একজন নির্ভীক জীবনযোদ্ধার অন্তর্ধান

রওশন হাসান : আলেয়া চৌধুরীর জন্ম ১৯৬১ সালে কুমিল্লার উত্তর চর্থা গ্রামে। মায়ের নাম আম্বিয়া খাতুন, পিতা সুলতান আলম চৌধুরী। দারিদ্র্যের কারণে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত নারী। তাঁর মেধা, মনোবল ও প্রতিভাকে সঙ্গী করে জীবনের কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়েছেন।
চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন ‘আল্লাহর কাছে খোলা চিঠি’ নামে একটি কবিতা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন এক অন্তর্নিহিত কবি। আলেয়া চৌধুরী, যিনি জীবনসংগ্রামে কখনো হার মানেননি। ১৯৬৯-এ গ্রাম্য পঞ্চায়েতের অমানবিক বিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসেন। তাঁর মা পঞ্চায়েতের রায় উপেক্ষা করে তাঁকে গ্রাম ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি ট্রেনে চড়ে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছে যান। ঢাকায় এসে আলেয়া চৌধুরী হকারের কাজ নেন। খবরের কাগজ বিলি করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করে চাঞ্চল্যকর খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পেশাগত গাড়িচালক হওয়ার প্রচেষ্টা আবারও দৈনিক বাংলার লোক-লোকালয় পাতায় সাংবাদিক হেদায়েত হোসাইনের কলামে তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। ঢাকার আজিমপুর এতিমখানার পাশে অবস্থিত দৈনিক আজাদ পত্রিকা অফিসের খেলাঘরে তিনি প্রথম স্বরচিত কবিতা পড়েন। এরপর ১৯৭০ সালে ‘বেগম’ পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘জীবনের স্টেশনে’ পদ্মা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। এ বইটিতে ‘অগ্নিবলয়’ কবিতায় কবি লিখেছেন :

‘জন্মেই শুনেছি শৈশবের মানুষেরা পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাত
অথচ আমি আজ দাঁতে দাঁত ঘষে জ্বালাই প্রদীপ
এবং জীবনের মুহূর্ত ঘষে বানাই বিবেক।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সেলাই মেশিন দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, আলেয়া চৌধুরী তা গ্রহণ করেননি এবং নারীদের গাড়িচালক পেশায় স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করার প্রস্তাব রেখেছিলেন। বাংলাদেশের সাহিত্য, স্বাধীনতার ইতিহাসকে কবি আলেয়া চৌধুরী সগর্বে ধারণ করেন। বাংলাদেশে প্রখ্যাত লেখকদের সাহচর্যে বেড়ে উঠেছিলেন আজকের কবি আলেয়া চৌধুরী। তাঁদের মধ্যে কবি আবুল হাসান, কবি আল মাহমুদ, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি সুরাইয়া খানম, কবি অসীম সাহা, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, কবি হেলাল হাফিজ, কবি মাহবুব হাসান অন্যতম। ভাস্কর্যশিল্পী শামীম সিকদার ছিলেন তাঁর বন্ধুপ্রতিম।
গ্রাম ত্যাগ করার পর তিনি কিছুদিন ঢাকার মুন্সিগঞ্জে থাকেন। ১৯৭১ সালের পর তিনি নিজ গ্রামে ফিরে যান। পরিবার ও গ্রামবাসী তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি পুনরায় ঢাকায় ফিরে এসে সদরঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে রন্ধনশালায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার তৈরি করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘দীপ্ত বাংলা’ নামে একটি পত্রিকার সঙ্গে জড়িত হন। কয়েক বছর পর ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা অফিস ও রেডিও বাংলাদেশে কাজ করার পর মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইরান ও জার্মানি ভ্রমণ করেন। অবশেষে ২০ বছর বয়সে মাছধরার ট্রলিতে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মার্কিন মুল্লুকে থিতু হন। নিউইয়র্কে কবি ইকবাল হাসান, লেখক পূরবী বসু, লেখক সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহ, লেখক আলম খোরশেদ, কবি হাসানাল আবদুল্লাহ, লেখক এবিএম সালেহউদ্দিন, লেখক প্রকাশক পপি চৌধুরী, ফরিদা মজিদসহ আরও অনেকের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ গড়ে উঠেছিল। তাঁর কবিসত্ত্বায় অভিবাসন জীবনের টানাপোড়েন, দেশপ্রেম, একাকিত্ববোধের সম্মিলন ঘটে। ‘আলোর প্রত্যাশা’ কবিতায় তারই প্রকাশ আমরা অনুধাবন করি :

‘নিহত রৌদ্রের মতো জীবনের ছায়াছবিগুলো
আকাশের রং রং মৌনতা মনে
কী যেন স্বপ্ন দ্যাখে
আহে কী যেন স্বপ্ন দ্যাখে!’

