ইলেকশন জার্নিতে বাংলাদেশ : খালেদা অনিশ্চিত

রহস্যময় ভূমিকায় কূটনীতিকরা

বিশেষ প্রতিনিধি : সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে প্রার্থী হতে দেবে না, তা নিশ্চিত হয়েই নির্বাচনী জার্নিতে চেপেছে তার দল। সরকারের সেই ইচ্ছার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের একদিন আগে ২৭ নভেম্বর। হাইকোর্টের অভিমতে বলা হয়েছে, বিচারিক আদালতে দুই বছরের বেশি দ- হলে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে কূটনীতিকদের ভূমিকা রহস্যময় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আদালতের এমন অভিমতের পর একটুও দেরি করেননি অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলে দিয়েছেন, এর ফলে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের কেউই নির্বাচন করতে পারবেন না। কিন্তু মহীউদ্দীন খান আলমগীর, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন কীভাবে দণ্ডিত হওয়ার পরও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন-এ প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে কেটে পড়েন তিনি।
বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ রাজনৈতিক সব মহলের কাছেই খালেদা জিয়া প্রশ্নে সরকারের মতিগতি পরিষ্কার। এর পরও বিএনপির নির্বাচনে কামড় দিয়ে লেগে থাকার উদ্দেশ্যও অপরিষ্কার নয়। এর আগে ২৬ নভেম্বর সোমবার থেকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া শুরু হয়। তিনটি আসনে বেগম খালেদা জিয়াকে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমেই সূচনা হয় দলটির মনোনয়ন কার্যক্রম। বিএনপির এবার নির্বাচনে লেগে থাকা নির্বাচনে থাকার জন্য? নাকি না থাকার জন্য? না নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে। সরকারের শীর্ষ মহলও প্রশ্নবিদ্ধ। এ প্রশ্নে সরকারকে একটা ঘোরের মধ্যে ফেলেছে বিএনপি। অনেক দিন নীরব থাকার পর কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের হঠাৎ প্রকাশ্য তৎপরতাও সরকারের জন্য উদ্বেগের।
আওয়ামী লীগের সাবেক তিন নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, গোলাম মাওলা রনি এবং প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়ার ধানের শীষ প্রতীকের জন্য উতলা হয়ে দল বদলানোর পেছনেও রহস্য লুকানো। কয়েকজন কূটনীতিক পেছন থেকে এসবের কলকাঠি নাড়ছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে সরকারের শীর্ষ মহল।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনোনয়নবঞ্চিতদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে মনোনয়নবঞ্চিতদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। বিএনপি এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে নির্বাচন বানচালের ফাঁদ পাততে পারে বলে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র থেকে। বলা হয়েছে, এ আয়োজনের পেছনে বিশেষ কয়েকজন কূটনীতিকের যোগসাজশ রয়েছে। যারা ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ। মাঝেমধ্যে বৈঠকও করছেন উল্লিখিত দুজনের সঙ্গে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা এ তৎপরতায় অনেকটা প্রকাশ্য ভূমিকায়। নির্বাচন নিয়ে তাদের আলাদা কোনো ভাবনা রয়েছে কি না, তা মোটা দাগের প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত এ প্রশ্নের ফয়সালা হওয়ার মতো নয়।
এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তিনটি আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলেও তার নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনিশ্চিত। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত পক্ষে এলেও খালেদা জিয়া প্রার্থী হতে পারছেন না। আপিল বিভাগে তার আপিল আবেদন শুনানির তারিখ ৯ ডিসেম্বর। তাই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৮ নভেম্বর খালেদা জিয়া নির্বাচনের সুযোগই পাচ্ছেন না। অন্যদিকে দণ্ডিত হয়ে মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কী করে নির্বাচন করলেন সে উত্তর নেই অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্ট বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের দণ্ড দিয়েছেন। আপিল করা হলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেন। এই রায়ের বিপক্ষে বেগম খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। বিএনপি ঘরানার কয়েজন আইনজীবী মনে করেন, আপিল বিভাগ যেখানে হাইকোর্টের শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ বছর করেছেন, রিভিউ আবেদনে পূর্ববর্তী রায় খারিজ করে খালেদা জিয়াকে খালাস দেওয়া হবে এমন আশা করার আইনগত ভিত্তি নেই। তবে সর্বোচ্চ আদালতে রিভিউ আবেদন গৃহীত হলেও বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সর্বশেষ সময়ের পর আপিল বিভাগের রায় হবে বলে খালেদা জিয়া সে সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি না হলেও আদালত তাকে জামিন দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত অবস্থায়ই নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে নাশকতা, ধ্বংসযজ্ঞ, নিরীহ মানুষ হত্যা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে, নারায়ণগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল ছুড়ে নিরীহ যাত্রী হত্যা মামলাসহ পাঁচটি মামলার হুকুমের আসামি তিনি। আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে এসব মামলায়ও জামিন নিতে হবে। নিম্ন আদালত হয়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভও সময়সাপেক্ষ।
আপিল বিভাগে বেগম খালেদা জিয়ার রিভিউ পিটিশন উঠবে ৯ ডিসেম্বর। শুনানি শেষে নিষ্পত্তিতে কয়েক দিন লাগতে পারে। চার-পাঁচটি নাশকতার মামলায়ও জামিন নিতে হবে। নিম্ন আদালত থেকে জামিন দেওয়া হলেও রাষ্ট্রপক্ষ উচ্চতর আদালতে যাবে। স্বল্প সময়ে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার মুক্ত জীবনে আসার পথ হচ্ছে প্যরোলো মুক্তি। একমাত্র অধিকতর উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার কর্তৃক সে ব্যবস্থা করার বিধান রয়েছে। সেক্ষেত্রেও খালেদা জিয়াকে দেশে অথবা বিদেশে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হবে। মানবিক বিবেচনায় সরকারের উচ্চতর মহল নির্বাচনের পর তাকে প্যারোলো মুক্তি দেওয়ার বিষয় বিবেচনায় রেখেছে বলে জানা যায়।