ঈদুল ফিতর ও আমাদের করণীয়

এবিএম সালেহ উদ্দীন :

পবিত্র ঈদুল ফিতর সমাগত। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সাওয়াল মাসের এক ফালি নতুন চাঁদ উদয়ের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর ফিরে আসে ঈদুল ফিতর। মুসলমানদের দু’টি ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতরই হচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঈদ উৎসব। কারণ পবিত্র রমজান মাসের সিয়ামের যে প্রকৃত শিক্ষা তা দীর্ঘ একমাস কঠোর কৃচ্ছ্রতার মাধ্যমে রোজাদারদের দ্বারা প্রতিফলিত হয়। একজন প্রকৃত রোজাদার পুরো মাস আল্লাহর বিধানের নিয়মগুলো মেনে সিয়ামের পূণ্যত্ব অর্জন করবার জন্য ব্যাকুল থাকেন।

প্রকৃত পক্ষে যারা রোজার সকল নিয়ম মেনে সিয়ামের প্রকৃত শিক্ষায় পূণ্য অর্জন করেন, তারা মহান আল্লাহর ভয়ে এবং একমাত্র তারই সন্তুষ্টির জন্য সর্বাত্মকভাবে আল্লারই সমীপে নিজেকে সোপর্দ করেন। অসহায় দুঃখী মানুষের জন্য সাদকায়ে ফিতর এবং জাকাত আদায় করেন। মানবীয় গুণের সর্বোত্তম কাজগুলো করার চেষ্টা করেন। মূলত: মহান আল্লাহর করুণা ও প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশায় ঈদ আনন্দে সম্মিলিতভাতে অংশগ্রহণ করেন। আনন্দ উৎসব ও খুশির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির পথকে প্রসারিত করে তোলেন। তাদের জন্যই মূলত: ঈদ। ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সকল পর্যায়ে মানুষের মাঝে সাম্য-মৈত্রী, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বমূলক মানবতাবোধ জাগ্রত হয় ঈদুল ফিতর উদ্যাপনের মাধ্যমে।

রোজা পালন এবং যাবতীয় ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’লার করুণা, রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের প্রত্যাশা করেন। রোজার মাধ্যমে হৃদয়-মন ও আত্মার পরিশুদ্ধির চেষ্টা করেন। মনন ও চেতনার মধ্য দিয়ে আত্মোপলব্ধি ঘটান। যাতে করে দুঃখী-দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়। নিরন্ন ও অসহায় মানুষ যেন তাদের পুরো অধিকার বিত্তবান ও সমর্থবানের নিকট থেকে পান। ঈদুল ফিতরের দিন ধনী-গরিব, ফকির-মিসকিন সবাই কাধে কাধ মিলিয়ে আনন্দ উৎসব পালন করতে পারাটাই মূলত: ঈদুল ফিতরের প্রকৃত শিক্ষা। এই প্রসঙ্গে
আমাদের চেতনা কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই চিরায়ত গানের আহ্বান-
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানি তাগিদ”।

আমাদের জাতীয় চেতনায় এই চিরন্তন গানটির মর্মই হলো সিয়াম শেষে ঈদুল ফিতরের শিক্ষা।
ঈদের সময় এ গানটির সুর-ধ্বনিতে সকল মিডিয়াসহ সর্বত্র ঝলসে ওঠে। নিজের অহংকার ও অহংবোধ ঝেড়ে ফেলে দুস্থ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা, সকল ভেদাভেদ ভুলে মানুষের মাঝে লীন হয়ে যাওয়া, আমাদের আচার-আচরণ এবং সামাজিক নীতির মূলেই তো হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ ও মানুষের স্বার্থে এগিয়ে আসা। একই রক্তধারার সব মানুষকে সন্মান দেয়া। মানুষকে অবজ্ঞা ও অবহেলা না করা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, সেটি বর্তমান বিশ্বে নেই। আমাদের সামাজিক নীতিতে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
ঈদুল ফিতরের শিক্ষা হচ্ছে মানুষের ভেতরকার বৈষম্য দূর করে সাম্য-মৈত্রীর নীতিতে মানুষের মাঝে সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা। সেটি বর্তমানে মানব সমাজে অনুপস্থিত। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, মানবতাই হচ্ছে মানুষের মনুষ্যত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মনুষ্যত্বহীন জীবন মূলত: পশুত্বেরই নামান্তর।
মহানবী (স.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে মানবতা আছে এবং যার দ্বারা মানুষ উকৃত হয় সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ।’
এই ক্ষেত্রে বেটাম্যানের উক্তি হচ্ছে- ‘যার মধ্যে মানবতাবোধ নেই সে মানুষ নামেরই অযোগ্য।’

