ইন্স্যুরেন্স ও ফাইন্যান্সিয়াল পেশায় স্বচ্ছতা জরুরি : মিজানুর রহমান

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ডে ব্লু ওশেন ওয়েলথ সলিউশনস অ্যান্ড অফিস অব মাস মিউচুয়ালের টপ টেন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজরদের একজন বাংলাদেশি মিজানুর রহমান। আজকের এই পর্যায়ে আসতে ও সফল হতে তাকে অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। শুনতে হয়েছে অনেকের কাছ থেকে কটূক্তি। কেউ কেউ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু অন্যের সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেন নিজ লক্ষ্যপানে। নিজের নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও মেধা কাজে লাগিয়ে অর্জন করেন সফলতা।

বাংলাদেশি প্রফেশনালসহ এখন তার ক্লায়েন্টের সংখ্যা সহস্রাধিক। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করার পরও নিজের ক্যারিয়ার গড়া সম্পর্কে ছিলেন ধোঁয়াশার মধ্যেই। চাকরি নাকি ব্যবসা-কোনটা বেছে নেবেন, স্থির করতে পারছিলেন না। এমন দোদুল্যমানতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ১৯৯৫ সালে নিউইয়র্কে ইন্স্যুরেন্স ও ফাইন্যান্স অ্যাডভাইজর হিসেবে তার পথচলা শুরু।

শুরুতে অনেক কাঠখড় পোড়ালেও স্থির লক্ষ্য, অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা আর অধ্যবসায়ের কারণে অতি অল্প সময়েই তিনি পৌঁছাতে সক্ষম হন সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। ইন্স্যুরেন্স পেশাকে নেশা হিসেবে নেওয়া মিজানুর রহমান তার জীবনের সাফল্যগাথার গল্প শুনিয়েছেন ২৩ মার্চ সন্ধ্যায়। ঠিকানাকে বলেছেন কোন মন্ত্রবলে নিউইয়র্কের মতো বৈচিত্র্যময় নগরে ইন্স্যুরেন্স ও ফাইন্যান্স রিলেটেড পেশায় নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, যে মন্ত্র রপ্ত করে এ পেশায় আগ্রহীরাও পেতে পারেন সফলতার সঠিক নিশানা। ইন্স্যুরেন্সসহ নানা বিষয় নিয়ে মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসা চুম্বক অংশটুকু ঠিকানার পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।

মিজানুর রহমান বলেন, একজন মানুষের জীবনে সাফল্য আসা অনেক কঠিন। সাফল্য আসার জন্য সময় দিতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। শুরুতেই যে সব সময় সবকিছু মনের মতো হবে, বিষয়টি তেমন নয়। অনেক সময় মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও মানুষকে টিকে থাকার জন্য অড জব করতে হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে মাস্টার্স করে এখানে আসার পর এমবিএ করার পরও ভালো চাকরি মেলেনি। এ জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কয়েক মাস। কাজ করতে হয়েছে গিফট শপে। সেখানেও যে কাজটা খুব সহজ ছিল, তা নয়। আমাকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে কখন একটা ভালো জব পাব। তবে একটি মুহূর্তের জন্যও আমি হাল ছাড়িনি।

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও ফাইন্যান্স অ্যাডভাইজর মিজানুর এম রহমান ক্লায়েন্টদের কাছে প্রিয় মিজান ভাই বলেই পরিচিত। তিনি মানুষকে লাইফটাইম সার্ভিস দেন। কাজ করছেন ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানার, ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এক্সিকিউটিভ, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর, রেজিস্ট্রার্ড রিপ্রেজেন্টেটিভ, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজর রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে। অনার রোল কোয়ালিফাইং অ্যান্ড লাইফ মেম্বার অব মিলিয়ন ডলার রাউন্ড টেবিল (এমডি আরটি) ১৮ বছর, মেম্বার, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর (এনএআইএফএ), ন্যাশনাল কোয়ালিটি অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্ট ক্লায়েন্ট সার্ভিস (ফরম এনএআইএফএ) ১৯৯৭ থেকে। তিনি কাজ করেন ব্লু ওশেন ওয়েলথ সলিউশনস এন অফিস অব মাস মিউচুয়ালের ব্যানারে। ব্যবসার জন্য ব্র্যান্ডিং করেন সব সময়।

বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন ও অন্যান্য সংগঠনের বিভিন্ন ইভেন্টের জন্য স্পনসর হিসেবে বছরে ব্যয় করেন ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার ডলার। এতে একদিকে তার যেমন সমাজসেবার কাজটি হয়, অন্যদিকে বিভিন্ন কমিউনিটি সার্ভিস করা হয়। এর বাইরেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হয়।

মিজানুর রহমান আরো বলেন, আমরা যে কাজ করি তা অনেকের কাছে মনে হয় অপ্রয়োজনীয়। কারণ আমাদের দেশ থেকে যারা এখানে আসেন, তাদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্টসহ বেশ কয়েকটি পেশার মানুষের মধ্যে যারা পরিকল্পিতভাবে চলেন তারা ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান করেন। কিন্তু অন্য পেশার মানুষেরা খুব একটা করেন না। এ কারণে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক কষ্ট করতে হয়। এটা সবার জীবনে করা জরুরি। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করি, তারা প্রায় সবাই মিলিয়নিয়ার। তাদের প্ল্যানিংও করতে হয় অনেক ভেবেচিন্তে। কিন্তু কেবল মিলিয়নিয়াররাই ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান করতে পারেন, এটা ঠিক নয়।
একজন যদি মনে করেন তিনি ১০ ডলার কিংবা ১০ টাকা ইনকাম করেন। কিন্তু আয় কম বলে তিনি সেভ করতে পারেন না এটা ঠিক নয়, যদি ১০ ডলার/১০ টাকা আয় করেন, তাকেও ঠিক করতে হবে যে তিনি এর মধ্য থেকে দুই ডলার কিংবা দুই টাকা সেভ করবেন, যাতে আগামী দিনে তার কোনো সমস্যা না হয়।

মিজানুর রহমান বলে যান, ইন্স্যুরেন্স করাটাকে অনেকেই মনে করেন এর বোধ হয় প্রয়োজন নেই। আসলে এটা খুব জরুরি। ইন্স্যুরেন্স করলে ভবিষ্যৎ জীবনে কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। শুধু এটাই মনে রাখতে হবে, যখন ইন্স্যুরেন্সটা করছেন তখন সব তথ্য সত্য দিতে হবে। জেনে-বুঝে প্ল্যান নিতে হবে। যিনি ইন্সুরেন্স করিয়ে দিচ্ছেন তার কথায় যেন কোনো ফাঁক না থাকে, সেটাও নিশ্চিত হতে হবে। ইন্স্যুরেন্স ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর হিসেবে কাজ করতে হলে স্বচ্ছতা অবশ্যই জরুরি।

মিজানুর রহমান বলেন, আমি সব সময় বিশ্বাস করি, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে সেই কাজের ফল ভালো হবে। অনেক সময় অনেক ব্রোকার সাময়িকভাবে বেনিফিটের জন্য অনেক কথা বলে থাকেন। পরে গিয়ে এগুলো সমস্যা হয়। তাই একজন ব্রোকারের উচিত হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করা। ক্লায়েন্ট পাওয়ার জন্য কোনো ধরনের কথা বানিয়ে না বলা।