পরে ১৯৭৮ সালে ‘দুঃখের সমান সরলরেখা’, ‘আমি হার্লেমের নিগ্রো’ এবং ১৯৮৪ সালে ‘যুদ্ধহীন নিরাময় পৃথিবী চাই’ নামে আরও একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়।
পর্যটক জীবনে তিনি হতোদ্যম হননি কখনো। ২০০২ সালে তিনি দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হন কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। দেশের সঙ্গে প্রতিদিন ফোনে সংযুক্ত থেকেছেন। প্রবাসে বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে তিনি রকল্যান্ড কাউন্টি থেকে ড্রাইভ করে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৬ সালে নিউইয়র্কে ‘নারী’ পত্রিকা কবি আলেয়া চৌধুরীকে সম্মাননা প্রদান করে। এ ছাড়া নিউইয়র্কের সাহিত্য সুহৃদবৃন্দ ২০১৮ সালে কবি আলেয়া চৌধুরীকে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করেন।
অবশেষে নিউইয়র্কের রকল্যান্ড কাউন্টিতে একটি ডে কেয়ারে দীর্ঘ ছয় বছর কাজ করার পর এমপ্লয়মেন্ট ভিসায় গ্রিনকার্ডপ্রাপ্ত হন এবং আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। স্বদেশের ধূলিকণা পায়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। বিভিন্ন দেশে কর্মক্ষম থেকে নানা দেশের, বর্ণের-ধর্মের মানুষের সান্নিধ্যে অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর কবিতার বাঁকবদল ঘটে এবং তাঁর কবিতা পরিণত হয়ে ওঠে। অভিবাসী জীবনে আন্তর্জাতিক বলয়ের প্রভাবে সাম্রাজ্যবাদ, জঙ্গিবাদ এবং শান্তির সপক্ষে ঘৃণা প্রকাশ করে সাম্রাজ্যবাদকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর কবিতাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতা সমষ্টির মঙ্গলসাধনায় যেমন অঙ্গীকারবদ্ধ, তেমনি ব্যক্তিক প্রেমানুভূতির বিষয়টি কবিতার মৌলিক দ্যোতনা হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে মানবজীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিও দায়বদ্ধ। তাঁর স্বপ্ন ছিল, প্রত্যাশা ছিল ছোট ভাই ও তার পরিবারকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসবেন এবং জীবনের বাকি সময় তাদের সঙ্গে কাটাবেন।
১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে সমস্যাজর্জরিত শিশুদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে Problem Child নামের একটি প্রতিষ্ঠানে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অস্তিত্বের সংগ্রামকে স্বীকৃতিস্বরূপ নিউইয়র্কের স্টার ম্যাগাজিন ‘Woman Of The Year’ শীর্ষক প্রচ্ছদকাহিনি প্রকাশ করে। ১৯৯৪ সালে দিনা হোসেন Aleya: A Bangladeshi Poet in America নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। এই ছবিতে মজদুর শ্রেণি থেকে আসা একজন নারীবাদী কবির সংগ্রামী জীবনের গল্প চিত্রায়িত হয়। দিনা হোসেন এই ফিল্ম তৈরি করে কলকাতা থেকে ‘কলাকৃতি’ পুরস্কার পান। এ ফিল্মটি পরিচালক তারেক মাসুদ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, জাভেথ সেন্টার, ম্যানহাটান, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ও বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শন করেন। চীন ও বাংলাদেশে এটি প্রদর্শিত হয়। ২০১৬ সালে একটি নারীবিষয়ক পত্রিকা তাঁর কর্মজীবনের সাফল্যকে স্বীকৃতি দান করে।
বাংলাদেশ ও নিউইয়র্কে অবস্থানকালে কবির ১১টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ভ্রমণকালে কবির তিনটি বই যথাক্রমে হৃদয়ে বাংলাদেশ, মাদার ও God kissed it প্রকাশিত হয়। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ইংরেজিতে The Man: Father of Bangladesh বইটি আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইটির সম্পাদনায় ছিলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। নারীবৈষম্যবিরোধী আলেয়া চৌধুরীর ‘বধূ আমার’ কবিতাটি নারীসমাজের জাগৃতি।

‘ডলারে আমদানি করেছি তোমাকে-
ডলার ভাঙিয়েছি, রুপি বা রুবেলে
টাকায় বা মার্কে
আমি তোমাকে বায়নাহীন পাইকারি দরে কিনে আনলাম
মনে রেখো সুন্দরী, মনে রেখো!’

২০১১ সালে নাইন ইলেভেন ও বিশ্বের অমানবিক ঘটনার ওপর তিনি একটি কবিতার পাণ্ডুলিপি Poems about Truth তৈরি করেন, যেটি রকল্যান্ড সিটি হলে গৃহীত হয় এবং কবিতার আসরে তিনি আমেরিকান কবিদের সঙ্গে তাঁর কবিতা পাঠ করেন।
তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয় শান্তি ও সৌহার্দ্যরে সুর :
মার্টিন লুথার কিংকে চিঠি-

‘মার্টিন, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে-
মার্টিন, আমেরিকার নিগ্রো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত তোমার নাম
মার্টিন, তুমি আমার ভাই।
তুমি সারা বিশ্বের জননন্দিত নেতা।’

নারীবাদী লড়াকু কবির শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতির নান্দনিক সৌন্দর্যের মধ্যে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন তিনি। অবসরে প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাতে, ফোনালাপ ও বই পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। নিউইয়র্কের সাহিত্য সুহৃদদের সঙ্গ তিনি অত্যন্ত উপভোগ করতেন। সবার আনন্দ ও দুঃখের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করতেন। অন্যের মাঝে নিজের শারীরিক ও অন্তর্গত কষ্টের স্বস্তি খুঁজতেন। কবি আলেয়া চৌধুরীকে গত ৩ আগস্ট ২০২০-এ নিজ বাসভবনে মৃতাবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে। তাঁর রোগগ্রস্ত ও একাকী জীবনের নিভৃত অবসান ঘটে। কবি আলেয়া চৌধুরীর জানাজা ও দাফনকাজ সুসম্পন্ন হয়েছে গত বুধবার ৫ আগস্ট নিউইয়র্কের রকল্যান্ড সেমেট্রিতে। অসুস্থতা, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অবশেষে কবি আলেয়া চৌধুরী অনন্ত নিদ্রায় বিশ্রাম গ্রহণ করেছেন। শ্রদ্ধা ও স্মৃতিতে তিনি চিরস্মরণীয় থাকবেন।
-নিউইয়র্ক