উন্নয়নের ম্যাজিক সত্ত্বেও তীব্র নাগরিক সংকট

নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশে উন্নয়নের ম্যাজিক সত্ত্বেও সৃষ্টি হয়েছে চরম নাগরিক সংকট। ধনী থেকে গরিব-সবার ঘরে পড়েছে চাপ। মানুষের মধ্যে যন্ত্রণা ও বিরক্তি এসেছে। কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে সব পরিবার। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে খাতা-কলমে আয় বাড়লেও দেশের বেশির ভাগ মানুষের আর সংসার চলছে না। চাল ও তেলের বাজার অস্থির হয়ে গেছে। গ্যাসও ফুরিয়ে যাচ্ছে। কথা রাখছে না বিদ্যুৎ বিভাগ- এক ঘণ্টার লোডশেডিং তিন ঘণ্টায়ও শেষ হচ্ছে না। গ্রাম থেকে শহরে সব জায়গায় ভয়ংকর প্রভাব পড়েছে। রিজার্ভের অর্থ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দুর্নীতি ও অপব্যবহারের প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। নানা ক্ষেত্রে যেভাবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রিজার্ভ থেকে টাকা খরচ করা হচ্ছে, তাতে বর্তমান ফান্ড দিয়ে সামনের ঝুঁকি মোকাবিলা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে বলে বিশেষ মহল থেকে রব উঠেছে।
এ ছাড়া দেশের সাংবিধানিক পদ, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের বিষয়গুলোতেও আঘাত আসছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে ততই শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য স্বয়ং নির্বাচন কমিশন থেকেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। মাঠে সেনা প্রয়োজন বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই বলেছেন। বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ না করলে দেশ-বিদেশে জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বারবার উত্তেজনা, খুনোখুনি চলছে। দেশে প্রায় ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর মধ্যে প্রতিবছর ৩০ হাজারেরও বেশি নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। এদের পরিচয় ও ঠিকানা কী হবে-এখনো সরকার থেকে স্পষ্ট কিছু বলা হচ্ছে না। স্থানীয়রা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছেন। নিরাপত্তার শঙ্কায় অনেকেই এলাকা ছাড়ছেন। পাহাড় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ছে পুরো দেশ। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে এখনো অনিরাপদ ক্যাম্পাস। সম্প্রতি চবিতে ছাত্রী হেনস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উত্তাল হয়ে উঠছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নাগরিক সমস্যা বাড়ছে।
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ১৩ বছর পার করেছে আওয়ামী লীগ। এই সময়ে তারা দেখিয়েছে উন্নয়নের ম্যাজিক। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারিতে দিনবদলের অঙ্গীকার করে সোনালি অধ্যায় পার করেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত স্বপ্নের বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি রেখে দ্বাদশ নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়ন করা হচ্ছে। টানা চতুর্থবারের মতো বিজয়ের রেকর্ড গড়তে ভেতরে-বাইরে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, তারা দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দিলেও নাগরিকদের বড় সমস্যাগুলো দূর করতে পারেনি।
দেশের সামগ্রিক বিষয়ের ওপর চোখ রাখা ব্যক্তিরা বলছেন, এবার যেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, তাকে আগে নাগরিক সমস্যা দূর করতে হবে। নাগরিকদের সমস্যা দূরীকরণ ব্যতীত এবার কোনো দলেরই অবস্থান মজবুত হবে না। বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, যে কয়েকটি দেশে নাগরিক বিস্ফোরণে অঘটন ঘটছে, বাংলাদেশেও কিছু কিছু দৃশ্যপট রয়েছে। বাংলাদেশকে মাথায় রাখতে হবে কয়েকটি দেশ থেকে দেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্ক সব সময় থাকে, তাই বাংলাদেশ সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিষয়ে আরো দক্ষতার প্রমাণ রাখতে হবে। তারা বলছেন, সরকারঘোষিত এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং, ওয়াসার পানি ও ৫৩টি ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, তলোয়ার-রাইফেল নিয়ে ইসির বক্তব্য ঘরে ঘরে নাগরিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও ক্ষোভ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্বব্যাপী যে সংকট, সেই সংকটের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত রাখা সম্ভব নয়। তবে যতটুকু পারা যায় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা। আমাদের দেশের মানুষ গণতন্ত্রমনা ও অল্পে তুষ্ট। কাজেই বিভিন্ন সময় সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক না কেন, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। জনগণের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নির্বাচনে জনগণ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। চলমান রাজনীতি নিয়ে আশাবাদী হওয়া দুরূহ, একটি অনিশ্চিত গন্তব্য আমাদের সামনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটার পর একটা জাদু দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু জাদুর সমস্যা হলো, জাদু যতক্ষণ আছে, মানুষ ততক্ষণ মোহমুগ্ধ। তবে এই মুগ্ধতা শেষ হলে কিন্তু মোহ কেটে যায়। সরকারের উচিত সতর্ক হওয়া। দেশের নাগরিকের ভাষা বোঝা। দেশের নাগরিকের সমস্যা দূরীকরণে আরো মনোযোগী হওয়া।