মিজানুর রহমান তার আমেরিকায় আসার প্রথম গল্পটা বলেন এভাবে, আমি আমেরিকায় আসব লেখাপড়ার জন্য। এটা বিয়ের আগের কথা বলছি। অনেক সময় অনেকেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য এখানে আসত। আমিও চিন্তা করেছি আসব। ওই সময়ে এফ ওয়ান ভিসা নিয়ে এই দেশে আসি ১৯৯৩ সালের আগস্ট সেশনে। ভর্তি হই ব্লুমবার্গ ইউনিভার্সিটিতে। এমবিএ করি সেখান থেকে। এমবিএ করার পর পরই ফাইন্যান্স রিলেটেড জব মেলেনি। কী করব ভাবছিলাম। চাকরি পেতে দেরি হওয়ায় ঢুকে গেলাম একটা গিফট শপের দোকানে। সেখানে যা আয় করতাম তাতে চলছিল ভালোই। মনে মনে এটাই ছিল যে কত দ্রুত চাকরি মিলবে। তিনি বাংলাদেশে তার কথা বলতে গিয়ে বলেন, তার জন্ম যশোরে। দাদা-নানার বাড়ি চাঁদপুরে। স্কুল ছিল সূত্রাপুরে কবি নজরুল কলেজ। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফাইন্যান্সে অনার্স ও মাস্টার্স। পড়ালেখা শেষ করে ১৯৮৮ সালে কেয়ারে যোগ দিই। প্রথমে পোস্টিং ছিল টাঙ্গাইলে। এরপর মির্জাপুর, পরে বরিশাল, সর্বশেষ টাঙ্গাইলে।

১৯৯৩ সালে পেনসিলভানিয়াতে ব্লুমবার্গ ক্যাম্পাসে পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। দেশে থেকে মাস্টার্স করার কারণে অনেক ক্রেডিট ছিল। এ কারণে মাত্র চার সেমিস্টারে এমবিএ সম্পন্ন করি। ১৯৯৪ সালে শেষ করি লেখাপড়া। ১৯৯৫ সালে নিউইয়র্কে চলে আসি।

পেশাগত জীবনের শুরুর কথা বলতে গিয়ে বলেন, এ দেশে পড়তে এলেও তখন কোনো ধারণা ছিল না কী কাজ করব। আট মাস চলে গেল, কিছুই হচ্ছিল না। তখন আমি একটি অফিসে কাজের জন্য অ্যাপ্লিকেশন দিই। সেখানে ২ জন নারী ও ২ জন পুরুষ ছিলাম। এর মধ্যে আমি ও আরেকজন টিকে গেলাম। আমার তখনো ইমিগ্রেশন হয়নি। চাকরিতে নিতে গেলে পে-রোলে আমাকে তাদের স্পনসর করতে হবে। কিন্তু তারা আমাকে স্পনসর করতে পারবে না। ওই সময়ে এ নিয়ে ওই সুপারভাইজারের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। পরে তিনি আমাকে বলেন, তোমাকে কর্তৃপক্ষ চাকরিতে নিতে পারছে না। তবে আমার এক বন্ধু আছে, তাদের কোম্পানি আছে, সেখানে গেলে তোমার চাকরি হতে পারে। এর মধ্যে যে চারটি আমেরিকান কোম্পানির নাম দিয়েছে, তার মধ্যে মেট লাইফের নাম ছিল। সেখানে দিনেশ সাকসেনা নামের একজনের নাম দিয়ে বললেন তার সঙ্গে দেখা করতে। ভারতীয় এক সুপারভাইজার আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। চাকরিটাও হয়ে গেল।

প্রথম কাস্টমার পাওয়ার বিষয়ে বলেন, আমি যখন গিফট শপে কাজ করতাম, তখন আমার ওখানে আসতেন একজন বিদেশি ডেনটিস্টের স্ত্রী। আলাপ-পরিচয় হওয়ার পর তার নম্বরটি আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তাকে ফোন করার পর তিনি আমাকে বললেন তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে। ১৯৯৬ সালে তখন তারাই আমার প্রথম ক্লায়েন্ট। আমি এরপর থেকে ডাক্তারদের সঙ্গে বেশি কাজ করি। বাকিরা অন্য প্রফেশনের। নিউজার্সিতে একটি ফেয়ার হয়। এতে আমি জয়েন করার সিদ্ধান্ত নিই। সে অনুযায়ী যোগও দিই। সেখানেও কিছু ক্লায়েন্ট পাই।

