‘আমেরিকায় মেয়েটি’

দিলরুবা আহমেদ

২০১৯-এর একুশে বইমেলায় অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমার দুটি বইয়ের একটি হচ্ছে ‘আমেরিকায় মেয়েটি’, এটি উপন্যাস। এটি লিখতে গিয়ে প্রথমেই আমার সামনে খুব বড় ধাঁধা বা বাধা, নাম কী হবে এই উপন্যাসের।
নাম ঠিক না হলে আমি এগোতে পারি না। ‘দৈনিক যুগান্তর’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় উপন্যাসটি বেরিয়েছিল ‘আমেরিকায় মেয়েটি’ এই নামে। এবার বই বের করতে গিয়ে মাথায় আসেÑ
১. আমেরিকায় একটি মেয়ে
২ .আমেরিকায় মেয়েটি
৩. আমেরিকায় একা একটি মেয়ে
সব-ই পছন্দ। কোনটা বাদ দিই এক উপন্যাসের তো আবার তিন নাম হতে পারে না। আমার বর বলল তিন নামের তিনটা কভার পেজ আলগা তৈরি করে নাও, যে যেটা পছন্দ করবে সেটা লাগিয়ে নিয়ে বইটা পড়ে নেবে। বলে হাসল। আমাকে খুশি করার ভালো উপায় বের করেছে ভেবে সে হাসল। আমি ভাবলাম আমার দুরবস্থা দেখে সে হাসি দিলো। বললাম, তুমি একটা নাম পছন্দ করো, সে নির্বাক ভূমিকা পালন করল। এক্কেবারে চুপ ।
এরপর ফেসবুকে মতামত জানতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ভালো সাজেশন এলো, ‘আমেরিকার সেই নিঃসঙ্গ মেয়েটি’ ‘আমেরিকায় একাকী একটি মেয়ে’, ‘আমেরিকায় এক মেয়ে’ ইত্যাদি। একজন তো বললই, লিখুন ‘আমেরিকায় নিঃসঙ্গ আমি’। আমাদের দেশের জনগণ নিয়ে এই এক সমস্যায় আমি পড়ি, যাই লিখি তাই ভাবে এটা বুঝি আমার নিজের কথা, সবই আমার কাহিনী। অনেক সুশিক্ষিত এবং পড়ুয়া লোকজনও যখন এমন ভাবে তখন আর আমি আমজনতার ওপর রাগ করা ছেড়ে দিই। বুঝতে পারি তারা ‘বিষাদ সিন্ধুর’ লেখক মীর মশাররফ হোসেনকে কারবালার প্রান্তর থেকেই সরেজমিনে ঘুরিয়ে আনবেন। সে যাই হোক, তাদের কারণেই আরও অনেক চমৎকার সব নাম পেলাম। এতে আমার শুধু ভাবনার রাজ্যেরই পরিধি বাড়ল, মনোকষ্টে পরলাম, কোনটা ফেলি কোনটা রাখি, কেন পারছি না প্রতিটি নাম নিয়ে একটা করে উপন্যাস জাদুমন্ত্র দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দিতে।
আমার সব কাজের সাথী আমার বর এবার বলল, যেহেতু পুরো গল্পটা তুমি জান তোমাকেই ভেবে বের করতে হবে নামটা।
যে লেখে সে নিঃসন্দেহে জানে সবটুকু কিন্তু যখন ফেসবুকে বন্ধুরা মতামত নিয়ে এগিয়ে আসেন তাদের এ অংশীদারিত্ব আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় তাদেরও সঙ্গে পেলাম। আমার প্রিয় চরিত্রগুলোর নাড়াচাড়ায় সমব্যথিদের সমবেত হওয়ার এ সমাবেশ আমাকে আনন্দিত ও উদ্বুদ্ধ করে লিখতে, চলতে, ভাবতে, বানাতে, বুনতে।
এই উপন্যাসে রয়েছে একটি মেয়ে নিহা, সে একা, রয়েছে আরেকটি মেয়ে টগর, সেও একা, ছোট্ট মেয়ে অরা, সেও একাকী অপেক্ষায় রয়েছে পরিজনের। জামিনী খালা বা টগরের মা তারাও আমেরিকায় থাকতে আসা বাংলাদেশি মেয়েটি, মা-টি, মাটি থেকে দূরে তাই বলে বাঙালি মা-পনা ছেড়ে চলে যায়নি তাদেরও। অনেক মেয়ে। বহুবিধ তাদের লোকাচার, জীবনফের। সবাইকে এক সঙ্গে এক নামে বন্দী করলাম, আর সেটি- ‘মেয়ে’। সবাই যে যার জায়গায় একেকজন লড়াকু মেয়ে, নারী।