ঈদের শিক্ষায় আমরা যেন অপর মানুষকে আর অবহেলা না করি। অসহায় মানুষের হক আদায় করে তাদের ভেতরকার বৈষম্য দূর করার ব্যবস্থা করি। ঈদুল ফিতর এমন একটি উৎসবের দিন যার মাধ্যমে ধনী-গরিব সব মানুষ সমানভাবে আনন্দ উৎসবে মেতে থাকতে পারে। এই উৎসব কোনো উগ্র-উচ্ছৃঙ্খল জাহেলি উৎসব নয়; এতো মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সাম্য-মৈত্রীর বন্ধনে এক অপরকে আলিঙ্গনের উৎসব। যে উৎসবের ঝরণাধারায় আমাদের মানবিক শক্তির পরিবৃদ্ধি ঘটবে। এই উৎসবের মাধ্যমে যেন মানুষের জন্য মানববন্ধনের সঞ্জীবনী বৃদ্ধি পায়।
নিজের সম্পদের উপর ভর করে শুধুমাত্র নিজস্ব বলয়ের মধ্যে আনন্দ করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। সমাজের সকল মানুষকে নিয়ে আনন্দ করতে পারলেই প্রকৃত সাম্যবোধ ও সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।

সমাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সমাজে উচ্চমার্গের নামধারীদের পাশবিকতায় নিম্নবর্গের মানুষ সর্বদাই অবহেলার শিকার। বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ের কোথাও কি এর প্রতিফলন ঘটছে? ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় প্রতিটি স্তরেই মানবিকতার অবমূল্যায়ন। সর্বত্র ক্ষমতাসীনদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়ায় শুধু গণ মানুষকে শোষণ করার ব্যবস্থা।

বাস্তবতার নিষ্ঠুর আঘাতে মানববিধ্বংসের উন্মাদনায় রক্তাক্ত পৃথিবী। এ ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা বড়ই করুণ। আর্থ-সামাজিক আর আর্ত-মানবতার এক করুণ ও পীড়াদায়ক অবস্থা সর্বত্র। মুসলমানদের এমন কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর পাশবিকতার শিকার সংশ্লিষ্ট দেশের মানুষ। সভ্যতার উপর রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বৈতন্ত্রমূলক এমন আঘাত এর আগেও ছিল। কিন্তু পবিত্র রোজার মাসে এরকম অনবরত অত্যাচার, নির্যাতন, নির্মম-নৃশংস হত্যাযজ্ঞ আর রাষ্ট্রীয় বর্বরতা সবকিছুকেই হার মানিয়েছে। ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসকের অত্যাচার, নিপীড়ন আর গণ মানুষের উপর দমননীতির ফলে যেকোনো দেশে সন্ত্রাস বেগবান হয় এবং নানা রকম অপরাধ প্রবণতার বৃদ্ধি ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সুযোগে সন্ত্রাস আর মানববিধ্বংসী অপরাধ প্রবণতা ছেঁয়ে যায় দেশময়।

মুসলিম দেশের বাইরে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর বরাবরের মতো নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পবিত্র রোজার মাসেও বার্মার স্বৈরাচারী সরকারের মুসলিম বিধ্বংসী কার্যক্রমে সেদেশের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা সরকারি গুণ্ডা-পাণ্ডাদের নাশকতামূলক অপতৎপরতা সমানভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের হাজার বছরের স্মৃতি চিহ্নসমূহ ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের ভিটে-বাড়ি থেকে নির্দয় ও নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ সর্বস্তরের রোহিঙ্গা মুসলিমদের করুণ চিত্র একটি নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার্মার সরকারি বাহিনীর নৃশংসতায় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে। বর্বর বার্মিজ সরকার ওখানকার বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ঈদের এই সময়ে আমরা কি ভাবছি তারাও যে মানুষ; নিজের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে কী করুণ অবস্থায় তাদের দিন কাটছে। প্রায় তিন লাখের অধিক রোহিঙ্গা শিশু যাদের মা-বাবা নেই। বর্বর বার্মিজদের পাশবিকতার শিকার হয়ে ঐ শিশুদের মা-বাবা মর্মন্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে।

