আর্থিক মন্দার আতঙ্ক থেকে আপাতত স্বস্তি

এম এস হক : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নো রিসেসন (কোনো আর্থিক মন্দা নয়) ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমেরিকার জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং ছাপোষাসহ সব ধরনের আমেরিকানের ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৪ আগস্ট বুধবার বলেছিলেন, আমেরিকা নতুন করে মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হলে আমেরিকার জনগণকে মন্দা মোকাবিলার মধ্য দিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অবশ্য ১৮ আগস্ট রোববার ওয়াশিংটনের উদ্দেশে নিউজার্সি ত্যাগের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আই ডোন্ট সি এ রিসেসন (আমি আর্থিক মন্দার কোনো লক্ষণ দেখছি না)।
ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে হোয়াই হাউস অর্থনৈতিক উপদেষ্টা লেরি কুডলো ফক্স নিউজ সানডেকে বলেন, গত সপ্তাহে স্টক মার্কেটে বড় ধরনের দরপতন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে উৎপাদন নিম্নগামী হলেও আমেরিকা রিসেসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে না বলে তার বিশ্বাস। লেরি কুডলো বলেন, গত সপ্তাহে স্টক বাজারে দরপতনের পেছনে আমাদের বেশ কয়েক জন ব্লকবাস্টার রিটেল সেলস কনজিউমারের কারসাজি ছিল। তিনি বলেন, স্টক মার্কেটে কিছুটা অস্থিরতা সত্ত্বেও ওয়াল স্ট্রিটের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ সপ্তাহের শেষে তৃতীয় ও চতুর্থ কোয়ার্টারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছেন।
এনবিসির চাক টডের সাথে এক সাক্ষাৎকারে লেরি কুডলো স্বীকার করেন যে ২০০৭ সালের গ্রেট রিসেসনের আগে রিসেসন আসছে না শিরোনামে তার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ভুল ছিল। তবে তিনি আশাবাদী যে এবারের রিসেসনের বার্তাটি একেবারেই অপরিপক্ব এবং কল্পনাপ্রসূত।
এর ক্ষণিক আগে হোয়াইট হাউস অফিস অব ট্রেড অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং নীতিমালার পরিচালক পিটার নভারো সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়নকে বলেন, আমার বিশ্বাস অর্থনীতি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তা ছাড়া চীন দেশ থেকে আমদানিকৃত ৩০০ বিলিয়ন মূল্যমানের পণ্যের কিছু সংখ্যকের ওপর ১০ শতাংশ হারে শুল্কারোপ বিলম্বিতকরণ-বিষয়ক ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সপক্ষেও তিনি জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেন। এবিসির দিস উইককে পিটার নভারো জোর দিয়ে বলেন, সমগ্র বিশ্বের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি স্ট্রংগেস্ট বা সর্বাপেক্ষা মজবুত। আমাদের স্টক মার্কেটের জন্য এখানে অর্থের আগমন ঘটছে। চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ট্রাম্পের শুল্কারোপ প্রচেষ্টার সপক্ষে পিটার নভারো সিবিএস ফেইস দ্য নেশনকে বলেন, চীনকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্ট্র্যাটেজির এটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মূলত আমেরিকার রয়েছে রিসেসন বা আর্থিক মন্দার দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী রিসেসনের সময় আমেরিকার অন্যান্য এলাকার মতো নিউইয়র্ক সিটিতেও লাখ লাখ লোক বেকারত্বসহ চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন চরম বেকারত্ব এবং অবনতিশীল পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে মহৈশ্বর্যশালী ইনভেস্টর রকফেলার ঐতিহ্যবাহী আকাশ আড়াল করা রকফেলার সেন্টার নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীকে কাজে নিয়োজিত করেন। সেই মহামন্দার ভয়াবহ স্মৃতি অদ্যাবধি বর্ষীয়ান আমেরিকানদের মন থেকে হারিয়ে যায়নি। তাই রিসেসনের কথা শোনামাত্রই অজানা আশঙ্কায় অনেকেরই অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যেষ্ঠ বুশের কার্যকালের রিসেসনও আমেরিকার আর্থিক ভিতকে নড়বড়ে করে তুলেছিল। ২০০৭ সালের শেষ দিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কার্যকালের আর্থিক মহামন্দার শিকার হয়ে অনেকে বাড়িঘর হারিয়ে পথে বসেছেন, অসংখ্য ব্যবসা-বাণিজ্যে লালবাতি জ্বলেছে এবং জনগণের দুর্ভোগ তুঙ্গে উঠেছিল। তাই নতুন মহামন্দার সংবাদে অনেকেরই হৃৎকম্প শুরু হয়েছিল। অবশেষে ট্রাম্পের ঘোষণায় জনমনে স্বস্তি বহুলাংশে ফিরে এসেছে।
