ইংরেজি নববর্ষ ২০১৮ স্বাগত

বলা হয়, সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। অপেক্ষা করে না, বোঝে সবাই। প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুই কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তবে সময়ের মতো এত দ্রুত বুঝি আর কিছু চলে যায় না। যেন চোখের পলকে বছর শেষ! এক বছর শুরু হতে না হতেই আরেক বছরের পদধ্বনি। মনে হয়, এই তো সেদিন শুরু হলো ২০১৭ সাল। দেখতে না দেখতে সামনে ২০১৮। সবাই আনন্দ, উত্তেজনা এবং বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষমাণ ২০১৮-কে স্বাগত জানাতে। মানুষের যত না আফসোস থাকে পার হয়ে আসা বছরকে নিয়ে, অপ্রাপ্তির হতাশা এবং দুঃখবোধ যত থাকে ফেলে আসা দিনকে নিয়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা রাখে সামনের বছর, সামনের দিনগুলোকে নিয়ে। সে কারণেই বিগত বছরে অনেক কিছু না পেয়েও, অনেক কিছু অপ্রাপ্তি রেখেও সামনের দিকে তাকিয়ে বুকভরা আশা নিয়ে মানুষ গাইতে পারে : ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক…। যা কিছু জীর্ণ, যা কিছু পুরাতন, সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে নতুনকে আবাহন করতে চায় দুই বাহু বাড়িয়ে। আসলে নতুনের প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত। নতুনের মধ্যে মানুষের আশা লুকিয়ে থাকে। ভবিষ্যতের মধ্যে মানুষ ভরসা পায়। যদিও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে সব সময় থেকে যায় বিস্তর ফারাক। এই ফারাক ঘোচানোর লড়াই-ই হচ্ছে মানুষের জীবন। মানুষের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার মধ্যে ফাঁক সব সময় থেকেই যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে এই ফাঁক একটু বেশিই থাকে। তা সত্ত্বেও মানুষ আশা নিয়ে চলে। নতুন বছরও শুরু করে প্রত্যাশাপ্রাপ্তির ফারাক ঘুচিয়ে আনার নতুন স্বপ্ন নিয়ে। এই স্বপ্ন জয়ের লড়াই-ই মানুষকে সজীব রাখে। সামনে পা ফেলার শক্তি জোগায়। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, সামাজিক করে। মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়াতে হয়। ওলট-পালট, ঝড়ঝাপ্টা, কত ঘটনার ঘনঘটা। আনন্দ-বেদনা। বিশ্ব পরিসরে স্বদেশ-প্রবাস সবখানেই সৃষ্টি ও ধ্বংস। গত বছরটি আমরা অতিক্রম করে এলাম অনেকগুলো অভূতপূর্ব ঘটনার মধ্য দিয়ে। এখনো অনেক কিছু আমাদের সামনে অপেক্ষমাণ, সব চ্যালেঞ্জ আমাদের হয়তো আগত নতুন বছরেও নিতে হবে। বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। আমেরিকা আমাদের আবাসভূমি। আবার আজকের আধুনিক কনসেপ্টে বিশ্ব নাগরিকও আমরা। তাই বাংলাদেশ, আমেরিকা বা আন্তর্জাতিক পরিসরে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই আমাদের জীবনকে আলোড়িত করে। আবার আগামী দিনে কী ঘটতে পারে না পারে, তার সম্ভাবনা আমাদের মনকে উদ্বেলিত করে নতুন আলোয়। আবার আশঙ্কার ছায়াও আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২০১৬-তে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পর থেকেই আমেরিকা তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে অস্থিরতা। অনেকগুলো মুসলিম দেশের নাগরিকদের আমেরিকা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি যেমন আমেরিকার বাইরে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি আমেরিকার ভেতরেও একধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সুপার মার্কেট এবং অতি সম্প্রতি নিউইয়র্কে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পর পর দুটি সন্ত্রাসী ঘটনা বছরের শেষাংশে মানুষকে বেশ আতঙ্কিত করে তুলেছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরো কিছু পদক্ষেপ নাগরিক জীবনকে উদ্বেগের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। বিশেষ করে ট্যাক্স সংস্কার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষ খুবই উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহই নয়, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত অন্যান্য দেশকেও উসকে দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্বেই একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিবাসী জীবনকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে অভিবাসন আইন নিয়ে