উন্মুক্ত কারাগার হচ্ছে দেশে

উখিয়া : ‘আমি বন্দী কারাগারে, আছি গো মা বিপদে, বাইরের আলো চোখে পড়ে না মা’, মুজিব পরদেশীর জনপ্রিয় এ গানের কলির সঙ্গে কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের অনেক ক্ষেত্রেই মিল রয়েছে। কিন্তু এবার শুধু বাইরের আলোই নয়, স্বাভাবিক মানুষের মতো উন্মুক্ত পরিবেশে চলাফেরা করতে পারবেন বন্দী কয়েদিরা। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যতিক্রম এ ‘ওপেন জেল’ (উন্মুক্ত কারাগার) প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ওপেন জেল প্রতিষ্ঠার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। কক্সবাজারের উখিয়ায় এ উন্মুক্ত কারাগার স্থাপনের জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩১০ একর জমির ওপর এটি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

উন্মুক্ত কারাগারটি হবে কয়েদি বা বন্দীদের ‘পুনঃসামাজিকীকরণ’র একটি মাধ্যম। যেখানে প্রচলিত কারাগারের মতো থাকবে না উঁচু প্রাচীর, থাকবে না স্বাভাবিক চলাচলে বিধিনিষেধ। কিছু নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে অনেকটাই স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারবেন বন্দীরা।

জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় এমন উন্মুক্ত কারাগার রয়েছে। এ ছাড়া পৃথিবীর আরও কয়েকটি উন্নত রাষ্ট্রে এ উন্মুক্ত কারাগার রয়েছে। এ জাতীয় কারাগার দেশগুলোর জাতি ও সভ্যতার উন্নয়নকেও প্রতিফলিত করে থাকে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে উন্মুক্ত কারাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি খুবই ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারা অধিদপ্তরের ডিআইজি প্রিজন (সদর দপ্তর) বজলুর রশীদ বলেন, ৩১০ একর জমিটি সরকার উন্মুক্ত কারাগারের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। জমিটি অধিগ্রহণ বাবদ অর্থ এরই মধ্যে সরকার থেকে কারা কর্তৃপক্ষ বুঝে পেয়েছে। শিগগির অধিগ্রহণের মূল্য পরিশোধ করে অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। এরই মধ্যে আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন উখিয়ায় ওই জমি বা এলাকাটি পরিদর্শনও করেছেন।

এ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন আরও বলেন, উখিয়ার ওই জায়গায় গাছপালা, পাহাড়সহ প্রাকৃতিক সব পরিবেশ ঠিক রেখে তার মাঝেই সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হবে উন্মুক্ত কারাগার। এখানে রাখা হবে সেইসব বন্দী কয়েদিকে, যাদের মুক্তি আসন্ন বা দুই বছরের কম। এখানে থাকবে পোলট্রি ফার্ম, কৃষি ফসল, শিল্প কারখানা ইত্যাদি। এসব কাজের মাধ্যমে কয়েদি-বন্দীদের সামাজিক নানা কাজে নিযুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কারাগারগুলো এখন খুবই মানবিক। অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশের কারাগারগুলোয় বন্দীদের সঙ্গে অনেক বেশি মানবিকতা দেখানো হয়। উন্মুক্ত কারাগারটি সেই মানবিকতারই আরেকটি ফল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, কোনো ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ১৫ থেকে ২০ বছর জেলে থাকার পর মুক্তি পেয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখেন সমাজের প্রায় সবকিছুই অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। মানুষের চিন্তাচেতনাসহ সামাজিক এ পরিবর্তন সহজভাবে মেনে নিতে তার কষ্ট হয়। স্বজনরাও অনেক সময় তাকে সহজভাবে গ্রহণ করে না। সমাজও তাকে দেখে নেতিবাচক চোখে। আগের অপরাধ ও কারা জীবনকে সময় সুযোগমতো মনে করিয়ে দিতে কেউ যেন পিছপা হয় না। নানা কথা ও কাজের মাধ্যমে সে কথা স্মরণ করিয়ে তাকে আঘাত করা হয়ে থাকে।

এ অবস্থায় কারামুক্ত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রেই আবারও অপরাধে জড়ান কিংবা মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। উন্মুক্ত কারাগারটি মূলত মুক্তি আসন্ন বন্দীর পক্ষে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে অবদান রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। এখানকার সময়টুকুয় আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ থাকবে। সামাজিক প্রায় সব কর্মকা-েই স্বাভাবিকভাবে অংশ নিতে পারবেন। এখানকার খামার বা শিল্প কারখানার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে পারবেন। যাতে করে বাইরে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে বন্দীকে সমস্যায় পড়তে না হয়।