একটি ছোট্ট নতুন গল্প

ব্রুনাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্মেলন শেষ করে এক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরে আসছি। পথিমধ্যে স্থানীয় সময় রাত এগারোটায় সিঙ্গাপুরের ‘চ্যাঙ্গি’ বিমানবন্দরে ইস্তাম্বুলের উদ্দেশ্যে টার্কিশ এয়ার লাইন্সের বি-৭৭৭-এর পেটের ভিতর ‘ইকোনমি ক্লাসে’ বসে আছি। যাত্রীরা একে একে উঠে আপন আপন আসন গ্রহণ করছেন। কেউ বাক্সপেটরা চাকার ওপর ভর করে টেনে টেনে আনছেন। কারও বুকেপিঠে মালসামান বানরের মতন লটকে রয়েছে। কারও কাঁখে দুধের শিশু হেসে হেসে সম্মুখ থেকে পেছনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। হঠাৎ যেন লাল পিঁপড়ার কামড় খেয়ে চিৎকার করে উঠল! কী থেকে কী হল, কিছুই বুঝতে পারলাম না। নিষ্পাপ শিশুটির কান্না থামতে না থামতে আমার চোখের সামনে আরেক অঘটন ঘটে গেল। এক ভদ্রলোকের হাত ফস্কে উপরের ‘বিন’ থেকে একটি কাপড়ের গাট্টি গলে পড়ল। পড়ল তো পড়ল অশীতিপর বৃদ্ধার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। তিনি ব্যথায় আহ উহ করতে লাগলেন! জীবনের গতি এতই প্রবল, কারও পেছন পানে ফিরে তাকানোর সময় নাই। অথচ কে আগে উঠে কার আসনে বসে পড়ল, তা নিয়ে বচসা করার ফুরসৎ ঠিকই মিলল। এভাবে ৩০/৪০ মিনিটের মধ্যে ক্যাবিনের ভিতর যাত্রীদের কর্মচঞ্চল অস্থিরতা সব থিতু হয়ে গেল। সবাই সোজা হয়ে বসলেন, কোমরে বেল্ট বাঁধলেন, কান খাড়া করে রলেন। বিমান যে কোনও মুহূর্তে আকাশে ডানা মেলার আগে মাটিতে তুমুল বেগে দৌড় মারবে।
এমন সময় চিফ অফ ক্যাবিন ক্রু আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং নাম ধরে বললেন, ‘মি. আকাশ, হাও আর ইউ? ইফ ইউ নিড এনিথিং, প্লিজ লেট মি নো’। অনেক ক্ষণ ধরে ভাবলাম, ভদ্রমহিলার এমন আচমকা আচরণের হেতু কী, কিছুই বোধগম্য হল না। পরে এক বার তার সামনাসামনি হলে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মে আই নো দ্যা রিজন ফর ইউর স্পেশাল অ্যাটেনশন টুওয়ার্ড মি? তিনি উত্তরে যা বললেন তার অর্থ এই রকম দাঁড়ায় – ইউ আর ‘ওল্ড’, নো, নো – ইউ আর ‘গোল্ড’, ইউ আর ‘এলিট’। এইবার আমার কাছে সব রহস্য খোলাসা হয়ে গেল। টার্কিশ এয়ার লাইন্স, ‘স্টার এলায়েন্স’-এর সদস্য। আর আমি ‘স্টার এলায়েন্স গোল্ড ক্লাব’-এর সদস্য। সময় যতই বয়ে যেতে লাগল, ততই বোধ করলাম, কোনও এক অলৌকিক ইশারায় আসমানে নতুন আরেক রহস্য দানা বাঁধতে শুরু করেছে! এগারো ঘন্টা ধরে বিমান মেঘের উপরে ভেসে বেড়াল, খাওয়াদাওয়া, দেদারসে জলপানির এস্তেমাল চলিল, মহিলার এক দণ্ড সময় হল না – আমার খবর নেয়ার। ইতোমধ্যে উড়োজাহাজ ইস্তাম্বুলের উপর ঘন সাদা মেঘের পাহাড় ভেদ করে নিচে নামছে। এমন সময় তিনি কোথা থেকে আবার আমার সামনে এসে উদয় হলেন। এ বার লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে বলে বসলেন, ‘ইট হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ টার্কিশ এয়ার লাইন্স, আই অ্যাম গিভিং ইউ দিস লিট্ল গিফ্ট ইন মাই ভেরি পার্সোন্যাল ক্যাপাসিটি’। এই বলে আমার দিকে একটি লাল তাজা গোলাপ এগিয়ে দিলেন। আমি কোনও কিছু বুঝে উঠার আগেই সুনিপুণভাবে তিনি ফুলটি আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখি গোলাপের গোড়ায় স্কচটেপে সাঁটা একটি চিরকুট যেখানে লাল কালিতে লেখা মহিলার নাম-ঠিকানা আলো-আঁধারির মাঝে ঝলমল করে জ্বলে উঠছে! আর আমার হৃদস্পন্দন বাড়িতে বাড়িতে থেমে যাবার উপক্রম হচ্ছে! হাত পা কাঁপছে! কোন অশুভ ক্ষণে কী ঘটছে, কিছুই বুঝতে পারছি না! ভেবে লাভ কী, কপালে যা আছে আজ তাই হবে! বোকার মতন কী মনে করে তখনকার মতো গোলাপটি পকেটে পুরে নিলেম। বিমান বিকট আওয়াজ তুলে জমিনে পা রাখল। মুহূর্তের মধ্যে আমার ব্যক্তিগত সঙ্কট এতই তীব্র হয়ে উঠল যে, সকলের জন্য অবতরণকালীন মহাসঙ্কটের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম! আমার বাকি পথের দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ কেমন গেল তা যাঁরা বুঝবেন তাঁরা তো বুঝবেনই, আর যাঁরা বুঝবেন না তাঁদের মনের বোঝা আর বাড়াতে চাই না।
বাড়ি এসে বিচিত্র পথের সচিত্র বয়ান গিন্নিকে সব খুলে বললেম। জ্যান্ত গোলাপের জান কোরবান করার জন্য তাঁর করকমলে সঁপে দিলাম। আমার কথা শুনে তিনি নির্বাক নিশ্চুপ হয়ে রলেন, যত্ন করে ফুলটি উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখলেন, অজানা অচেনা প্রেম বিনোদিনীর ঠিকানাটি মনে মনে মুখস্থ করতে লাগলেন। এর মাঝে দেখলাম দুই-এক ফোঁটা অশ্রু ডান দিকে কপোল গড়িয়ে পড়ল। গল্পটি এই খানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু হল না। কান্নার সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে মুচকি হাসির আভা সবকিছুকে রহস্যাভৃতই করে রাখল!
অধ্যাপক – টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ।