আমেরিকায় মহামারির রূপ নিয়েছে পুলিশের আত্মহত্যা

ঠিকানা রিপোর্ট : সর্বসাধারণের জানমালের নিশ্চয়তা বিধান, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সশস্ত্র দুষ্কৃতকারী ও সন্ত্রাসীদের মোকাবেলার জন্য আমেরিকার পুলিশ বাহিনীকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত করা হয়েছে। অথচ দুর্ভাগ্যক্রমে ডিপার্টমেন্টের প্রদত্ত আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রে মহামারি রূপ নিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০০ সালে ৫৪ পুলিশ কর্মকর্তা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে অতীতের যাবতীয় রেকর্ড ভঙ্গ করেছিলেন। তার পরবর্তী বছরগুলোতে পুলিশের আত্মহত্যার সংখ্যা ৫০-এর কম ছিল। আর ২০০৫ সালে নিজস্ব আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে ৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আত্মহত্যার মাধ্যমে ভবজ্বালার অবসান ঘটিয়েছিলেন। সেই হিসাবে চলতি বছর পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার ঘটনা মহামারি রূপ নিয়েছে বললে সম্ভবত বাড়িয়ে বলা হবে না।
যাহোক, ১৯ আগস্ট প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর নিউইয়র্ক সিটির ৯ জনসহ সমগ্র আমেরিকায় ১২০ জনেরও বেশি সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেছেন। পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমিক স্ট্রেস ডিজিজ), মানসিক অবসাদ ও বিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানকারী ম্যাসাচুসেটসের বøু এইচইএলপি শীর্ষক নন-প্রফিট ওই তথ্য প্রদান করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সহিংসতা বা সশস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় যত পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন তার চেয়ে আত্মহত্যাকারী পুলিশের সংখ্যা অনেক বেশি। সংস্থাটি আরও জানায়, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও রয়েছেন এবং বিগত ৪ বছর যাবৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
উন্ডেড বøু নামক ল এনফোর্সমেন্ট অ্যাডভোকেসি গ্রæপের প্রতিষ্ঠাতা লাস ভেগাসের সাবেক পুলিশ লেফটেন্যান্ট র‌্যান্ডি সাটন বলেন, পুলিশের আত্মহত্যা এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। অ্যাডভোকেটগণ বলেন, কাজের প্রকৃতি এবং ধরনের কারণেই পুলিশ কর্মকর্তারা আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের তুলনায় কম সাহায্য ও সহানুভ‚তি পেয়ে থাকেন।
বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং পুলিশের স্ট্রেচ-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন ভায়োলেন্টি বলেন, পুলিশের সহজাত সংস্কৃতি হচ্ছে কখনো দুর্বলতা প্রদর্শন করবে না। আর এই সংস্কৃতি তাদের ব্যক্তিত্বে রক্তক্ষরণ ঘটায় এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের অন্তর একধরনের শক্ত খোলসে ঢাকা পড়ে। ভায়োলেন্টি বলেন, অনেক এজেন্সি কর্মচারীদের সহযোগিতামূক কর্মসূচি প্রদান করে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকেন এ কারণে তাদের সহযোগিতা গ্রহণের বিষয়টি সুপারভাইজারদের কানে চলে যাবে।
বিভিন্ন কাহিনি থেকে জানা যায়, যেসব স্টেটের বেশি সংখ্যক পরিবারের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, সেসব স্টেটে আত্মহত্যার হার বেশি। আর পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে সর্বদা আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় আত্মহত্যার জন্য তাদের অন্যের দ্বারস্থ হতে হয় না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক স্তরে উপনীত হওয়ায় সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার প্রচেষ্টা রোধ, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং ও প্রশিক্ষণ বাবদ বার্ষিক ৭.৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দকারী একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন। একসময় আত্মহত্যার চিন্তা-ভাবনাকারী ফ্লোরিডার অবসরপ্রাপ্ত প্যাট্রোল সার্জেন্ট মার্ক ডিবোনা বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পা ভেঙে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভ‚তি প্রদর্শন করেন এবং তার শুভকামনা করেন। কিন্তু মানসিক সমস্যায় জর্জরিতদের কপালে হাত বুলানোর মতো লোকজনের তীব্র সংকট সর্বত্র বিরাজমান।
নিইইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের ভায়োলেন্স প্রধান টেরেন্স মোনাহান বলেন, পারিবারিক অশান্তি, সহিংসতা, মানসিক ও শারীরিক চাপের সাথে কর্মক্ষেত্রের অসহনীয় চাপ ও প্রতিক‚লতা অনেক সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দেয়। মোনাহান বলেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের একান্তভাবেই সাহায্য-সহযোগিতা অপরিহার্য। মোনাহান বলেন, মানসিক ও দৈহিক অসহনীয় চাপের মুখে সমাজের যে কেউ এ ধরনের আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন। তিনি বলেন, কেউ এ ধরনের প্রচণ্ড চাপের সম্মুখীন হলে তার উচিত অন্যের সাহায্য প্রার্থনা করা এবং অন্যদেরও উচিত সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের যথাসাধ্য সাহায্য প্রদানে আন্তরিক হওয়া।