একই দিনে ৩ যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যু

ড্রাগে মারযানের-পানিতে ডুবে তানভিরের মৃত্যু ও নিজ গাড়ি থেকে মহসিনের লাশ উদ্ধার

ঠিকানা রিপোর্ট : একই দিনে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত তিন আমেরিকান যুবকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। গত ৫ আগস্ট তাদের অকাল মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমেছে। হতবিহ্বল পুরো কমিউনিটি। শোকার্ত পরিবারে শোকের মাতম। এই শোক বইবার যেন শক্তি নেই। নতুন প্রজন্মের যাদের অপমৃত্যু হয়েছে তারা হলেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাংবাদিক ও লেখক মাহবুব রহমানের দ্বিতীয় ছেলে কুইন্সে বসবাসকারী মারযান রহমান (২৫), ব্রঙ্কস নিবাসী তানভির মিয়া (২৩) এবং নিউইয়র্কের বায়তুল গাফফার মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও উডহ্যাভেন জামিয়া ইসলামিক সেন্টারের ইমাম মাওলানা শায়েখ আসাদ আহমদের বড় ছেলে মহসিন আহমদ (২৮)।
এদের মধ্যে মারযান সুইমিং পুলে ও তানভির লেক জর্জে সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যায়। আর মহসিন আহমদকে তার গাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মারযান রহমানের মৃত্যু : মারযান সাংবাদিক মাহবুব রহমান ও উষা রহমান দম্পতির চার ছেলের মধ্যে দ্বিতীয়। ৫ আগস্ট রাত ১০টার দিকে কুইন্স এলাকার একটি সুইমিং পুল থেকে মারযানকে উদ্ধার করে জ্যামাইকা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানেই মধ্যরাতে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণে মারযান রহমানের মৃত্যু হয়েছে।