১৯৯৭ সালে সাপ্তাহিক ঠিকানাও আমার জীবনের মোড় ঘোরাতে অনেক বড় অবদান রেখেছে। ওই সময় ঠিকানায় আমি একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম যে একটি হেলথ ফেয়ার হবে। ওখানে বিভিন্ন ডাক্তার যোগ দেবেন। চিন্তা করলাম ওখানে অনুষ্ঠানের স্পনসর করলে ভালো হয়। সবাই আমাকে চিনবে। আয়োজকদের ফোন করি। ফোন করার পর স্পনসর করতে চাইলাম। তারা খুশি হলেন। কারণ স্বেচ্ছায় ফোন করে কেউ স্পনসর হতে চাইছে, এটা তাদের কাছে কিছুটা অবাকও লাগল। আমি সেখানে স্পনসর হলাম। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর অনেক প্রফেশনালের সঙ্গে পরিচিত হলাম। বাংলাদেশ সোসাইটির নেতারাও ছিলেন। বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। আমি প্রেজেন্টেশন দিলাম। ওই সময়ে ডেন্টিস্ট, ফার্মাসিস্ট পেলাম। আসলে রেফারেন্সটা অনেক বড় ব্যাপার। আমি অনুষ্ঠানের স্পনসর হওয়ায় তারা আমাকে বেশ সাদরেই গ্রহণ করলেন।

মিজানুর রহমান আরো বলেন, ব্যবসায় পরিচয়টা কীভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, এটি একটি বড় ব্যাপার। আসলে রেফারেন্স যেমন একটি বড় বিষয়, তেমনি আচার-ব্যবহার ও ম্যানার বড় বিষয়। যে যত ভালোভাবে তার উদ্দেশ্যটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে, তার জন্য সুবিধা তত বেশি। তিনি বলেন, আমি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কমিউনিটি বেইজড সংগঠনের সঙ্গে ওইভাবে জড়িত নই। তবে অনেক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, যেগুলোর মাধ্যমে আমি সামাজিক কাজ করি। বাংলাদেশ ও এশিয়ার শিল্পসাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরি। আমি বেশি করি প্রফেশনালস সংগঠন।

কালচারাল সিটি আমাদের লং আইল্যান্ড। এখানে আমরা বাংলাদেশ নাইট করি। এশিয়ান নাইট করি। হোপ ফাউন্ডেশন করি। প্রায় ২০টি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত আছি। আমি বইমেলা, বিজয় মেলা পছন্দ করি। আবার ইন্ডিয়ান বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ক্লায়েন্ট পাওয়া সহজ হয়েছে। তিনি একটি হিসাব দিতে গিয়ে বলেন, আমাদের বাংলাদেশি ডাক্তার নিউইয়র্কে ২ হাজার, ভারতের ১০ হাজার আর পাকিস্তানের ১২ হাজার। এ কারণে আমাকে তিন দেশেরই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। বিজনেসে আমার টার্গেট তারা। কেবল ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানারের কাজ নয়, হাসপাতালে লেকচার দিতে হয়। সেখানে প্রথম যারা ডাক্তারি পাস করে যোগ দেন, তাদের নিয়ে তিন থেকে পাঁচ বছর কাজ করতে হয়।

