ইসলামকে দাবিয়ে রাখার নেপথ্যে

বলা হয় পৃথিবী ইসলামের শত্রুতে ভরা। আসলে তাদের সংখ্যা বেশি নয়, তবে তারা ক্ষমতা দখল করে আছে। ইসলাম মানে আল্লাহর নির্দেশিত শান্তির পথ। ইসলামে বিশ্বাসীরা মুসলমান। তারপর গোটা বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানের উপর আক্রমণ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ব ব্র্যান্ডের স্রষ্টা এবং প্রতিপালক মহান আল্লাহ পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাসের একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিয়েছেন। এই গাইডবুকের নাম আল কুরআন। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করে চললে পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাস করা যাবে এবং পরকালেও পুরস্কার পাওয়া যাবে। অবশ্য অনেকে পরকাল বিশ্বাস করে না। অবশ্য পবিত্র কুরানের সংস্পর্শে আসার পর অনেক অবিশ্বাসীরও ধর্মান্তরিত হওয়া অসংখ্য নজির রয়েছে। কারণ পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহর অমর এবং অক্ষয় বাণী।
সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এই গাইডবুক শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, তা সমগ্র মানবজাতির কিতাব। কিন্তু অনেকে জীবনে একদিনও তা খুলে দেখে না। পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অজ্ঞতা বশেই তারা কুরআনকে এড়িয়ে চলে। তাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাসের জন্য রাজনীতিই যথেষ্ট। অর্থাৎ দুনিয়ায় শান্তির জন্য সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন পরিপূর্ণ সংবিধান আল কুরআন, আর দেশে দেশে জ্ঞানীরা শান্তির জন্য রচনা করেছেন রাষ্ট্রীয় সংবিধান। রাষ্ট্রীয় সংবিধানের কোন কোন নীতি সরাসরি আল্লাহ প্রদত্ত সংবিধান, আল কুরআনের বাণীর পরিপন্থী।
প্রচলিত রাজনীতি মানুষকে ভাগ করেছে দু ভাগে- শোষক আর শোষিত। আর শোষণের হাতিয়ার হচ্ছে শোষিত শ্রেণির লোক। শোষিতরাই শোষকদের শোষণের শক্তি যোগায়। শোষকের আছে কুবুদ্ধি ও অর্থ, আর শোষিতের আছে মগজহীন মাথা। আসলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৯০% ই বোকা। তারা অন্যের ক্রীড়ানক হিসেবে কাজ করে। উদাহরণ স্বরূপ, সরকার বললো মার্সিডিজ গাড়ি আমদানি করলে ট্যাক্স দিতে হবেনা। আর সিএনজি আমদানি করলে ২০০% হারে ট্যাক্স দিতে হবে। এক্ষেত্রে ৯৫% আমজনতার ইহজন্মেও মার্সিডিজ কেনার সামর্থ হবেনা। তাই মার্সিডিজের উপর ট্যাক্স বাড়ানো এবং সিএনটির উপর ট্যাক্স মওকুফের দাবিতে আমরা কঠোর আন্দোলন গড়ে তুললাম। পরে র‌্যাব, পুলিশ আর বিডিআর এসে আমাদের আন্দোলন স্তিমিত করে দিল। আমরা হার মানলাম। র‌্যাব, পুলিশ আর বিডিআর কিন্তু শোষিত শ্রেণির লোক, অর্থাৎ আমাদের লোক। তারাই মেরে আমাদের ৯০% লোকের আন্দোলন ব্যর্থ করে দিল।
