাক্তার, তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। এখন থেকে আমি নিজেই সই করবো সবকিছুতে। আমি স্বাধীন এখন!
– তাই নাকি? আগে কি পরাধীন ছিলে?
– হ্যাঁ। আগে তো ওরা সই করতো সব কিছুতে।
যোসেফের কাছে সই করতে পারাটাই স্বাধীনতা! মজা করার জন্যই একটা খোঁচা দেয়ার ইচ্ছে হলো যোসেফকে।
– আচ্ছা যোসেফ তুমি তো স্বাধীন এখন। তাহলে কি লেনা আর জেনিফারকে ছেড়ে নিজের বাড়িতে চলে যাবে?
– না, না। সেটা করবো কেনো? আমার তো বাড়িই নেই।
– ওই যে বললে এক ঘরে বন্দী হয়ে আছো। সেটা কি স্বাধীনতা হলো?
হঠাৎ করে গম্ভীর হয়ে গেলো যোসেফ। মনে হলো এই কঠিন প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছে সে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর এবার একটা হাসি দিয়ে শুরু করলো। পেয়ে গেছে উত্তরটা।
– ডাক্তার, ওই বন্দী হয়ে থাকাটাও আমার স্বাধীনতা।
আমি অপলক চেয়ে থাকলাম যোসেফের দিকে! যোসেফের আকর্ণ বিস্তৃত হাসি। স্বভাবসুলভ দাঁত বের করা হাসি। অকপটে কি কঠিন কথাটা বলে ফেললো। বন্দী হয়ে থাকাটাই তার স্বাধীনতা! হঠাৎ কেনো জানি তাকে ভীষণ সুখি মনে হলো আমার। মনের অগোচরে আমরাও কি একটা বন্দিত্ব খুঁজি? আপনজনদের ভালোবাসাই কি সেই বন্দিত্ব?
খ্যাতনামা চিকিৎসক ও মননশীল সাহিত্যিক, টেনেসি।