আসলে কোনটা সত্য এবং কতটা সত্য

দেশে এখন খবরের ঘনঘটা। ২০২৪-এর শুরুতেই জাতীয় নির্বাচন-এমনটাই নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা। যদিও বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন মানবে না-ধনুর্ভঙ্গপণ বিএনপিসহ তাদের সমর্থক দলগুলোর। তার মধ্যেও শোনা যায়, ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ছোট-বড়, সরকারপন্থী, সরকারবিরোধী সব দলই। সেসব সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের পথে না গিয়ে এ কথা বলা যায়, নির্বাচনকে সামনে নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করে চলেছে। বাংলাদেশে রাজনীতির ধারামতো এ উত্তাপে এখনো আগুন জ্বলে উঠতে দেখা না গেলেও লাঠালাঠি, মাথা ফাটাফাটি দেখা যাচ্ছে অনেক জায়গাতেই।

এসব উত্তাপ-অস্থিরতার ফাঁকফোকর দিয়ে তৃতীয় শক্তির উঁকিঝুঁকি মারার কথাও চাউর হচ্ছে। বাংলাদেশে তৃতীয় শক্তির উত্থানের খবর নতুন নয় এবং বনে বাঘ আসার মতো তৃতীয় শক্তির খবর আর উটকো খবরও থাকে না। সত্যি হতে দেখা গেছে কয়েকবারই। এই তৃতীয় শক্তির উত্থানের কারণে যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়, ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়ে, দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করেন-সেই কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র আজও অধরাই থেকে গেল বলে কথা ওঠে। বাংলাদেশে রাজনীতির অদ্ভুত খেলা বটে! বিরোধী দল যখন আন্দোলনে নামে, তাদের প্রধান দাবি হয় গণতন্ত্র। ক্ষমতায় গেলেই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয় নিজেদের পকেটতন্ত্র। রাজনীতির ধারাবাহিক এই খেলায় কেটে গেল ৫১টি বছর। আজও সেই একই স্লোগান, একই দাবি ওঠে জনগণের নামে। জ্বালাও-পোড়াওয়ে জীবন দেয় জনগণ। ক্ষতি গোনে জনগণ। কিন্তু খাওয়ার সময় দই খেয়ে যায় নেপো! আর প্রথম-দ্বিতীয় শক্তির ডামাডোলের মধ্যে তৃতীয় শক্তি উঁকি মারে! দুই শক্তি পানি ঘোলা করে। মাছ ধরে নেয় তৃতীয় শক্তি!

আরো একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। রাজনীতির মাঠ যখন দুই দলের খেলায় গরম, তৃতীয় শক্তির পেছনে আরেকটি শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই শক্তিকে বলা হয় তৃতীয় শক্তির মূল শক্তি। এই শক্তি হচ্ছে বিদেশি শক্তি। ছোট ছোট দেশ নিয়ে বড় বড় দেশের অনেক স্বার্থ থাকে, লক্ষ্য এবং পরিকল্পনা থাকে। সেসব বাস্তবায়নে তাদের ফাঁদে পা জড়াতে দেশীয় নেতাদের নানা কৌশলে, নানা প্রলোভনে আকর্ষণ করে। জেনে, না জেনে দেশীয় নেতারা ওই ফাঁদে পা ফেলেন। পাকিস্তান আমল থেকে এই তৃতীয় শক্তির ক্ষমতার মঞ্চে আগমন ঘটতে দেখেছে মানুষ। পাকিস্তান আমলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রথম পথ দেখান মার্শাল ল’র। পাকিস্তানের মসনদে তিনি আসীন হন ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। তার পথ অনুসরণ করে তার জুনিয়র শিষ্যরা আসেন মার্শাল ল’ সঙ্গে নিয়ে। তারপর ইয়াহিয়া খান এসে তো বাঙালি মেরে-কেটে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে বাংলাদেশ ছারখার করে এমন অবস্থা সৃষ্টি করলেন যে, পাকিস্তান আর থাকতেই পারল না, ভেঙে দুই টুকরো।