একেক সময় একেক রকম কথা বলে। অন্যদিকে সৌদি আরবে সাম্প্রতিক মিসাইল হামলাও বিশ্ব পরিস্থিতিকে একটা অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবের নতুন যুবরাজ সোলায়মানের বিভিন্ন তৎপরতাও সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মুসলিম বিদ্রোহী গ্রুপের টার্গেটে পরিণত হয়েছে সৌদি রাজতন্ত্র। এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা নিয়ে বিশ্বব্যাপীই একটি নতুন অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আর উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং উপর্যুপরি হুমকি ও উত্তেজনার একটি স্থায়ী কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দিকে তাকালেও শান্তির সুবাতাস অনুভব করা যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে এমন সব ঘটনা। ক্ষমতা নিয়ে অনৈতিক তৎপরতাও মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার আরেকটি কারণ। আর এসব ঘটনার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। নতুন বছরের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যেমন আশার স্বপ্ন দেখছে, তেমনি ২০১৮-তে জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন হওয়ার কথা, তা নিয়েও জনমনে রয়েছে গভীর আশঙ্কা। বিরোধী দলের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের ক্ষত এখনো যেমন বাংলাদেশের মানুষের মনে তরতাজা, তেমনি সেই আন্দোলনের কারণ একতরফা নির্বাচনের চক্রান্ত এবং বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে সরকার এবং সরকারি দলের নিষ্ঠুরতার ক্ষত জনমনে আজও দগদগে। বাংলাদেশের বিজয় দিবস, বিশ্বজুড়ে খ্রিষ্টধর্মের শুভ বড়দিন উদ্যাপন করার পর সারা দুনিয়ার মানুষ সব শুভ প্রত্যাশা নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছে ইংরেজি নববর্ষ ২০১৮ সালকে সুস্বাগত জানাতে। সবারই প্রার্থনা-অতীতের সব গ্লানি মুছে যাক, সব আবর্জনা পুড়ে ছাই হোক। অশান্তি, রোগ-জরা, যুদ্ধ-সংঘাত, রক্তপাত-প্রাণহানি-ধ্বংসের বিনাশ ঘটুক। মানুষের জীবন শান্তিতে, স্বস্তিতে ভরে উঠুক। সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধে মানুষ মহত্ত্বের আলোয় উদ্ভাসিত হোক। ২০১৮ সালে মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হোক : ‘চাই না যুদ্ধ, চাই শান্তি। চাই না ধ্বংস, চাই সৃষ্টি।’ বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হোক মানবতা ও সভ্যতার শত্রু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদের আওয়াজ উঠুক মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। মানবতার পক্ষে সৃষ্টির আনন্দে যেন সবাই মেতে উঠি। ২০১৮ সালে আমাদের বিশেষ প্রার্থনা অভিবাসী সবার জীবনে উদ্বেগ ও দুর্ভাবনা দূর হয়ে স্বস্তি নেমে আসুক। ১৮ শতকে ফরাসি বিপ্লবে ে াগান উঠেছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার। সাধারণ মানুষ আজও সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পায়নি। চারশ বছর ধরে সেই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে চলেছে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শ্রেণি-গোষ্ঠী। পরবর্তীকালেও এই ে াগানকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে কত সংস্কার ও রেনেসাঁ সংঘটিত হয়েছে। দেশে দেশে উড়েছে স্বাধীনতার পতাকা। কিন্তু যাদের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে এসব অর্জিত হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেই শ্রেণির জীবনে মুক্তি আসেনি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোনো মুক্তিই দেখেনি জনগণ নামের সাধারণ মানুষ। ২০১৮ সালে সেই মুক্তির প্রার্থনায় উচ্চকিত হয়ে উঠুক চারধার। আর আমেরিকায় আমাদের অভিবাসী সমাজের প্রার্থনা হোক, যেন সবাই যার যার অগ্রসরমানতা বজায় রেখে মূলধারায় আরো বেশি বেশি যুক্ত হয়ে এ দেশের রাজনীতি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখে যেতে পারি। পাশাপাশি নিজস্ব শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে রক্ষা করে চলতে সক্ষম হই। ২০১৮ সাল সবার স্বপ্নপূরণের বছর হোক। সবার প্রত্যাশার ঝুলি ভরিয়ে দিক। ঠিকানার পক্ষ থেকে সবার জন্য ২০১৮ সালের প্রগাঢ় শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।