আমার পূর্ববর্তী বেশ কিছু উপন্যাসে এরা চলে এসেছে। তাই খোলা চত্বর থেকে প্রথম ধরতে পারার মতো করে কোনো এক অচেনা নারী চরিত্র এদের বলতে পারছি না আমি। তাই ‘এক মেয়ে’-এর চেয়ে ‘মেয়েটি’ অনেক গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল আমার কাছে। ‘মেয়েটি’ বললে মনে হয় যেন একটা কিছুর আদল পেয়েছে, নির্দিষ্ট করা গেছে, দাঁড়িয়েছে শক্ত পায়ে।
‘আমেরিকায় মেয়েটি’ স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি উপন্যাস, তবে যারা আমার লেখা ‘ব্রাউন গার্লস’ বা ‘গ্রিনকার্ড’ পড়েছেন তাদের জন্য বাড়তি পাওনা চরিত্রগুলো তাদের পূর্ব পরিচিত।
কি দেশে কি বিদেশ সর্বত্রই নারীর একাকী চলা খুব যে মধুর তা নয়। তবে এই আমেরিকায় এখন প্রচুর প্রচুর মেয়ে নিত্যদিন একাই চলছে, ফিরছে, জীবনযাপন করছে। আমেরিকায় একটি মেয়ে যতটা স্বাধীন জীবনযাপন করে অবশ্যি বাংলাদেশে তা নয়। আমেরিকায় যে বাংলাদেশি মেয়েরা রয়েছে তারাও যে তাদের আজন্ম শেখা শিক্ষা সংস্কৃতি বর্জন করে পুরো বিদেশি হয়ে উঠেছেÑ তা যেমন নয়, তেমনি রয়েছে মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব। সম্ভবত এভাবেই কিছু নিয়ে কিছু দিয়েই এগিয়ে যাবে নতুন দিনের দিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। প্রথার আধিপত্যবাদ ছেড়ে প্রায়োগিক মানবতাবাদী হয়ে উঠবে সমান্তরালভাবে শ্রদ্ধা রেখে পূর্ববর্তী সময়ের মানুষদের সঙ্গেও। বিয়েতে, আহারে, রুচিতে, গল্পে, ভালোবাসায় ভিন্ন সময়ে ভিন্ন অক্ষ অংশে বা দ্রাঘিমাংশে বসবাসকারী অনেকের মাঝেই যে টানাপড়েন তা প্রশমিত হবে কি না জানি না তবে সহনীয় যেন হয়ে ওঠে।

আমার ধারণা আমেরিকায় এলেই এদের সবাইকে দেখতে পাবেন আপনার চার ধারে, যদি না দেখেন আমার বানিয়ে বলা কথা সত্যি হয়ে উঠবে কি পাঠকের পড়াতে? আকাশে একটি হলুদ পাখির ওড়ার গল্প আমি লিখতেই পারি আপনি এসেও দেখতে পাবেন হলুদ পাখিটি উড়ছে পাখা মেলা, শুধু আমি আর আপনি এই ভেবে অবাক হবো এ পাখি-ই কি সেই পাখি উড়ে বেড়ানোর ইতিহাস সে তো ধ্রুব সত্য। অভিবাসনও চিরন্তন। রয়েছে ইল্লিগালদের যাতনা, দেশের সব কিছুর জন্য আকাক্সক্ষা, শিশুদের মাতৃভাষায় দখল হারানোর ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া আর রোধের চেষ্টা। সব-ই সব সময়ের জন্যই প্রযোজ্য। শুধু তার মাঝে সা রে গা মা তুলছে কোনো এক বাদক একান্তে নিজের মতো করে আপনার জন্য। অনেক শুভেচ্ছা, আপনাকে, যিনি পড়তে যাচ্ছেন ‘আমেরিকায় মেয়েটি’। বইয়েরই প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষ, অনেক কৃতজ্ঞতা তাকে।