আমিই আবরার

প্রভাষ আমিন

আবরারকে কেন মরতে হলো? আবরারকে কারা মারল? এই দু’টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি আমি। মেলেনি উত্তর। তবুও নানা হিসাব-নিকাশে উত্তর মেলানোর চেষ্টা। বলা হচ্ছে, ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার অপরাধে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। কী ভয়ঙ্কর কথা! ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে যেখানে একজন মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়, সেটি কোনো সভ্য দেশ হতে পারে না।
কিন্তু ঘটনার দু’দিন পরও ফেসবুকের এই স্ট্যাটাস ছাড়া আবরারের আর কোনো ‘অপরাধ’ এর খোঁজ মেলেনি। আবরারকে পিটিয়ে মারার পর প্রথম দিকে তাকে শিবির হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সে চেষ্টা ধোপে টেকেনি। কারণ আবরারের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থক। তারা কুষ্টিয়ায় মাহবুবউল আলম হানিফের নির্বাচনী এলাকার মানুষ এবং নিয়মিত হানিফের কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন। আর ধরে নিচ্ছি, আবরার আওয়ামী পরিবারের সন্তান নন। তিনি সত্যিই শিবির করতেন। তাহলেও কি তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে? জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি আমি অপছন্দ করি। আমি চাই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিনাশ চাই। কিন্তু সেটা আইনিপ্রক্রিয়ায়। বাংলাদেশে শিবির এখনো নিষিদ্ধ সংগঠন নয়। শিবির করে, স্রেফ এই অপরাধে কাউকে পিটিয়ে মেরা ফেলা যায় না। আসলে কোনো অপরাধেই পিটিয়ে মারা যায় না।
কেউ অপরাধ করলে, তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। পুলিশ তার ব্যাপারে তদন্ত করবে। আদালত বিচার করবে। ছাত্রলীগ তো পুলিশ নয়, আদালত নয়। তাদের কে দায়িত্ব দিয়েছে মানুষের ন্যায়-অন্যায়, দোষ-গুণ যাচাইয়ের? আসলে অনেকদিন ধরেই কারো সঙ্গে মতে না মিললেই তাকে জামায়াত-শিবির তকমা লাগিয়ে দেওয়া এবং সেই তকমা দিয়ে তার সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করার একটা প্রবণতা চলে আসছে বাংলাদেশে।
আমরা দিনের পর দিন এই প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে এই দানবদের তৈরি করেছি। এমনকি পুলিশও এই অস্ত্র ব্যবহার করে। বিনা কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে পুলিশও প্রেস রিলিজ দিয়ে জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোপন বৈঠক করার সময় শিবিরকর্মী গ্রেপ্তার। আর ‘জামায়াত-শিবির’ ঢাল ব্যবহার করে আমরা অনেক অপরাধকে আড়াল করেছি, বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দিয়েছি। অনেক আগেই আমাদের এই ভয়ঙ্কর প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত ছিল। আমি এখনও জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ সব সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু যতক্ষণ নিষিদ্ধ করা না হচ্ছে, ততক্ষণ শিবির করা যেন পিটিয়ে মারার যোগ্য অপরাধ না হয়। জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীরও কিন্তু বিচারের পর ফাঁসি হয়েছে। বিনা বিচারে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অধিকার কারো নেই; সে শিবির করুক আর যাই করুক।
এবার আসি আবরার ফাহাদের প্রাণঘাতী সেই স্ট্যাটাসে। ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন আবরার ফাহাদ। সেখানে থাকতেই গত ৫ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে একটি স্ট্যাটাস লেখেন। এটিই তার জন্য কাল হয়েছে। ছুটি থাকলেও পরীক্ষা ছিল বলে গত ৬ অক্টোবর ঢাকায় ফিরে আসেন আবরার। মা নিজ হাতে ছেলেকে খাইয়ে ছেলেকে বাসে তুলে দিয়েছেন। বিকেল ৫টায় হলে পৌঁছে মায়ের সঙ্গে কথাও হয়েছে। সেই ছেলের মৃত্যুর খবর কিভাবে সইবেন মা। আবরারের সারা শরীরে ছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। আহারে মা-বাবার আদরের ছেলেটির শরীরে এই দাগের স্মৃতি কিভাবে ভুলবেন তারা।
