উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতার স্বীকৃতি উদযাপন

ঢাকা : বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করায় ‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ সেøাগান নিয়ে দেশ মেতে উঠে আনন্দ উৎসবে। গত ২২ মার্চ এই আনন্দযজ্ঞে শামিল হয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। রাজধানীতে তারা বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করেন।
সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। গত ২০ মার্চ কর্মসূচি শুরু হলেও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব করে গত ২২ মার্চ। আনন্দ শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয় সারা দেশে।

বাংলাদেশের এ অর্জনের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে গত ২২ মার্চ। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওই সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরাসহ নানা শ্রেণিপেশার প্রতিনিধি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আগে ও পরে ঢাকার সরকারি দপ্তরগুলোসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। বর্ণিল ব্যানার, ফেস্টুন, ব্যান্ড পার্টিসহ ওই সব শোভাযাত্রায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয় রাজধানীজুড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। অংশ নেওয়া একজন নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটা আমাদের সেরা অর্জন। তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা কাটিয়ে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ। একসময় উন্নত বিশ্বের কাতারে যাবÑ এমন স্বপ্ন দেখতেই পারি।’

বিকেলে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোক উৎসব। এতে যোগ দেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ৫৭টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীনস্থ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেলা ৩টা থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে রওনা হয়ে ৯টি স্থানে সমবেত হন। পরে সমবেতভাবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে যান তারা। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাও যোগ দেন ওই অনুষ্ঠানে।

গত ২২ মার্চ সকাল থেকেই সচিবালয়ে ছিল উৎসবের আমেজ। দুপুরের আগেই টুপি, টি-শার্ট পরে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বেলা ৩টায় সচিবালয় ও বিভিন্ন দপ্তর থেকে ৯টি পথে রওনা হন তারা। ‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ লেখা লাল-সবুজ টি-শার্ট এবং একেক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ একেক রঙের টুপি পরে তারা শোভাযাত্রায় যোগ দেন। প্রায় সব দলের সামনে ছিল ব্যান্ড বাদকের দল। কোনো কোনো দল এগিয়েছে বর্ণিল সাজে নেচে-গেয়ে। কোনো কোনো দলে ছিল হাতি, ঘোড়া, বিশাল আকৃতির নৌকার প্রতিকৃতি।

রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তত আধাঘণ্টা আগে থেকেই রাস্তায় নেমে আসেন শোভাযাত্রায় যোগ দেওয়ার জন্য। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উচ্চারিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ ধ্বনি। অনেকের মাথায় দেখা যায় লাল-সবুজের ক্যাপ, গায়ে টি-শার্ট, হাতে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড; যেখানে লেখা ছিল ‘হাতে রেখে হাত, উন্নয়নের ডাক’, ‘স্বপ্ন পূরণের উৎসবে আজ বাংলাদেশ’, ‘স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ আজ হাসছে সুখী মানুষের প্রাণস্পন্দনে দেশ ভাসছে’ ইত্যাদি স্লোগান।

সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি গ্যালারিতে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা ও তার ছেলে রাদওয়ান সিদ্দিক মুজিব, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঝপথে লেজার শোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস এবং উন্নয়নের কর্মকা- তুলে ধরা হয়। স্টেডিয়ামে স্থাপিত বড় পর্দায় প্রদর্শিত হয় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্যচিত্র। এরপর গত ২২ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভাষণের ধারণকৃত অংশ প্রদর্শন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ধারণকৃত বক্তব্য শেষ হতেই রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আতশবাজির ঝলকানিতে। হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয় ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৫টায় অনুষ্ঠান মঞ্চে শুরু হয় মূল আয়োজন। প্রথমেই শতজন ঢাকির ঢাকঢোলের মূর্ছনা, সঙ্গে যুদ্ধংদেহি নৃত্য রায়বেশে। সামিনা হোসেন প্রেমার পরিচালনায় এ নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন ভাবনার নৃত্যশিল্পীরা।

নূপুরের নিক্কনধ্বনি থামতেই অর্ধশত বংশীবাদকের বাঁশি বেজে ওঠে। ঠিক তখনই মঞ্চে প্রবেশ করে শিল্পকলা একাডেমির শিশুশিল্পীরা। অনুষ্ঠানে এম আর ওয়াসাকের পরিচালনায় নন্দনকলা কেন্দ্রের দুই শতাধিক নৃত্যশিল্পী ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে। তা ছাড়া ‘আমরা সবাই বাঙালি’ ও ‘তীরহারা এ ঢেউয়ের সাগর’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে শিশু একাডেমির শিশুশিল্পীরা।

এর পরের পরিবেশনা সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গ্রাম বাংলায়। নড়াইল থেকে আগত লাঠিয়াল দল স্টেডিয়ামভর্তি দর্শকদের মুগ্ধ করে লাঠিখেলার কসরতে। তামান্না রহমানের পরিচালনায় তার দল নৃত্যছন্দে পরিবেশন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

ইস্কাটন গার্ডেন স্কুলের শতাধিক শিক্ষার্থী সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করে। মুগ্ধ করে শিল্পকলা একাডেমির অ্যাক্রোবেটিক দলের চমৎকার পরিবেশনা। ছিল অন্তর দেওয়ানের পরিচালনায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন, গারো, হাজং, সাঁওতাল, ওরাও, মুরং, তংঞ্চঙ্গা ও চাক সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনা।
ওয়ান্দা রিহাবের পরিচালনায় ধৃতি নৃত্যালয় পরিবেশন করে ধামাইল নৃত্য। বাউল সঙ্গীত পরিবেশন করেন শফি ম-ল ও চিশতী বাউল। বেহালা, সারিন্দা, সরোদ, সেতার, দোতারা, খোল, তবলা, ঢোলের সঙ্গে ছিল কিবোর্ড, প্যাড, পারকিশনের যুগলবন্দি।

অনুষ্ঠানে ব্যান্ড সংগীত পরিবেশন করে নেমেসিস। মূল আকর্ষণ হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন রুনা লায়লা, মমতাজ ও জেমস।

মাথাপিছু আয়, মানবোন্নয়ন সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের ভিত্তিতে তিন বছর পরপর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের আবেদন পর্যালোচনা করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। একটি দেশের মাথাপিছু আয় কমপক্ষে এক হাজার ২৩০ ডলার, মানবোন্নয়ন সূচকে স্কোর ৬৬ বা তার বেশি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে স্কোর ৩২ বা তার কম হলে সেই দেশকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতির যোগ্য বিবেচনা করা হয়। তবে ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পর বাংলাদেশ এবারই প্রথম তিনটি সূচকে প্রয়োজনীয় শর্তপূরণে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ২৭১ ডলার, মানবোন্নয়ন সূচকের স্কোর ৭২৯ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে স্কোর ২৪৮।