মিজান বলেন, ৪৫টি স্টেটে আমার এক হাজারের বেশি ক্লায়েন্ট রয়েছে। আমার টেলিফোনে ছয় হাজার নম্বর আছে। অনেককে ক্লায়েন্ট না হলেও পরামর্শ দিতে হয়। তিনি তার ক্লায়েন্টদের সম্পর্কে বলেন, আমি যে ধরনেরই সেবা দিই, এর মধ্যে আগামী দিনের সব ধরনেরই নিশ্চয়তা রয়েছে বলা যায়। আমাদের দেশের কিছু পরিবার আছে, তারা খুব ভালো আছে। যারা সহায়তা চান তাদের বয়স ৫০-৬০-এর মধ্যে। যদিও বর্তমানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে। তারা সহায়তা চান। বলেন, পুরো জীবনের সবকিছু মিলিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল পরিকল্পনা করবেন। বাড়ি কিনবে, কীভাবে মেনটেইন করবে, কোথায় থাকবে, গাড়ি কিনবে, ফুডের ব্যবস্থা কী হবে, চিকিৎসা সার্ভিস ও বেনিফিট কীভাবে উন্নতমানের ও ভালো পাবে, হাই ইনকাম রয়েছে, এরপরও চিন্তা করে কীভাবে সেভ করতে পারেন। তাদের ট্যাক্স প্ল্যান করি। অনেক সিপিএ আছেন, তারা কেবল ক্লায়েন্ট কত ট্যাক্স রিটার্ন পাবে, সেটা করেন। কিন্তু আমরা কত রিটার্ন পাবে সেটার চেয়ে এ ট্যাক্স প্ল্যান এমনভাবে করি, যাতে ট্যাক্স আইনানুগভাবে করা যায়।

মিজানুর রহমান আরো বলেন, আমাদের দেশের অনেক মানুষের ধারণা স্বামী-স্ত্রী বুড়ো হয়ে গেলে একজন আরেকজনকে দেখবেন। কিন্তু কোনো কারণে একজন মারা গেলে পরে যে একজন অন্যজনকে দেখতে পারবেন না, ওই সময়ের কথা চিন্তা করেন না। ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান থাকলে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত ঘটনা থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, মানুষের তারুণ্যের বয়সটি চিন্তা না করলেও দেখা যায় একভাবে কেটে যায়। শিশু ও বৃদ্ধ বয়সটাকে চিন্তা করতে হয়।

একটি শিশুর যখন জন্ম হয়, সে তার কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে। আবার বুড়ো হয়ে গেলেও মানুষ অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যতক্ষণ একজন মানুষ ছয়টি কাজ ঠিকমতো করতে পারে, তখন তার জন্য কোনো কিছু সমস্যা নয়। এর মধ্যে রয়েছে সকালবেলা ঘুম থেকে নিজে নিজে বিছানা ছেড়ে ওঠা। নিজে নিজে গোসল করা। বাথরুম করা, নিজের পোশাক নিজে পরা, খাওয়াদাওয়া নিজে করা, ট্রান্সফার করা মানে নিজে নিজে উঠে কিছু করতে পারা। এছাড়া সব শেষ হলে নিজে নিজের কেয়ারিং করা।

তিনি বলেন, আমেরিকাতে আমি ব্যবসা করছি ২৩ বছর। অনেক অভিজ্ঞতা মানুষকে দেখে দেখে হয়েছে। মা-বাবা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মাকে ঠিক মতো দেখাশোনা করতে পারে না। কারণ তাদের পরিবার আছে, চাকরিবাকরি আছে। এ জন্য বাবা-মাকে আগেই অবস্থা চিন্তা করে নিজেদের জীবনটাকে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান আমাদের দেশের মানুষের জন্য বেশি দরকার। কারণ আমাদের দেশের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের ব্যবধান প্রায় ১০-১৫ বছর। এ জন্য বেশির ভাগ সময় স্বামী স্ত্রীর আগে মারা যান। তখন স্ত্রীর অনেক কষ্ট হয়। আবার কেউ কেউ স্বামী মারা যাওয়ার এক বছরের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই রকম হলেও কী করতে হবে, সেই রকম প্ল্যানও আমরা দিই।

ব্যবসার সফলতার পেছনকার কথা বলতে গিয়ে মিজান বলেন, ব্যবসায়ীকে আগে নিজে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কারণ স্বচ্ছতা না থাকলে হবে না। কোনো প্ল্যানিং করার আগে ও ইন্স্যুরেন্স করানোর আগে ক্লায়েন্টকে সবকিছু স্বচ্ছভাবে বলতে হবে। স্বচ্ছভাবে কাজ না করলে তখন ব্যাড এক্সপিরিয়েন্স হয়। তার মতে, একজন ইন্স্যুরেন্স প্রফেশনালকে নলেজেবল, বিশ্বাসী ও কেয়ারিং হতে হবে। মানুষ কী চায়, সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, ইন্স্যুরেন্স এই দেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কিছুসংখ্যক স্টুডেন্ট এ বিষয়ে লেখাপড়া করছে। তাদের ভবিষ্যৎ খুব ভালো। ইন্স্যুরেন্সের জন্য যারা ব্রোকার হিসেবে কাজ করে, আমাদের সমাজে তাদের নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। মনে করে দালাল। বিষয়টি সে রকম নয়। একজন আপনাকে সেবা দিচ্ছে, তাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে যিনি এই কাজের সঙ্গে জড়িত, তিনি যদি পার্সোনালিটি ধরে রাখতে না পারেন, সেটা তার জন্য সব দিক থেকেই সমস্যা। এই ব্যবসায় সঠিক কথা, পার্সোনালিটি ধরে রাখতে হবে। কখনোই যেন ক্লায়েন্ট আপনাকে অবিশ্বাস না করেন।

মিজান বলেন, ইন্স্যুরেন্স ও ফাইন্যান্স রিলেটেড পেশাটি ভালো। কারণ বেশি টেনশন করতে হয় না। নিজের মতো করে ছুটি নেওয়া যায়। ঘোরা যায়। এতে কাজের স্বাধীনতা আছে।

মিজান বলেন, দেশে এখনো তেমনভাবে কিছু করার চিন্তা করছি না। ভাইয়েরা দেশে আছেন। তবে দেশের মানুষকে কীভাবে ইন্স্যুরেন্সের বিষয়ে আরও সচেতন করা যায়, ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবছি।

পরিবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী মিরা রহমান কমিউনিটির সার্ভিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। লং আইল্যান্ড সোসাইটির (লিমস) সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন প্রোগ্রামে কাজ করেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে রায়হান রহমান গ্র্যাজুয়েশন করছেন। মেয়ে রুমানা রহমান প্রিমেইড করছেন সেকেন্ড ইয়ার আর ছোট ছেলে রাহাত রহমান হাইস্কুলে পড়ছে।

মিজানুর রহমান জানান, তিনি ট্রাভেল করতে পছন্দ করেন। বই লেখেন। ফাইন্যান্সিয়াল ইমিগ্রেশন নিয়ে লেখেন। তিনি বলেন, তার পেশায় ভালো ভবিষ্যৎ আছে। লাইসেন্স আরও বাড়বে। যদিও ডিপার্টমেন্ট অব লেবার দিনে দিনে লাইসেন্স অনেক কঠিন করে ফেলছে। তবে যারা একাগ্রতা নিয়ে কাজ করবেন তাদের ভবিষ্যৎ ভালো। কারো কারো ধারণা, রিয়েল এস্টেট করে রাতারাতি বড় লোক হওয়া যায়। আমাকে অনেকে সেটা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আমি রাতারাতি ধনী হতে চাইনি। আমি টেম্পোরারি ব্যবসায় আগ্রহী নই। আমি মানুষকে লাইফটাইম সাপোর্ট দিচ্ছি। আগামী দিনেও দিয়ে যেতে চাই।

মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী সব সময় সেবা দিতে না পারলে খারাপ লাগে। মনে রাখতে হবে, বেশি প্রত্যাশা করা যাবে না। সবকিছুর একটা সীমা আছে। চেষ্টা করি, যাতে ক্লায়েন্টকে সর্বোচ্চ সেবাটা দেওয়া যায়।