গত ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের ছেলেরা তাকে ডেকে নেয় এবং তার ফোন কেড়ে নিয়ে ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জার চেক করে। স্ট্যাটাসের কারণ জানতে চায়, প্রত্যাহারের দাবি জানায়। আবরার রাজি না হওয়ায় তাকে পেটানো শুরু হয়। তারপর দফায় দফায় সাত ঘণ্টা ধরে পেটানো হয়। শুধু পিটিয়ে মেরা ফেলা। আহারে কত কষ্ট নিয়ে গেল আবরার।
চলুন দেখি কত বড় তার অপরাধ। তার অন্তিম স্ট্যাটাসটি ছিল :
১.৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিচ্ছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলাবন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলাবন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েক বছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড় লাখ কিউবিক মিটার পানি দিবো।
৩. কয়েক বছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিবো। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এ সুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
সত্যি বলতে কি আবরারের স্ট্যাটাসটিতে আমি অপরাধ তো দূরের কথা বিদ্বেষমূলক কিছুও খুঁজে পাইনি। বরং আমি মুগ্ধ হয়েছি। স্ট্যাটাসের ছত্রে ছত্রে আমি একজন দেশপ্রেমিককে খুঁজে পেয়েছি। বাংলাদেশে অনেক ভারতবিদ্বেষী আছে, অনেক পাকিস্তানবিদ্বেষী আছে। ভারতবিদ্বেষীরা ভারত প্রসঙ্গ এলেই লিখে রেন্ডিয়া’;
পাকিস্তনবিদ্বেষীরা পাকিস্তান প্রসঙ্গ এলেই লেখে ফাকিস্কান’। কিন্তু আবরার একটিও গালি বা বিদ্বেষমূলক শব্দ না লিখে শৈল্পিকভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা লিখেছে। তার দেশপ্রেমে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তার মতো তথ্য দিয়ে একটি স্ট্যাটাস লিখতে পারলে আমি নিজে গর্বিত হতাম।
আবরারের শেষ স্ট্যাটাসটি ২ লাখ ৩২ হাজার মানুষ লাইক করেছেন, ৫৪ হাজার মানুষ শেয়ার করেছেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক খোন্দকার মুনীরুজ্জামান এটিএন নিউজের টক শোতে দাবি করেছেন, আবরারের স্ট্যাটাস নিয়ে গণভোট হলে শতভাগ মানুষ তার পক্ষেই ভোট দেবে। এটাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ। আমার মনে হয়েছে, এটি আমারই স্ট্যাটাস। আমিই আবরার।
আবরারকে কারা হত্যা করেছে সিসিটিভি ফুটজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। আবরারের বাবা ১৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামিসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা আবরারকে পিটিয়ে মেরেছে, তারা তো অবশ্যই দোষী।
কিন্তু দায় আছে আমাদের সবার। প্রতিবাদহীনতার এবং চুপ থাকার এক ভয়ঙ্কর সময় আমরা পার করছি। সাত ঘণ্টা ধরে আবরারকে পেটানো হলো, তার চিৎকার কী হলের আর কারো কানে যায়নি? আজ যারা আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছে, সেদিন যদি তারা সংগঠিত হয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করত, তাহলে হয়তো বাঁচানো যেত। কিন্তু বুয়েটের শেরেবাংলা হলের শিক্ষার্থীরা সবাই চুপ করে ছিল। কেন? আমি জানি, ছাত্রলীগের ভয়ে সবাই চুপ করে ছিল। সবারই জানের মায়া ছিল।
কিন্তু ভয়কে জয় করতে না পারলে, আমরা কেউই এই দানবদের হাত থেকে বাঁচতে পারব না। আবরার ফাহাদ মুজাহিদের ফেসবুক প্রোফাইলে নিজের সম্পর্কে একটি লাইন লেখা আছে, ‘অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে’। আহারে আমাদের সবাইকে অপরাধী করে আবরারকে মাত্র ২১ বছর বয়সেই অসীম মহাকাশের অন্তে অনন্ত মহাকালে যাত্রা করতে হলো।
লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।