পৃথিবীতে অধিকাংশ শাসকই শোষক। তারা একদিকে দেশবাসীকে শোষণ করে, অন্যদিকে অন্য দেশের শোষকের সাথেও সুসম্পর্ক রাখে। নিজে শক্তিশালী হলে অন্য দেশেও ভাগ বসায়। সেই ভাগের সিংহভাগই সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ভোগ করে। আর নিজে অন্য রাষ্ট্র্রের শোষকের চেয়ে দুর্বল হলে সবল শোষকের সাহায্য নিয়ে নিজের ভিত্তি মজবুত রাখে এবং দেশের জনগণের উপর শোষণের স্টীম রোলার চাপায়।
প্রশ্ন জাগে চৌদ্দশ বছরেও পবিত্র কুরআনের দাওয়াত সমগ্র মানবজাতির কাছে কেন পৌঁছেনি ? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মানবজাতিকে অনেক কিছু করতে আবার অনেক কিছু না করতেও নির্দেশ দিয়েছেন। তা সত্তে¡ও মুসলিম বা অমুসলিম শাসকদের অনেকেই আল্লাহর ইচ্ছার পরিপন্থী অনেক কাজ করে যাচ্ছেন। পবিত্র কুরআনে অন্যের সম্পদ লুন্ঠন, অনেক হক আত্মসাত, জুলুম, নির্যাতন, চুরি ডাকাতি ঘুষ সুদ ইত্যাদিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ শোষক শাসকরা নিষিদ্ধ কর্মকান্ডই চালিয়ে যাচ্ছে পুরোদমে। আল্লার আদেশ অমান্যে তারা অনেকটা ঐক্যবদ্ধ। অন্যদিকে শোষিতেরা ঐক্যবদ্ধ নয়। এই কুরআন শোষিতদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং ব্যক্তিগত অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তুলবে এই আশঙ্কাবশে শোষকরা কুরআন পরিপন্থী প্রচার এবং প্রসারে সর্বদা সোচ্চার। পবিত্র কুরআনের বাণীকে মোল্লাদের কথা, পুরণো কথা, বা মৌলবাদীদের কথা বলে যুক্তি দেখাতে তারা তৎপর।
সকল ধর্মই ইহকাল ও পরকালের শান্তির পথ দেখায়। প্রত্যেক ধর্মের মূল নীতি প্রায় এক এবং তা ভাল। সত্যিকারের ধার্মিক হলে এক ধর্মের মানুষের সাথে অন্য ধর্মের মানুষের দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে না। কোন ধর্মই মন্দ শিক্ষা দেয় না। একজন হিন্দু ভাই আমাকে হিন্দু ধর্মের দাওয়াত দিতেই পারেন। আমারও ধৈর্য ধরে তা শুনা উচিত। তবে যেহেতু ইসলাম ধর্ম সর্বশেষ ধর্ম, আল কুরআন সর্বশেষ কিতাব এবং মুহাম্মদ (স:) সর্বশেষ নবী তাই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উচিত আমাদের কথা বেশি শুনা। কারণ কুরআন আল্লাহর সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা। সামান্য জ্ঞান নিয়ে পবিত্র কুরআন বুঝা যাবেনা। কারণ আরবী ভাষার কারুকার্য খুবই কঠিন। শব্দের বানান এক তবে সুর ভিন্ন হওয়ার কারণেও অর্থের ব্যবধান হয়। পবিত্র কুরআন আল্লাহর বাণী- এটি মনে-প্রাণে স্বীকার করে নিয়েই কুরআন অনুশীলন ও চর্চা করতে হবে।
আমি আমেরিকায় এসে ভাবলাম ইংলিশ পড়ে দক্ষতা আরো বাড়ানো দরকার। ড. ড্যানিয়েল সকোলভের লেখা একটি বই পড়তে শুরু করলাম। সামান্য পড়ে এক জায়গায় দেখি লিখা রয়েছে আই ডোন্ট নু নাথিং। আর পড়তে ইচ্ছে হলো না। একজন ডক্টরেটের বইতে তার অজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পারার পর মনে খটকা লাগল। আমার মতে তার বলা উচিত ছিল: আই ডোন্ট নু অ্যানিথিং অর আই নু নাথিং। কিছু দিন পর বইটিতে পুনরায় চোখ বুলিয়ে দেখলাম তা ভুল ছিলনা। একজন ইমিগ্র্যান্ট যেভাবে বলেছে তিনি তার উক্তিটি তার মতই লিখেছেন। ঠিক তেমনি সামান্য পড়ে পবিত্র কুরআন নিয়ে হিন্দু মুসলিম অনেককে সমালোচনা করতে শুনেছি। তবে এমন কাউকে সমালোচনা করতে দেখিনি যিনি সারা কুরআন মন দিয়ে আন্তরিকতার সাথে পড়েছেন। বরং সমালোচনা করতে গিয়ে কুরআন পড়ে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এমন নজির অনেক আছে।
এমনও ধর্ম আছে যেখানে সকল অনুসারীর সেই ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ার অনুমতি নেই। উঁচু পর্যায়ের ধর্মীয় পন্ডিতরা তা পড়বেন এবং বাকিদের তাঁকে অনুসরণ করতে হবে। ইসলাম ধর্ম সকলকে আল কুরআন পড়তে, বুঝতে এবং ইসলামের দাওয়াত দিতে বারম্বার তাগিদ দিয়েছে। কুরআনের দাওয়াত দিয়ে নেতা হওয়া যায় না। আর্থিক কোন লাভও নেই, যা আছে তা হল নিজের মনের সন্তুষ্টি আর পরকালে পুরস্কার প্রাপ্তির আশা। দাওয়াত বিষয়টা এরকম যে, মনে করুন এক হিন্দু ভাই বিশাল খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করছেন। আমি মুসলমান, তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আপনি কি নিচ্ছেন? তিনি বললেন, এই খনি থেকে স্বর্ণ নিচ্ছি। আমি বললাম স্বর্ন কেন নেবেন? আমি ঐ খনি থেকে প্লাটিনাম নিচ্ছি। আপনি এটা ফেলে ওটা নিয়ে যান। তিনি যদি আমাকে বিশ্বাস করেন এবং প্লাটিনাম চিনে থাকেন, তবে আমার কথা খুশিতে শুনবেন। আর আমাকে বিশ্বাস না করলে বা প্লাটিনাম না চিনলে আমার কথা অগ্রাহ্য করবেন এবং আমাকে সন্দেহের চোখে দেখবেন। পরিতাপের বিষয় পবিত্র কুরআনের দাওয়াত যারা দেন তারা এর বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে কোন প্রতিদান আশা করেন না। তারপরও আমরা তাদেরকে উপহাসের দৃষ্টিতে দেখি। অবশ্য দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বদা মনে রাখতে হবে: দাওয়াত দেয়ার অধিকার আপনার- আমার সকলের রয়েছে। তবে হেদায়েতের মালিক একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
আমি মুসলমান। দুঃখের বিষয় আমি পবিত্র কুরআন পড়ে সবটুকু বুঝিনা। মাদ্রাসার ছাত্রদের আমরা অবহেলার চোখে দেখি। অথচ চোখ থাকতেও তাঁদের কাছে আমি এক অন্ধ। তাঁদের সাথে একত্রে এক জলসায় বসলে আমি বোবা। ছি: আমাকেই আমি ধিক্কার দিচ্ছি।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে জাগতিক, পারলৌকিক, বিশ্ব ব্র্যান্ডের যাবতীয় তত্ত্ব ও তথ্য পুরোপুরি প্রদান করেছেন। এজন্য কুরআনকে বলা হয়: কমপ্লিট কড অব লাইফ বা পরিপূর্ণ জীবনবিধান। পবিত্র কুরআনের মধুর সুর এবং ছন্দ হৃদয়গ্রাহী। কেউ কিছু না বুঝুক, শুধু সুর ও ছন্দে আকৃষ্ট হয়ে অবিশ্বাসীরাও বিশ্বাসী হয়ে যেতে পারে, এমন ব্যবস্থা করে রেখেছেন আল্লাহ।
