আসলেই কি সিনহা চ্যাপ্টার ক্লোজড!

অনেকেই মনে করছেন এবং কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেনও, সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার অধ্যায় শেষ। হিজ চ্যাপ্টার ইজ ক্লোজড। এ ভাবনা এবং উৎফুল্লতা-উচ্ছ্বাস একান্তই একপক্ষীয় বা একদলীয়। কিন্তু বিষয়টা কি তা-ই? আসলেই কি এসকে সিনহার চ্যাপ্টার ক্লোজড? যেভাবে এসকে সিনহাকে পদ থেকে সরানোর ব্যবস্থা করা হলো, তার স্মৃতি কি বাংলাদেশের মানুষ খুব সহজেই ভুলতে পারবে? ভবিষ্যতে সিনহার ঘটনাটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ওপর সরকারি দলের হস্তক্ষেপের কুদৃষ্টান্ত হিসেবে যেভাবে বারবার উঠে আসবে এবং ভবিষ্যতে একটি কালো দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হবে, তা কি খুব সহজেই অধ্যায়টি ক্লোজ করতে দেবে। ইতিহাসও কি বিষয়টি তার পাতা থেকে মুছে ফেলতে পারবে? এতগুলো প্রশ্ন সামনে রেখে খুব সহজেই বলে দেওয়া যায়, বিষয়টি ক্লোজড ভেবে যারা আত্মপ্রসাদ এবং তৃপ্তি পায় পাক, কিন্তু চ্যাপ্টারটি যে খুব সহজে ক্লোজড হচ্ছে না, তা প্রায় নিশ্চিত। ঠিক এই সময়টাতে অবশ্য প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ করা, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ এবং পরবর্তী বিচারক কে হচ্ছেন-এসব উত্তপ্ত আলোচনার চাপে তার পদত্যাগ-প্রক্রিয়ার পরিণতি নিয়ে নাগরিক ভাবনা অনেকটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। তার অর্থ সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আসলে যারা বিষয়টি ধাপাচাপা দিতে চাচ্ছেন, তারা খুব খুশি হন, যদি সত্যি সত্যি বিষয়টি অন্য সব ডামাডোলে চিরদিনের জন্যই হারিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয় যে, এ রকম একটি ঘটনা, যা একটি দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ভয়ংকর খারাপ দৃষ্টান্ত, তা চিরদিনের জন্য চাপা দিয়ে রাখা যায় না, চাপা থাকে না। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ঘোষণার পর থেকে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে নিয়ে মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের নানামুখী আলোচনায় বাংলাদেশ সরগরম হয়ে উঠেছিল। সরকার যে তার দলীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছুই সহ্য করতে রাজি নয়, তাতে রাষ্ট্রের স্বার্থ কিংবা বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা যতই ক্ষুণœ হোক, সরকারের সে চেহারাও দেশের মানুষ দেখার সুযোগ পেয়েছে। সরকারে একদা যারা সজ্জন হিসেবে পরিচিত ছিলেন, স্বার্থে আঘাত লাগলে তারাও যে কতটা অসজ্জন হয়ে উঠতে পারেন, সেটাও বাংলাদেশের মানুষ এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখার সুযোগ পেল। ঠিকানার ১৭ নভেম্বর সংখ্যার ৪০ পৃষ্ঠার একটি সংবাদ : ‘প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান’। আসলে বিচার বিভাগ নিয়ে সরকার যে মনোভাব প্রকাশ করল, তাতে বিষয়টির অবসান ঘটল, নাকি কারও কারও কথা ‘সিনহা চ্যাপ্টার ইজ ক্লোজড’ হয়ে গেল, তা এখনই কতটা নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে, সেটা গভীর ভাবনার বিষয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মন্তব্য, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরকার যে আচরণ দেখাল, তাতে এত সহজেই চ্যাপ্টারটি ক্লোজড হয়ে যাবে, ভাবাটা ঠিক নয়। এ রকম একটি গুরুতর বিষয়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে আজকের সরকার যদি পার পেয়েও যায়, তবু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিচার বিভাগ পার পাবে না। এর ফল বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে চরম মূল্য দিয়েই ভোগ করতে হবে। অভিজ্ঞজনদের অভিমত, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবেই রাষ্ট্রপতি। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সাংবিধানিকভাবে যতই রাষ্ট্রের দলনিরপেক্ষ অভিভাবক হন না কেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিজ দলের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ এবং দায়বদ্ধতা অনুভব করবেন না-এমন ভাবনাটা খুবই কাঁচা ভাবনা। এছাড়া তিনি রাষ্ট্রপতি হলেও সাংবিধানিকভাবে তাকে সব কাজে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে হয়। এ রকম ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রীর কাছে রাষ্ট্রপতির জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতাই বলতে হবে। সেখানে তার কাছে রাষ্ট্রের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে নিখাদ নিরপেক্ষতা আশা করা বাতুলতা। দলীয় রাষ্ট্রপতিকে নিরপেক্ষতা প্রদর্শনের খেসারত দিতে বাংলাদেশের মানুষ আগেও দেখেছে। তিনি যে দুর্গতির শিকার হয়েছেন, নিজ দলের মানুষের হাতেই, সে দৃষ্টান্ত অন্যের জন্যও শিক্ষণীয় হয়ে আছে। সেই নজির বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কর্মেও প্রকাশ ঘটতে দেখেছে বাংলাদেশ। কয়েকজন বিচারপতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ‘অভিযোগনামা’ নিয়ে যেভাবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদের অভিযোগপত্র যে প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করলেন, তা এককথায় নজিরবিহীন কুদৃষ্টান্ত। এখানে রাষ্ট্রের অভিভাবকের নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা দুটোই ক্ষুণœ হয়েছে; যা একটি দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আদালত যখন ক্ষমতাসীন সরকারের আজ্ঞাবহ হয়, তখন সাধারণ মানুষের দাঁড়াবার এবং ন্যায়বিচার লাভের আর কোনো পথ খোলা থাকে না। তখন ন্যায়বিচার, আইনের শাসন সবকিছু হয়ে যায় সরকারের করুণার বিষয়। বিচার বিভাগ, বিচারপতিদের নিয়োগ-প্রক্রিয়া যদি সরকারের হাতে বন্দী হয়, তবে একই সঙ্গে বন্দী হয় ন্যায়বিচার, সুশাসন, গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা, সংবিধান সবকিছু। সূচনা হয় স্বৈরতন্ত্রের পথে যাত্রা। স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয় নাগরিক জীবন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার মূল চারটি স্তম্ভ থেকে সরে আসাও এই বন্দিদশারই কুফল। এ জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ অগ্রগতির পথে বারবার হোঁচট খেয়েছে। একটি জাতির সব সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ নির্বাহী বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ। সব বিভাগ যখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তখন রাষ্ট্রে অচলাবস্থা দেখা দেয়। সাংবিধানিকভাবে তিনটি বিভাগের স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা বলাও হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল অনেক দেশেই অন্য দুই বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব করতে দেখা যায়। যেহেতু নির্বাহী বিভাগ পরিচালিত হয় সরকারের দ্বারা এবং তারা রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি, তাদের হাতে থাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং থাকে নিজস্ব দল এবং কায়েমি স্বার্থবাদী গ্রুপ। তাই তারা ছলে-বলে, কলে-কৌশলে রাষ্ট্রের সবকিছু নিজেদের ইচ্ছাধীন করে নিতে পারে, যদি প্রকৃত অর্থে তারা নিজেরা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার স্তম্ভের যদিও অন্যতম প্রধান স্তম্ভ গণতন্ত্র এবং সব দলই ক্ষমতায় এসেছে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অঙ্গীকার করে, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃত গণতন্ত্রের দেখা কখনোই পায়নি। গণতন্ত্রের নামে তাদের সব সময় একনায়কতন্ত্রই দেখতে হয়েছে। ‘উইনার টেক্স দ্য অল’ এই প্রবাদবাক্যের উৎকৃষ্টতম উদাহরণ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে গণতন্ত্রের নামেই একনায়কতন্ত্র, স্বৈরশাসন সবকিছু হালাল করা হয়। কিন্তু তার ফল যে ভালো হয় না, তার দৃষ্টান্তও বাংলাদেশ। তাই আজ সিনহার চ্যাপ্টার ক্লোজড মনে হলেও ভবিষ্যতে এই ক্লোজড চ্যাপ্টারই কীভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, কে জানে! যারা একেবারে ‘ক্লোজড’ ভেবে আজ উল্লসিত হচ্ছেন এবং স্বস্তি পাচ্ছেন, ভবিষ্যতে তাদের এই স্বস্তি না-ও থাকতে পারে। কেননা দৃষ্টান্তটা খারাপ-সে কথা এখনই অনেকে বলছেন। ভবিষ্যতে যখন আজকের ক্ষমতাবানরা ক্ষমতায় থাকবেন না, তখন আরও বেশি করে কথা হবে।