আ’লীগ-বিএনপির শক্তির মহড়ায় জনমনে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিনিধি : দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান দুই বড় দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি উভয়েই চাচ্ছে ব্যাপক শোডাউনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও জনসমর্থন প্রমাণ করতে। এরই অংশ হিসেবে সরকারবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে চলেছে বিএনপি, যা শেষ হবে আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে আরও বড় কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার চিন্তা রয়েছে দলটির। অন্যদিকে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য কৌশলী অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। তারাও বিভাগীয় শহর ও রাজধানীকে টার্গেট করে আগামী দুই মাসের রাজনৈতিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে। অর্থাৎ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজপথে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শক্তির মহড়া দেখা যাবে। দুই দলের এই শক্তির মহড়ায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও রক্তারক্তির আশঙ্কায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
এরই মধ্যে এক দফা রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করেছে ক্ষমতাসীনরা। গত ২৯ অক্টোবর শনিবার ব্যাপক লোকসমাগমের মধ্য দিয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন শেষ করেছে দলটি। অন্যদিকে রংপুরে আরেক দফা শক্তির মহড়া দিয়েছে বিএনপি। সকল বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সফলভাবে চতুর্থ বিভাগীয় সম্মেলন শেষ করেছে তারা। জনসমর্থন তুলে ধরতেই উভয় দল সমাবেশে বেশি লোকসমাগম করতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
নিজ নিজ দলের সমাবেশে লোকসমাগম নিয়ে উভয় দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। দলীয় কর্মসূচিতে বেশি মানুষের উপস্থিতি ঘটানো আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন নেতারা।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মানুষের উপস্থিতি নিয়ে গত ২৮ অক্টোবর শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, জনসমাগম কাকে বলে শনিবার (২৯ অক্টোবর) বিএনপিকে তা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেটা বুঝিয়েছেনও ওবায়দুল কাদের। ২৯ অক্টোবর শনিবার ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের সাবেক বাণিজ্যমেলার খেলার মাঠে। ঢাকা জেলার কর্মসূচি হলেও এখানে ঢাকা মহানগরসহ আশপাশের জেলার নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, রাজধানীর বিভিন্ন উপজেলার নেতাকর্মীরা ট্রাক ও বাসে করে সম্মেলনস্থলে এসে হাজির হন। মূলত সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বিপুল লোকসমাগম ঘটিয়ে শক্তির মহড়া দিল ক্ষমতাসীন দলটি।
ওবায়দুল কাদেরের পাল্টা বক্তব্যে ২৮ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনার মতো রংপুরের সমাবেশকেও বন্ধ করার জন্য সরকার পেটুয়া ইউনিয়নকে দিয়ে ধর্মঘট ডাকাচ্ছে। রংপুরে ব্যাপক সমাগম হবে বলে আশাবাদ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণ হেঁটে বিভিন্নভাবে সমাবেশে এসে উপস্থিত হচ্ছে। বৃহত্তর রংপুরের জনগণ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে জানান দেবে এ সরকারকে আমরা চাই না। মির্জা ফখরুলও তার কথার যথার্থতা প্রমাণ করেছেন। ২৯ অক্টোবর রংপুরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে বিএনপির গণসমাবেশে বিপুল জনসমাগম হয়। সমাবেশের দুই দিন আগে থেকেই পরিবহন চলাচল বন্ধ করা হলেও মানুষের স্রোত আটকানো সম্ভব হয়নি।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক কর্মসূচিতে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হামলার পর থেকেই আন্দোলন বেগবান করে বিএনপি। ঘোষণা দেওয়া হয় অবিলম্বে সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ভেঙে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। সংসদ বিলুপ্ত করতে হবে।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, এটা তাদের এক দফা দাবি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সারা দেশে আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন। এরই মধ্যে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় সংলাপ করে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বিএনপি। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ১০ বিভাগে গণসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। পরে ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামে প্রথম কর্মসূচি পালন করে। ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহে, ২২ অক্টোবর খুলনায় এবং ২৯ অক্টোবর রংপুরে গণসমাবেশ করে দলটি। আগামী ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট, ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী এবং সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় তৃতীয় ধাপের কর্মসূচি শেষ করবে বিএনপি। এরপর নতুন কর্মসূচি আসবে বলে জানান বিএনপির নেতারা।
এদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির মাঠ দখলের ধারাবাহিক কর্মসূচির পাল্টা হিসেবে তারাও নানা কায়দায় নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজনীতির মাঠ দখলে রাখতে চায় আগামী নির্বাচন পর্যন্ত। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী দুই মাসের মধ্যে ঢাকার প্রতিটি থানায় সমাবেশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আগামী ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। ১১ নভেম্বর যুবলীগের পক্ষ থেকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার কথা রয়েছে। এই সমাবেশেও প্রধান অতিথি হিসেবে শেখ হাসিনার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে ১১ নভেম্বরের পর থেকে সহযোগী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক সম্মেলন হবে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন-প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে ক্ষমতাসীন দলটি। ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। এদিন ৬৪ জেলাসহ দেশের সব উপজেলার কাউন্সিলর ও অতিথিরা সম্মেলনে যোগ দেবেন। সব মিলিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপির পাল্টা রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে মাঠ দখলে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুই দলের এমন মুখোমুখি অবস্থানে দেশ সংঘাতের দিকে চলে যাচ্ছে। এতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুই দলের শক্তির মহড়া প্রদর্শন করতে গিয়ে উভয় দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হতে পারে রাজপথ। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে দেশের। তাই মানুষের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় উভয় দলকে সংঘাতের পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।