বাঙালিরা কোনো দিনই কারো দুঃশাসন, কারো পাগলামি মেনে নেননি। দেশকে, জননী জন্মভূমিকে সবকিছুর উপরে স্থান দেন। দেশ এবং জননীকে রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দেন। তাইতো অপকৌশল ব্যবহার করে যে যত দিনই ক্ষমতা চালাক, পরিণতি কারো খুব ভালো হয় না। বাংলাদেশে এখন নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এই সুযোগে অতীতের মতোই উঁকিঝুঁকি মারছে তৃতীয় শক্তি এবং সেই শক্তির পেছনে রয়েছে আরো অনেক দেশের উৎসাহ। এমনকি অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার দিক থেকেও বেশ সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ বিষয়টি তো অত্যন্ত দৃশ্যমান, বাংলাদেশে এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের চেয়েও ব্যস্ত দেখা যায় অনেক দেশের কূটনীতিককে। প্রকাশ্যে তাদের এ দলের কার্যালয় থেকে ও দলের কার্যালয়ে ছোটাছুটি দেখা যায়। এ নিয়ে অনেক কথাও হচ্ছে পত্রপত্রিকায়। কে কার মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করতে চায়, দেশের অর্থনীতি উদ্ধারে কোন বিশ্বসংস্থা হাত বাড়িয়েছে-এসবও বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে জানা যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি বলা হয়, বিদেশি শক্তিও অন্যতম অংশীজন, তবে অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না।

ঠিকানার গত ১৬ নভেম্বর সংখ্যার লিড শিরোনাম ‘তৃতীয় শক্তির উঁকিঝুঁকি’। নিচের দিকে আইএমএফ অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড এবং বিশ্বব্যাংকের তৎপরতার খবরও আছে। মানে বাংলাদেশকে উদ্ধারে সবাই উদারহস্ত, ‘টাকা নাও, পরামর্শ নাও! আর আমাদের কথা শোনো।’ ‘গরিবের সুন্দরী বউ নাকি সকলের বউদি’-সে রকম দেশ ছোট কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। তাদের নিয়ে পরাশক্তি এবং বড় বড় দেশ এভাবেই টানাহেঁচড়া করে। তারা ছোট ছোট দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে বড় কোনো প্রতিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা নিতে চায়।

বাংলাদেশে এখন নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। বিএনপি ১৪-১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে। তাদেরও আর ধৈর্য থাকছে না। যেকোনোভাবেই হোক তাদের ক্ষমতা চাই। বিএনপি এখন মরণকামড় দিয়ে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর। বিএনপির কাছে তাই ‘ন্যায়-অন্যায় জানি না, শুধু ক্ষমতা জানি’ অবস্থা। গত দু-তিনটি নির্বাচনের মতো এবার কোন দলের অবস্থান কত পরিষ্কার, তা আগেভাগে অনুমান করা যাচ্ছে না। আগে থেকে আঁচ করে হিসাব মেলানোর অবস্থা এবার নয়। তাই এ অবস্থায় তৃতীয়-চতুর্থ শক্তিও হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এবার লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে। এই সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হবে নানামুখী সংকট। যেমন রাজনৈতিক সংকট, তেমনি অর্থনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে প্রধান সংকট হিসেবে দেখা দেবে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হবে, নাকি বিএনপির দাবিমতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বর্তমান ইসির অধীনে নির্বাচন হলে প্রায় শতভাগ আসনে বলে দেওয়া যায়-২০২৪-এর নির্বাচনের ফলও ২০১৪ এবং ২০১৮’র ব্যতিক্রম কিছু হবে না। তাই ক্ষমতাসীনরা যে কিছুতেই নির্দলীয় কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে চাইবে না বাধ্য না হলে, তা বলাই যায়। এ নিয়েই খুনোখুনি শুরু হয়ে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিই তৃতীয় শক্তির জন্য ঘোলা পানি, যা তৃতীয় শক্তির পক্ষে মাছ শিকার করার উত্তম পরিবেশ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যত অন্ধকার হয়ে আসবে, তৃতীয় শক্তির চোখগুলো তত জ্বলজ্বল করতে দেখা যাবে। এ রকম পরিস্থিতি এড়ানোর একমাত্র পথ সমঝোতা। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি সমঝোতায় আসা। নইলে উঁকি মারা তৃতীয় শক্তি মঞ্চে কখন হাজির হয়ে যাবে, কে জানে। আর প্রথমেই তারা গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরবে আর মানুষের বাক-স্বাধীনতা হরণ করে নেবে। তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় এসেই প্রথম কাজ বা কর্তব্য হিসেবে সংবিধান স্থগিত করে দেবে।
২০২৪ সালের শুরুতেই বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে জনগণের প্রত্যাশা তাই, বিশেষ করে বড় দুই দল-আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একটি কার্যকর সমঝোতায় আসবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে। নইলে দেশের ক্ষমতা বানরের সেই গল্পের রুটি ভাগের মতো হবে। তবে ভবিষ্যৎ বলে দেবে আগামীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনটা সত্য হবে এবং কতটা সত্য হবে। অতীতের ইতিহাস থেকে যদি আমাদের নেতারা কোনো শিক্ষা নিতে পারেন, তবেই সবার জন্য মঙ্গল। সেদিকেই জাতি তাকিয়ে থাকবে।