প্রায় প্রতিটি রোজার মাসেই ফিলিস্তিনে ইসরাইলের অব্যাহত আগ্রাসনে অকাতরে ঝরছে ভাগ্যবঞ্চিত ফিলিস্তিনীদের রক্ত। এবারও রোজার মাসে ইসরাইল অবরুদ্ধ মুসলমানদের প্রথম কিবলা ‘মসজিদুল আকসা’য় লক্ষাধিক মুসলিম যখন নামাজ পড়ার জন্য জড়ো হয়েছেন তখন ইসরাইলের দস্যু সৈন্যরা মুসলমানদের উপর নির্বিচারে হামলা করেছে। প্রতি বছর পালায় পালায় ইসরাইলি দস্যুবাহিনী হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে। ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যগাঁথা হাজার বছরের মাতৃভূমিকে ইসরাইলি আগ্রাসীরা জোরপূর্বক দখল করে ইসরাইলি ইহুদীদের পূণর্বাসন করছে। ঠিক তেমনই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিলিস্তিনের পবিত্র জেরুজালেমকে অন্যায়ভাবে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা দেয়ার পর থেকে এ যাবত ফিলিস্তিনী নিরস্ত্র মানুষের উপর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে ইসরাইল নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞে মেতে আছে। জাতিসংঘসহ সারাবিশ্ব ফিলিস্তিনে হত্যাযজ্ঞ ও ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করার দাবি জানালেও ইসরাইল অমানবিকভাবে আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। অতএব সংশ্লিষ্ট দেশের মুসলমানদের ঈদ কেমন তা সহজেই অনুমেয়। ঠিক তেমনই মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় সাধারণ মানুষের প্রতি জুলুম ও পাশবিক নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়ামেনে অসংখ্য মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মানববিধ্বংসী যুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন দেশে রিফিউজি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এছাড়া অন্যান্য মুসলিম দেশের অবস্থাও করুণ।

একইভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাও খুব একটা ভালো নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেখানে এখন চরম ক্রান্তিকাল। পবিত্র রোজার মাসে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ব্যস্তবহুল বাণিজ্যকেন্দ্র বঙ্গবাজার হকার মার্কেট, নিউ সুপার মার্কেটসহ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ ্অগ্নিকাণ্ডে হাজার হাজার ব্যবসায়ী পথের কাঙ্গালে পরিণত হয়ে গেছে। তার আগে বিদ্যুৎ-গ্যাস ব্যবস্থার ত্রুটিজনিত কারণে ভয়াবহ বিষ্ফোরণে শতাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কয়েক শত লোক মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। বাংলাদেশে ঈদের আগে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় সরকারসহ সমগ্র দেশবাশী মর্মাহত ও বেদনাগ্রস্ত।

বাংলাদেশে সরকারের অদূরদর্শী নীতির ফলে রাষ্ট্রীয় অপশাসন ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের রোষানলে বিরোধী রাজনীতি স্থবির হয়ে গেছে। দেশের অর্থ-সম্পদ এবং কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে কোন বিচার ও জবাবদিহিতা নেই। এমন একটি সেক্টর নেই, যেখানে দুর্নীতি নেই। এরকম অস্বস্তিকর পরিবেশে ঈদের খুশি ম্লান হয়ে যেতে বাধ্য।