পেশা এবং ব্যক্তিগত অবস্থানের কথা বিবেচনা না করে পবিত্র কুরআন অনুশীলনে তৎপর হলে নিশ্চিতভাবেই সত্য পথের দিশা মিলবে। কেউ অজু করতে থাকলে তার দিকে তাঁকান। অজুর মাহাত্ম্য অবর্ণীনীয়। অজু করার সময় দৈনিক পাঁচবার নাকে পানি ঢুকিয়ে নাক পরিষ্কার করলে নাকের ভেতর কোন ধরনের ধুলাবালি ময়লা-কাদা থাকতে পারেনা। আবার নামাজের মত বড় ধরনের দ্বিতীয় কোন ব্যায়াম বা শরীরচর্চা জগতে নেই। নামাজ আদায়কালে সালাত আদায়কারীকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে, বাঁকা হতে, সেজদায় অবনত হতে হয়। এসবে শারীরিক কোন ফায়দা আছে কিনা তা কোন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন। এভাবে কুরআনে বর্ণিত প্রত্যেকটি নির্দেশ কোন না কোন ভাবে মানবজাতির জন্য উপকারী। নামাজে দাঁড়িয়ে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি, ধন্যবাদ জানাই, ক্ষমা চাই, ভাল কাজ করার এবং মন্দ কাজ না করার ওয়াদা করি। বলতে লজ্জাবোধ করছি যে- এ নামাজ আমরা ভিন্ন জনে ভিন্ন কারণে পড়ে থাকি। একদল পড়ি লোক দেখানোর জন্য, লোকে
আমাকে সম্মান ও বিশ্বাস করবে তাই। আরেক দল করি অভ্যাসের কারণে। ছোটবেলা থেকে করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে। লোকেও সম্মান করে তাই। এই দুই দলের জন্য পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি । আরেক দল রয়েছেন যারা শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেন। এই দলের ইহকাল ও পরকাল হবে শান্তিময়। এরাই খাঁটি মুসলমান। প্রথম দু দল মুনাফেক।
পবিত্র কুরআনের কয়েকটি নির্দেশ নিম্নে প্রদত্ত হল: আল্লাহ এক তাঁর কেউ শরিক নেই, হযরত মুহম্মদ (স:) আল্লাহ প্রেরিত শেষ রাসুল। অন্যান্য নবী-রাসূল, কিতাবসমূহ, ফেরেস্তাগণ, পবিত্র কুরআন, বেহেস্ত দোযখ ও শেষ বিচারের দিন ইত্যাদির উপর পূর্ণ ঈমান আনতে বলা হয়েছে এবং রোজা রাখতে বলা হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় সময় মত আদায় করতে হবে। মিথ্যা বলা যাবেনা, নারীদের পর্দা করতে হবে, আর্থিক অবস্থা ভাল হলে হজ্জ ও কুরবানী আদায় করতে হবে। বিত্তশালী মুসলমানদের নিজের অর্থের একটা অংশ গরীবদের দান করতে হবে। মানুষ হত্যা না করা, মদ পান না করা, মাদক সেবন না করা, জেনা না করা, হক বিচার করা, নারী পুরুষের অবাধে মেলামেশা না করা, অশ্লীলতা না ছড়ানো, আমানতের খেয়ানত না করা, অপচয় না করা, মাপে কম না দেয়া, অধিক মুনাফা না করা, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশীকে সাহায্য করা, অন্যকে হিংসা না করা, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভূখাদের খাবার দেয়া, অন্যের সম্পদ গায়েব না করা, একে অপরকে সম্মান করা, পিতামাতা ও গুরুজনকে মান্য করা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ না করা, সর্বক্ষন আল্লার সন্তোষ্টি আদায় করা, বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করা, মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত থাকা ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনে শাসকদের বলা হয়েছে তোমরা আমার প্রতিনিধি। তোমরা আমার নির্দেশ কার্যকর করবে। কিন্তু শাসকগণ আল্লার মন জয় না করে, ক্ষমতা ভোগ করার জন্য জনগণের মন জয় করতে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অনেক পাপ কাজে নাগরিককে সুযোগ করে দেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন, আমিন।
-নিউ ইয়র্ক।