আমার রোগী বন্ধুরা: সাপ নিয়ে উপাসনা

হুমায়ূন কবির

লঞ্চ থেকে ফিরে এসে দেখি টেবিলে একা চিরকুট রাখা। এ্যামিলির হাতের লেখা।
– ভিডিওটা ডাউনলোড করে রেখেছি। অফিসের পরে একটু সময় হাতে রেখো। একটু পরে জোসেলিনও টেলিফোন করলো।
– গুগুল সার্চ করেই সব পেয়ে গেছি। মোটেও কষ্ট হয়নি।
বিষয়টা কি? সকালে কথা হচ্ছিলো রোগীদের অদ্ভুত সব আচার-আচরণ নিয়ে। একটা বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে বলেছিলাম। এরই উত্তর।
ঘটনাটা ঘটে বেশ কয়েক বছর আগের। ইমার্জেন্সি রুমে এক রোগী আসলো সাপের কামড় খেয়ে। লোকটার সঙ্গে আলাপ করে খুবই অবাক হলাম। কথাবার্তায় অমায়িক আর ভদ্র। নির্বিকারভাবে জানালো মোটেও তাড়িত নয় সে। সাপের কামড়ে অভ্যস্ত। কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।
-তাহলে এসেছো কেন?
– পুলিশের হাতে পড়তে চাইনি, তাই এসেছি।
-সাপে ছোবল দিয়েছে তোমাকে। সেজন্য পুলিশ ধরবে কেন?
-বাড়িতে সাপ রেখেছিলাম অনেকগুলো।
-বাড়িতে সাপ! পোষা সাপ?
লোকটা কোনো উত্তর না দিয়ে চেয়ে থাকলো আমার দিকে। বোঝা গেলো সে অবাকই হচ্ছে আমার প্রশ্নে।
এই এলাকায় সাপেকাটা রোগীর সংখ্যা একদম কম না। তবে বেশিরভাগ সময়ই তেমন কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। কালেভদ্রে অ্যান্টিভেনম দিতে হয়। তখনই শুধু আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়। এই রোগীটিকে পরীক্ষা করে বুঝলাম বিষক্রিয়ার তেমন লক্ষণ নেই তখনো। হয়তো এক রাত অবজারভেশনে রেখেই ছেড়ে দেয়া যাবে। পরে শুনলাম ইমার্জেন্সি রুম থেকেই লোকটা উধাও। পুলিশ এসেছিলো। তার আগেই কাউকে কিছু না বলে সটকে পড়েছে। নার্সরা জানালো এরা সাপ নিয়ে উপাসনা করে। তবে এই চর্চাটা টেনেসিতে বেআইনি। মাঝে মাঝেই পুলিশ এদের তাড়া করে। বিষয়টা আগে আমার জানা ছিলো না। বেশ অদ্ভুত ঠেকছিলো আমার কাছে।
আজ সকালে এ্যামিলির টেলিফোন।
-সাপের কামড় নিয়ে যে গল্পটা বলেছিলে সেদিন, সেই লোকটার নাম মনে আছে তোমার?
-না। নাম মনে নেই। কেন?
-আজকের খবরের কাগজ দেখ। একজন প্যাস্টর মারা গেছে ওদের চার্চে। কাগজে পড়লাম টিভিতে এই পেস্টরকে নিয়ে একটা ডক্যুমেন্টারিও নাকি হয়েছে।
-তাই নাকি? পত্রিকাটা রেখো আমার জন্য। আর জোসেলিনকে বলো তো এই বিষয়ে আরো একটু তথ্য যোগাড় করতে। যুৎসই মনে হলে গল্পটা হয়তো বইতে ঢোকানো যাবে।
-পত্রিকাটা অফিসেই আছে। ভিডিওটাও ডাউনলোড করে রাখবো। চিন্তা করো না।
-ঠিক আছে। অফিসে এসে কথা বলবো এ নিয়ে।
বিকেলে ভিডিওটা দেখলাম। জোসেলিনের প্রিন্ট করা তথ্যগুলোও দেখলাম। ভাবলাম বিষয়টা দেয়া যায় বইতে। বাংলাদেশের পাঠকদের এই নিয়ে হয়তো কোনো ধারণাই নেই।
সাপ নিয়ে উপাসনার ব্যাপারটা খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদের ভেতরকার ছোট্ট একটা গোষ্ঠীতে প্রচলিত। অন্য সব ধর্মের মতো খ্রিস্টান ধর্মের নানান শাখা-প্রশাখা। মূল বিভাগটা হলো ক্যাথলিক আর প্রোটেস্টান। উত্তর আমেরিকার বেশির ভাগ জনগোষ্ঠী প্রোটেস্টান মতের অনুসারী। এই প্রোটেস্টানদের ভেতরেও আবার নান উপদল। একটা উপদল হচ্ছে পেন্টাকোস্টাল। পেন্টাকোস্টালদের একটা ছোট্ট গোষ্ঠী বাইবেলের কয়েকটি লাইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যা করেছে। এরা জীবন্ত সাপ নিয়ে চার্চে উপাসনা করে। বিশ্বাসটা হচ্ছে এই যে, উপাসনারত অবস্থায় প্রকৃত বিশ্বাসীদের সাপে কামড়াবে না। কামড়ালেও বিষ কাজ করবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর শুরুটা ছিলো এই টেনেসি রাজ্যেই। ঠিক আমাদের এলাকায়। বিশ শতকের প্রথম দশকে শুরু হওয়া এই ধর্মাচারের দ্রুত বিস্তার লাভ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি রাজ্যে। সাপের কামড়ে মানুষ মারা যেতে থাকলে অনেক রাজ্যেই পরে এটি ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। টেনেসিতে নিষিদ্ধ হয় ঊনিশ শ সাতচল্লিশ সালে। কিন্তু অনেক চার্চে এখনো এই চর্চা চলছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এখনো প্রায় একশ পঁচিশটি চার্চ আছে এরকম। কিছুদিন আগে আমাদের এলাকার পাশেই এক চার্চে জেমি কোটস নামের এক ধর্মযাজক মারা যান সাপের ছোবলে। পেস্টর কোটস বেশ বিখ্যাত ছিলেন। একবার তার বাড়িতে ছিয়াত্তরটি সাপ পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ জেলে পাঠায় তাঁকে। কিন্তু নড়ানো যায়নি তার বিশ্বাস থেকে। তাঁকে নিয়ে একটা ডক্যুমেন্টারি হয়েছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে। সাড়া জাগানো এই ডক্যুমেন্টারি দেখে অবাক হয়েছিল সারা দেশের লোকেরা। এ্যামেলি সেটিই ডাউনলোড করে দেখালো আমাকে।
দেখতে দেখতে মনে হলো- বিশ্বাসে অনড় থেকে মানুষ কতো কি করে!