তবুও ঈদের খুশির ছোঁয়ায় আমরা দুঃখবোধ জরাজীর্ণতাকে কাটিয়ে দেশ-বিদেশে সর্বস্থানের বাংলাদেশিরা ঈদ উদ্যাপন করব। আমরা যেখানেই থাকি না কেন আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে এবং দেশের মানুষকে যেন ভুলে না যাই। সাধ্যানুযায়ী আমরা দেশের অসহায় মানুষদের পাশে থাকব। আমাদের মনে রাখা উচিত, ঈদুল ফিতর সেই আহ্বান নিয়েই প্রতি বছর আগমন করে। যথার্থভাবে ঈদের হক ও দাবি পূরণ করা উচিত।
মানবীয় গুনের অপার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে মানুষের মাঝে যেন ফিরে আসে স্বস্তি, শান্তি ও প্রাকৃতিক, সামাজিক সুশীল পরিবেশ। ঈদ আনন্দের মাধ্যমে মানবিক চেতনায় আমাদের মনের বিকাশ আকাশ ছুঁয়ে নেমে আসুক সুখ-শান্তি ও তৃপ্তির ফল্গুধারা। ফুলের পাপড়ির মতো মানুষের মাঝে নেমে আসুক দয়া-দাক্ষিণ্য, প্রেম ও মমতার অঝোরধারা। মন্দকে পরিহার করে আমরা যেন মনের চোখ দিয়ে মানুষ ও পৃথিবীর উত্তম নিদর্শনকে অবলোকন করি। মহাকবি ইকবালের একটা বিখ্যাত কবিতার লাইন এমন-

“আছে এবং ছিল-র বাগানকে উদাসীন চোখে দেখো না।
এটাতো দেখবার জিনিস, বারবার চেয়ে দেখো।”
আর কবিগুরু’র ভাষায় যদি বলি-
“ঐ তো আকাশ কোশ দেখি স্তরে স্তরে পাপড়ি মেলিয়া
জ্যোতির্ময় বিরাট গোলাপ”।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বলেন-
“ প্রত্যক্ষ দেখেছি যথা
দৃষ্টির সম্মূখে হিমাদ্রিরাজের সমগ্রতা”।

আবার এলো ফিরে, সকল প্রান্তের মুসলিম নীড়ে মহিমান্বিত ঈদুল ফিতর। আমরা যেন সকল প্রকার বৈষম্য ও হানিহানি বাদ দিয়ে সাম্য-মৈত্রীর বন্ধনে একে অপরকে গ্রহণ করি। একে অপরের প্রতি সহনশীল হই। মানবতার সেবায় এগিয়ে অসহায়ের প্রতি দয়াশীল হই। মহানবী (স.) বলেছেনÑ “যে ব্যক্তি মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহ তায়ালা তার উপর রহমত বর্ষণ করেন না।” যে মহান বিশ্বাসের মহিমা ও দীপ্তিতে আমরা মুসলিম, সেই দীপ্তালোকে আমরা যেন অহংকারমুক্ত হয়ে অসহায় আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারি।

মহয়সী কবি কামিনী রায়ের বিখ্যাত উক্তি-
‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’

আমাদের সমাজটা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাইরে কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষ শাস্তি ভোগ করে কষ্ট পায়। যেমন রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের জের হিসেবে জনজীবন বিপন্ন হয়। নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশে সেরকম দুরবস্থা বিরাজিত।
তবে, আমরা যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ, তাই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক দুরবস্থার খবরে আমরা মর্মাহত ও ব্যথিত হয়ে পড়ি। মানুষকে ভালোবাসা ও সেবার মাধ্যমে আমরা যেন সেসব অপূরণীয় কষ্টগুলোকে মোচন করতে পারি, সেই প্রত্যাশা করি।

এই বিশ্ব চরাচরে ব্যক্তি থেকে পরিবার এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্রই সাম্য-মৈত্রী ও মানবতার বন্ধন সুদৃঢ় হয়ে উঠুক। সর্বত্র গড়ে উঠুক বৈষম্যহীন মানবভূবন। ঈদের মৌলিক শিক্ষা ও মূল দাবি এটাই। যার ঔজ্জ্বল্যের সুন্দরালোকে সমগ্র বিশ্বের মানুষের মাঝে নেমে আসুক প্রেম, ভালোবাসা, স্বস্তি ও শান্তির পরিবেশ। ঈদ আসুক সবার তরে। ঈদ আসুক সবার ঘরে।

ঈদুল ফিতরের মহান খুশির দিনে তাই হোক আজকের প্রত্যাশা। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।