আ.লীগ-বিএনপির বাগযুদ্ধে উত্তপ্ত রাজনীতি

নূরুল ইসলাম : দ্বাদশ নির্বাচনের এখনো বছরখানেক বাকি। এরই মধ্যে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চলছে বাগ্্যুদ্ধ। ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনাও। হ্যাটট্রিক সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ বলছে, শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে এবং দেশ সংস্কার হবে। কাউকে আর দুর্নীতি করতে দেওয়া হবে না। বিএনপি দাবি করছে, সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। এ নিয়ে তাদের ১০ দফার আন্দোলন চলছে। সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে ২৭ দফার মাধ্যমে দেশকে সংস্কার করা হবে। দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কমিশন গঠন করা হবে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে ধরে নিয়েই নির্বাচনী মহাপরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। এবারের নির্বাচনে দলের প্রচার ও বিরোধীদের ‘সমালোচনা ও অপপ্রচার’ মোকাবিলার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সাংগঠনিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রচলিত প্রচার-পদ্ধতির অংশ হিসেবে সভা-সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার, ফেস্টুন-লিফলেটের পাশাপাশি এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমকে। আর এ কাজের জন্য ১০ লাখ প্রশিক্ষিত প্রচারকর্মী মাঠে নামানোর মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে শাসক দল।
অন্যদিকে ১৬ জানুয়ারি নয়াপল্টনে বিএনপির যুগপৎ কর্মসূচি পালন এবং ঢাকার আরো ১১ স্থানে একই কর্মসূচি পালন করে বিরোধীরা। দেওয়া হয় নতুন কর্মসূচি। আগামী ২৫ জানুয়ারি দেশব্যাপী মহানগর ও জেলা সদরে সমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের কর্মসূচির দিনে ১৬ জানুয়ারি পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সাত স্পটে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে দলটি।
সরকারি দল ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। ঢাকায় যানজটে বাড়ছে ভোগান্তি। আতঙ্কের ভাঁজ পড়েছে জনমনে। আন্দোলন-কর্মসূচির পাশাপাশি উভয় দলের দায়িত্বশীল নেতাদের লাগামছাড়া কথাবার্তা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরো উত্তপ্ত করে তুলছে। কর্মীদের সহিংস হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করছে। গত কয়েক মাস ধরেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা একে অন্যকে ঘায়েল করতে কথার যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। নতুন বছরের শুরু থেকে এই বাগ্যুদ্ধ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের নেতারা যেসব কথাবার্তা বলছেন, তার কয়েকটি নিচে উদ্ধৃত হলো।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের স্বাধীনতা থাকবে না, গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণ করবে। খেলা হবে, খেলা হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, খেলা হবে গণতন্ত্র হত্যার বিরুদ্ধে। তিনি আরো বলেছেন, ৫৪টি দল আজ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের অবস্থানে কী হবে? ঘোড়ার ডিম পাড়বে। ৫৪টি ঘোড়ার ডিম পাড়বে ৫৪টি বিরোধী রাজনৈতিক দল। ৫৪ দল একজন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নেমেছে। তারা ভুয়া।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির নেতারা যদি সরকার পতন করতে না পারেন, তাহলে পল্টন কার্যালয়ের সামনে নেতাদের কান ধরে উঠবস করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, লজ্জা থাকলে বিএনপি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কর্মসূচি দিত না। রাজপথ উত্তপ্ত করতে চাইলে জবাব দেওয়া হবে। প্রতিহত করা হবে।
এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, আসুন, এই স্বৈরশাসকের দুঃশাসনের তখতে তাউসকে সরিয়ে সেখানে জনগণের সরকার, জনগণের পার্লামেন্ট গঠন করি। আওয়ামী লীগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সে জন্য তাদের এখন পুলিশের ওপর নির্ভর করে, আমলাদের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জোর করে দখল করে রাখতে হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের উদ্দেশে বলেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আন্দোলনকে বিশ্বাস করে। আমাদের কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা করবেন না। যদি করেন তার ফলাফল ভালো হবে না। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, বিশ্বের কোনো দেশ এই সরকারকে আর দেখতে চায় না। দেশের জনগণও আর এই সরকারকে দেখতে চায় না। গণ-অভ্যুত্থান করে সরকারের বিদায় নিশ্চিত করা হবে।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান বলেছেন, ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষ অবস্থান করেছেন ১০ দফা দাবি আদায়ের জন্য। এই সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হবে। ভোটারবিহীন এমপিদের টেনে নামানো হবে। শেখ হাসিনার পতন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ফয়সালা হবে রাজপথে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেছেন, যেভাবে ওবায়দুল কাদের মঞ্চ ভেঙে পড়েছেন, তেমনি এই সরকারও ভেঙে পড়বে।
বিএনপির স্বনির্ভর-বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা বলেছেন, এই সরকার কারাগারকে উন্নত করছে। তারা জানে কারাগারই তাদের আসল ঠিকানা। আর শেখ হাসিনার ঠিকানা হবে কেরানীগঞ্জ কারাগারে।