জানা গেছে, ঘটনার দিন মাহবুব রহমান অফিসেই ছিলেন। সন্ধ্যার পর বাসায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। মধ্যরাতের দিকে তার অন্য ছেলে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফোন করে মারযানের ঘটনা জানায়। খবর পেয়ে মাহবুব দম্পতি দ্রুত জ্যামাইকা হাসপাতালে ছুটে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের সন্তানের মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করেন।
একটি সূত্রে জানা গেছে, মারযান রহমান ছিল মেধাবি ছাত্র। সে ব্রুকলিন টেক এবং পেনস্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করার পর নিজেই রিয়েল স্টেট ও আমাজনের সাথে ব্যবসা করতো। মারযান রহমানের বাবা-মা বাফেলো থেকে নিউইয়র্কে ফিরে এলেও ছেলেরা আলাদা থাকতো। মারযান থাকতো এস্টোরিয়ায়, আরেকজন থাকে ব্রুকলিনে এবং অন্যজন থাকে ক্যালিফোর্নিয়ায়। ঘটনার দিন মারযার রহমান তাদের আরো কয়েকজন বন্ধু নিয়ে তাওয়া জেএফকে হোটেলে উঠেছিল। সেখানেই তারা ড্রাগ নেয়। মারযান রহমান নাকি অতিরিক্ত ড্রাগ নিয়েছিল। যে কারণেই সে হোটেলের সুইমিংপুলে পড়ে যায় এবং মৃত্যুবরণ করে।
মারযার রহমানের নামাজে জানাজা গত ৭ আগস্ট বাদ জুমা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা শামসে আলী। মারযানের জানাজায় কমিউনিটির সর্বস্তরের লোকজন অংশগ্রহণ করেন। নামাজে জানাজা শেষে তার লাশ লংআইল্যান্ডের ওয়াশিংটন মেমোরিয়ালে দাফন করা হয়।
লেকে ডুবে তানভির মিয়ার মৃত্যু : গত ৫ আগস্ট নিউইয়র্কের আপস্টেটে লেক জর্জে বন্ধুদের নিয়ে আনন্দে সময় কাটাতে গিয়েছিল তানভির মিয়া। একটি বোট ভাড়া করে লেকের প্রায় মাঝখানে গিয়ে তারা সেটি বন্ধ করে দেয়। সিদ্ধান্ত নেয় লেকে সাঁতার কাটার। বন্ধুদের মধ্যে একজন ফেসবুকে লাইভ করছিল। প্রথমেই লেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তানভির মিয়া। ঝাঁপ দিয়েই তানভির মিয়া কিছু দূর চলে যায়। আবার সাঁতার কেটে বোটের কাছে এলে, একজন তাকে বোটে তোলার চেষ্টা করে, কিন্তু সে উঠেনি। তার পরপরই আরো তিনজন ঝাঁপ দেয়। তারাও একটু সাঁতার কাটে। এরই মধ্যে তানভির মিয়া হেল্প হেল্প বলে চিকিৎকার করতে থাকে। পানিতে থাকা ২ জন তানভির মিয়াকে সাহায্য করার চেষ্টা কওে ব্যর্থ হয়। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তানভির মিয়া পানিতে তলিয়ে যায়। অন্যদিকে বন্ধুরা শত চেষ্টা করেও স্পিডবোটটি স্টার্ট দিতে পারেনি। তানভিরকে উদ্ধার বা সাহায্য করতেও পারেনি। পরদিন ৬ আগস্ট তার মরদেহ লেক জর্জ থেকে উদ্ধার করা হয়।
তানভির মিয়ার মামা আব্দুস শহীদ জানান, তানভির তার বাবা-মা এবং ভাই-বোনদের নিয়ে ১২২৭ হোয়াইট প্লেনস রোডে থাকতো। সে তার বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। তার বড় ভাই তামজিম মিয়া (২৮) এবং ছোট বোন তাহসিনা। তানভির মিয়া গ্রাজ্যুয়েশন করেছে। সে গ্রীন ক্যাব চালাতো এবং একটি ডানকিন ডোনাটের স্টোরে ম্যানাজারের চাকরি করতো। তার উপার্জন দিয়েই মা-বাবা সংসার চালাতো।
ঠিকানার এক প্রশ্নের জবাবে শহীদ বলেন, তানভির মিয়া খুব ভালো এবং ধার্মিক ছিল। তার দেশের বাড়ি সিলেটের সুনামগঞ্জে।
তানভির মিয়ার নামাজে জানাজা গত ৭ আগস্ট বাদ জুমা পার্কচেস্টার জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুল সংখ্যক মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। নামাজে জানাজা শেষে গত ৮ আগস্ট তানভির মিয়ার লাশ নিউজার্সির মুসলিম গোরস্তানে দাফন করা হয়।
নিজের গাড়ি থেকে মহসীন আহমদের লাশ উদ্ধার : নিউইয়র্কের সিটি পুলিশ ওজনপার্কের পিএস ২১৪ (স্কুল)-এর সামনে থেকে মহসীনের মৃতদেহ তার গাড়ি থেকে উদ্ধার করে। মহসীন আহমদ কিভাবে, কখন মারা গেছে তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। মহসীনের চিকিৎসকদের মতে সম্ভবত হার্ট অ্যাটাকে তিনি মারা গেছেন। গত দুদিন যাবৎ তার কোনো খবর পওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বার বার ফোন করেও তার হদিস মেলেনি। ৫ আগস্ট সকালে কে বা কারা একটি গাড়িতে একজন লোক দেখে ৯১১-এ কল দিলে বিকেলে পুলিশ এসে স্টার্ট থাকা পার্কিং করা গাড়ির গ্লাস ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে মৃত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। মহসীনের বাবা মাওলানা শায়েখ আসাদ আহমদ ঠিকানাকে বলেন, প্রতিদিন কার মতো ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মহসিন সে দিন বাইরে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে যায়। কে জানত এই যাওয়াটা তার শেষ যাওয়া। কিভাবে খবর পেলেন, এর জবাবে তিনি বলেন, উডহেভেন মসজিদে মাগরিবের নামাজের সময় ফোনে পরপর তিনটা রিং হয়। নামাজ শেষে ফোনে উত্তর দিতেই ঘর থেকে পিএস ২১৪ সামনে ছেলে মহসিনের সড়ক দুর্ঘটনার খবর পান। সাথে সাথে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন, গাড়ি ও তার ছেলেকে পুলিশ বেষ্টনী দিয়ে রেখেছে। পুলিশের কাছে পিতা পরিচয় দিয়েও দেখা করতে পারেননি। পুলিশের কাছে জানতে পারেন মহসিন মারা গেছে।
পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স ডেকে স্থানীয় হাসপাতালে লাশ পাঠিয়ে দেয়। মহসিন সন্ধ্যা ৭টা মারা গেছে বলে মহসিনের বাবা সূত্রে জানা যায়। মরহুমের নামাজে জানাজা ৭ আগস্ট সকাল ১০টায় দেশি সিনিয়র সেন্টারে সম্মুখে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন, মহসিনের বাবা ইমাম খতিব শায়েখ আসাদ আহমদ। জানাজা শেষে নিউজার্সিতে লাশ দাফন করা হয়। জানা যায়, মহসিন (২৮) ২০০৯ সালের জুন মাসে বাবা খতিব ইমাম মাওলানা শায়েখ আসাদ আহমদের সাথে নিউইয়র্কে পাড়ি দেয়। এখানে আসার পর স্থানীয় ওজন পার্কের আল আমান মসজিদে কয়েকদিন দ্বিতীয় ইমাম হিসেবে নিয়োজিত ছিল। এখান থেকে রিচমন্ভহিল চলে যাওয়ায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়া হয়। পরে ফরবেল স্টিটে স্থায়ী বসবাস করেন। দেশে থাকাকালীন সময়ে সিলেট দারুস সালাম মাদ্রাসা লেখাপড়া করেন। আমেরিকা আসার সুবাদে টাইটেল পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকেনি। মারা যাওয়ার কারণ জানা যায়নি। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট পেতে ৬ থেকে ১২ সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। তিনি ছেলের আত্মা যেন শান্তি বর্ষিত হয় সবাই যেন এই প্রার্থনা করেন। মহসিনের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের গজুকাটা গ্রামে।
শোক প্রকাশ
সিলেট সদর থানা অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি, বর্তমান কার্যকরি কমিটির সম্মানিত সদস্য, বিশিষ্ট কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক মাহবুব রহমানের ছেলে মারজান রহমান (২৫) ৫ আগস্ট রাতে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। সিলেট সদর থানা অ্যাসোসিয়েশন মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। মরহুমের নামাজে জানাযা শুক্রবার বাদ জুম্মা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।