উল্লেখ্য, স্টক মার্কেটে বড় ধরনের দরপতন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন হ্রাস রিসেসনের পূর্বাভাস দেয়। গত সপ্তাহে স্টক মার্কেটে ভয়াবহ দরপতন হয়েছে এবং একই দিবসে ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ ৮০০ পয়েন্ট নিম্নগামী হওয়ায় রেসিসনের সুস্পষ্ট আভাস ফুটে উঠেছিল। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সংকেতদানকারী উপসর্গ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, শুধু আমেরিকা একা নয়, গোটা বিশ্বেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তার পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রিসেসন বা আর্থিক মহামন্দার আশঙ্কা নাকচ করে দেন। তা ছাড়া চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্কারোপ করা গেলে পণ্যসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাবে এবং তা ক্রিসমাস কেনাকাটার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমেরিকান রিটেলাররা এ ধরনের যুক্তি প্রদর্শনের পরই প্রেসিডেন্ট চীনা পণ্যের ওপর শুল্কারোপ ডিসেম্বরের মধ্যভাগ পর্যন্ত স্থগিত করেছেন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট পদে ডেমক্র্যাট দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কয়েকজন পিটার নভারোর আশাবাদের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কের ডেমক্র্যাটিক দলীয় ইউএস সিনেটর জিলি ব্র্যান্ড এবিসি দিস উইককে বলেন, আমার মনে হয় কিচেন টেবিলে আমেরিকান পরিবারগুলো যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে পিটার নভারোর বক্তব্যে তার রেশ পাওয়া যায়নি।
স্টেট অব দ্য ইউনিয়নকে পিটে বাটিগিগ বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে আমেরিকার কৃষকরা প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছেন। চীনকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য চীন থেকে আমাদানিকৃত পণ্যের ওপর ট্রাম্পের করারোপের বিষয়টিকেও তিনি অর্বাচীনসুলভ আচরণ বলে অভিহিত করেন।
দ্য ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর বিজনেস ইকোনমিস্টস (এনএবিই) বিশ্বাস করে, আগামী বছরের ফেব্রæয়ারি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব খাতেই এই মন্দা শুরু হবে। বিষয়টি নিয়ে এনএবিই একটি জরিপ করে। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভ থেকে ইতোমধ্যেই ব্যাংক সুদের হার ২০১৮ সালের আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরে ট্রাম্পের নির্দেশে ব্যাংকের সুদের হার ২০১৮ সালের তুলনায় বাড়ানো হয়েছিল অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে। এনএবিই প্রেসিডেন্ট কন্সট্যান্স হান্টার বলেন, ‘জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে মুদ্রানীতি পাল্টানোর মাধ্যমে অর্থমন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে। তবে এটা ঠিক যে বাস্তবিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুসারে ২০২০ অথবা ২০২১ সাল নাগাদ মন্দার শুরু হতে পারে।’
অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ বলেন, ২০২১ সালে মন্দার শুরু হবে। তবে ২০২১ সালে তা শুরু হলেও আগামী বছরেই মন্দার প্রভাব পড়তে শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। অনেকের ভাষায় ট্রাম্পের আয়করের হার কমানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে।