একটি পয়সা রঙিন

নুসরাত নুসিন :

স্যাঁতসেঁতে গলির দেয়ালে ফোকরে ফাঙ্গাল ইনফেকশন। সারি সারি দেয়াল পলেস্তারাহীন ও বাতাসবিহীন। চোখ পড়লেই জঘন্য লাগে। এই গলির দেয়ালগুলো যদি কোনো মেয়েমানুষের চর্ম হতো তবে ভুলেও কেউ আসত এ দিকে? কেন আসবে? রোগ ও ক্ষুধাগ্রস্ত মানুষের মূল্য আছে নাকি শহরে। শহরে কেন, কোথাও নেই। এই কথা সবাই জানে। জলাবদ্ধ রাস্তায় একেকটি ইটের ওপর পা ফেলতে এত কসরত করতে হয় আর সেটা নিমেষেই ছোটবেলার কুতকুত খেলার কথা মনে করিয়ে দেয়। সুউচ্চ অট্টালিকার নগরে এত নোংরা মানায়? তবু এখানে পথে পথে নোংরা, ভাঙা ইট-খোয়া, জলাবদ্ধতা মানুষের পায়ে পায়ে মিশে রয়েছে। বৃষ্টির দিনে কাদার মহিমা চটাৎ চটাৎ জুতোর পেছনে মুহূর্তেই লেপ্টে দেবে পায়জামার নিম্ন অংশ। তারপর ঘরে দ্রুত ফেরো আর কাদাপানি পরিষ্কার করো। বাঁকানো গতিপথের মতো চিকন গলিটা ফার্মগেটের ভিড়ে গিয়ে ঠেকেছে।

আজ পয়লা বৈশাখ বলে ঝলমলে ব্যাপার সারা ঢাকা শহরে অথবা মানুষের ভেতরে। অথবা সব মানুষের ভেতরে নয়, কেবল অফুরন্ত সময় হাতে আছে যাদের তাদের। কেননা, এখন সকাল ৮টায় বেরিয়ে যারা কারখানা বা অফিসে যাচ্ছে রঙিন পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরার সময় তাদের নেই। অথবা টাকা কই? সারি সারি মেয়ে বিবর্ণ, পুরনো সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে গার্মেন্টে যাচ্ছে। একবার এই শহরের মাস্তান লোকের বউ বলেছিল, এক কাপড় বহুদিন পরতে পারি না। তা পারে না। একই মেকআপ আর লিপস্টিক প্রত্যহ লাগানো যায় ঠিকই। তা লাগাক। সে আলাদা দুনিয়ার। এখানে তার গল্প বলা অর্থহীন। এই সদর রাস্তায় সকালবেলা সারি সারি জনারণ্য দেখতে দেখতে মানুষ বিষয়ে যে কারও প্রথমে অবিচলিত বোধের সৃষ্টি হবে। কেউ ভাবতে পারে, এত মানুষ? গভীরভাবে খেয়াল করলে সবাই ক্ষুদ্র আর সমর্পণে ভরা। ফুটপাথে দ্রুত পায়ে কর্মের তাগিদে হাঁটছে আর জনবহুল ধাক্কাধাক্কির ভেতর এগোচ্ছে প্রাণপণ। তারা এইভাবে প্রাণ নিয়ে এগিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের দিকে।
এই ভিড়ের গহ্বরে সাগিরাও হাঁটছে। জানে না কোথায় কাজ পাওয়া যাবে আর আজ কোথায় সে যাবে। ফলে এই মানুষগুলোর মতো তার হাঁটার কোনো গন্তব্যস্থল নেই। শহরটি এত বড়; কিন্তু কাজের জায়গা কত ছোট। নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়Ñ এই কথা সে কোথাও শুনেছিল। কিন্তু কাজ না থাকলে বড় আকাশ দিয়ে কী হয়? দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া। সাগিরা পথের দু’ধারের দেয়ালে তাকায় চাকরির বিজ্ঞাপনে। সাদাকালো এ ফোর সাইজের কাগজের বেতন আর শর্তগুলো যে মিথ্যে, গত কয়েকদিনে জেনে গেছে। তবু সে টান টান দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকে সেই বিজ্ঞাপনগুলোর দিকেই বেশি তাকায়। এইচএসসি পাস যোগ্যতায় কোনো বড় পত্রিকায় চোখ রাখার সাহস তার নাই। আর বড় অফিসের ইন্টারভিউ দেয়ার মতো কাপড়ে এত উজ্জ্বলতাও তার নেই। সে বরং এইসব নগ্ন দেয়ালের বিজ্ঞাপনেই চোখ রাখে আর কোথাও নিশ্চয়ই একটা চাকরি বা কাজ পেয়ে যাবে, এই ভরসায় ফার্মগেটের সদর রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে।

লোকটা বদ আর শয়তানে ঠাসা। ফাঁকা রাস্তা, তবু তার মাজার কাছটায় ধাক্কা মেরে গেল। এই ধাক্কা ভুল করে নয়, ইচ্ছে করেই। সে যখন এই শহরে প্রথম আসে তখন ভিড়ের মধ্যে লক্ষ্য করে যে, কতকগুলো হাত তার দিকে এগিয়ে আসছে। ছুটন্ত সাপের মতো দ্রুতগতিসম্পন্ন। পলকেই স্তন, কোমর ছুঁয়ে যায়। এখনও তাকে যারা দেখছে সবাই তার মাজার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা আগেও সাগিরা লক্ষ্য করেছে। এখন তেমন বিচলিত আর হয় না সে। সে হাঁটে আর বিজ্ঞাপনের নম্বরে ফোন করতে করতে পৌঁছে যায় গলিঘুপচির ভেতরে ঝুলপড়া তিনতলা একটি বাসার সামনে। ফোনের নির্দেশ অনুযায়ী সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে তারপর।

সিগারেটের মাথা, কফ, বালু আর নোংরা আঁকাআঁকিতে ভরা সিঁড়ি। দেয়ালে ফোন নম্বর, স্তনের মতো বৃত্ত, তার ওপর কাটাকুটি, এক রকম বৃহৎ খেলাধুলা। কারা আঁকে এসব? নিশ্চয়ই কোনো মেয়েমানুষ আঁকেনি?

সিঁড়ি সরলরেখার মতো উঠে গেছে ওপরের দিকে কিন্তু চিকন আর বদ্ধ। একের অধিকজন ওঠার উপায় নেই। শহরের উদার ফোলানো পেটের গহ্বরে এ রকম সরু নালির মতো সিঁড়ি সাগিরা আগে দেখে নাই। দ্বিতীয় তলাকে কর্মজীবী পুরুষদের মেস বলেই মনে হয়। পুরো ফ্লোর খোলা এবং কোনো কোনো পুরুষ মেঝেতে উদাম শুয়ে আছে সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে। মুহূর্তের মধ্যেই সাগিরা চোখ সরিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। যদিও এখন দিনের বেলা তবু এমন পুরুষময় ভবনে কোনো অনাগত ভয়ের আশঙ্কা তারে হৃৎপিণ্ডে ঢেউ দেয়। তবু দুঃসাহসে আর কিছুটা বিশ্বাসে সে একেকটা সিঁড়ি উঠতে থাকে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে যদি কোনো চাকরি সে সত্যিই পেয়ে যায়।
তৃতীয় তলায় উঠে যায় আর সেখানে পুরুষ নয়, দেখা মেলে কতকগুলো কিশোরী মেয়ের। তারা হেলেদুলে নিজের ঘর বিছানায় বসছে, হাসছে, গল্প করছে। কেউ গোসলে যাচ্ছে। একটি থলথলে মহিলা বাচ্চাকে তার ঢাউস স্তন পান করাচ্ছে। আর খানিক পরপর ঈষৎ ঝুঁকে ঝুঁকে বটির আগায় কচুর তরকারি কাটছে। মহিলা তার আসার কারণ জিজ্ঞাসা করে। সাগিরা ফোনের লোকটির কথা বলে। মহিলা জানান, উনি তার স্বামী।

-আপনার নাম কী?
-সাগিরা।
-মোড়ক তৈরির কাম। গতর খাটাতে পারবেন?

সে এইচএসসি পাস করেছে। ভালো ছাত্রী বলে এলাকায় সুনাম আছে। ফলে এই কাজ সে কেন মেনে নেবে? একটা মানানসই কাজ কেন সে পাবে না? অতটা কষ্ট গ্রামে সে কখনও করে নাই। এই কঠিন কর্মের দুনিয়া তার অচেনা। সে নিজের কাছে সৎ, সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র। তাহলে কেন সে একটি ভালো চাকরি পাবে না? না হয় তার এই শহরে কেউ নেই, তাই বলে কি সে নিজের যোগ্যতায় একটি কাজ পাবে না? কী অদ্ভুত! এইচএসসি পাস করে তাকে মিষ্টির দোকানের মোড়ক বানাতে হবে। আর যেটুকু উজ্জ্বলতা আছে দেহে, সেটি অল্প কিছুদিন পর বিলীন করতে হবে। না, এইসব ক্ষুদ্রত্ব ও অনুজ্জ্বলতা আর ভাবতে পারে না। সে মহিলার সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে মনে তিক্ত তেজ নিয়ে একটানে নিচে নেমে আসে আর আরেকটি অচেনা চিকন গলির ভেতরে ঢুকে পড়ে।

গলির ভাঁজে নর্দমার ওপরে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফোঁকে চ্যাংড়ার দল। চা-সিগারেট আর গল্পেপ্প মত্ত তারা। সাগিরা শরীরের ভাঁজের কাপড় ঠিক করে নেয়। এই চ্যাংড়া দল যখন বড় হয়ে মধ্যবয়স্ক হবে তখনও তারা এমনই থাকবে। সামনে দিয়ে যে মেয়েই যাক, তাকে নিয়ে কথা তাদের বলতেই হবে। সমালোচনা আর মেয়েমানুষ ছাড়া আর গল্প আছে নাকি! চ্যাংড়া দলের সামনে দিয়ে যেতে সব মেয়েরই অস্বস্তি হয়। তবু হেঁটে যেতে হয়। যুবকরা তার মাজার দিকে চেয়ে থাকে আর সাগিরা তাকায় সামনের দিকে। অতি সন্তর্পণে হেঁটে বড় রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায়। আবারও সে বিজ্ঞাপন খোঁজে। বিজ্ঞাপনের দেয়াল খোঁজে। কিন্তু কোনো বিজ্ঞাপন আর চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে খুবই উজ্জ্বল সুন্দর নারী ও পুরুষ। বৈশাখের সাজে ও আনন্দে ভরে রেখেছে রাস্তা, হুডখোলা রিকশা। উজ্জ্বল তারা, সাজপোশাক সুন্দর। আর সেই সুন্দর তাকে আনন্দিত করার চেয়ে সুচের মতো বিঁধছে।

সে মলিন। তার জগৎ বড়ই মলিন। এইসব উজ্জ্বলতা তাকে আঘাত করে। তার ক্ষুধাক্লান্ত প্রাণ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
হাঁটতে হাঁটতে তার প্রাণ ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে পাঁচ টাকার কয়েন বের করে আর রাস্তার কোনায় যে ক্ষুদ্র স্যাঁতসেঁতে খাবার হোটেলখানা রয়েছে সেখানে শিঙ্গাড়া চায়। পাঁচ টাকায় শিঙ্গাড়া হোটেলবয় দেয় বটে; কিন্তু ক্যাশের ম্যানেজার হেসে তাকায়। এই শহরে পাঁচ টাকায় কেউ খাবার কেনে কি না তা সাগিরা জানে না। কিন্তু ম্যানেজারের সে হাসি ক্ষুরধার অপমান হয়ে সাগিরার সমস্ত শরীরে ক্রোধের আগুন ছড়িয়ে দেয়। সে প্রথমে গজগজ করে দ্রুত হাঁটতে থাকে আর তারপর অপমান অসহায়ত্বে পরিণত হলে হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে আসে। পা আর আগায় না। পা যতটা না দুর্বল হয়ে উঠছে তার থেকেও বুকের ভেতরটা শক্তিহীনতায় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। মøান লাগছে নিজেকেই। তার ওপরে এই শহরের পথঘাট এত নোংরা! বিশ্বভরা নোংরামি। কেউ গতরে উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে চলেছে আর কেউ গতর খাটিয়ে মরবে! ফুটপাথে যত মানুষ দেখা যায় তারা অনুজ্জ্বল আর যারা সুউচ্চ ভবনের ভেতরে ঢুকে আছে তাদের দেখা যায় না। তারা সূর্যের রোদের রঙ জানে কি?
সাগিরা সবজিগলা দুর্গন্ধময় রাস্তাটা পেরিয়ে যখন বড় রাস্তার নিচে প্রজাপতি গুহার ভেতর ঢুকল, তখন চোখ একটু আরাম পেল সব চিত্রকর্ম দেখে। এইসব বিখ্যাত চিত্রকর্মের দিকে কেউ তাকাচ্ছে বলে মনে হয় না। সবাই ছুটছে। গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে যখন সে স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়াল তখন সবচেয়ে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ল। তেতে উঠল চোখ। সে থমকে দাঁড়াল আর অকস্মাৎ আরও শক্তিহীন হয়ে গেল। যেটুকু শক্তি তার দেহে সঞ্চিত ছিল সেটুকু আগেই লুপ্ত হয়েছে আর এখন বাকিটুকুও অকস্মাৎ নাই হয়ে গেল। জনবহুল রাস্তায় সে পাথরখণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সূর্যটা মাথার ভেতরে দমাদম তেজ ছড়াল। সূর্যের তাপ ও রঙ আসলে মরণের। সে মরে যাচ্ছে না জীবিত আছে, এই বোধ উন্মত্তের মতো তাকে গিলতে থাকে। সে তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে আরেকটি ক্ষুধার্ত মহিলাকে।

ক্ষুধার্তের চোখে ক্রুশবিদ্ধের যন্ত্রণা থাকেÑ কে বলে? যাবতীয় ক্ষুধার বিপরীতে ওই চোখ আশ্চর্য শান্ত। কাবাবের সামনে যে ড্রেনটি প্রধান রাস্তা ধরে প্রজাপতি গুহার দিকে গেছে, সেখানে ফেলে দেয়া হাড়ের মাংস কালো স্রোতের মধ্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে মহিলা। একটি হাড় পেলে তার গায়ে লেগে থাকা সামান্য মাংসটুকু সে দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হাড় থেকে একটু-আধটু অংশ খুলে পড়ছে কি পড়ছে না, তা বোঝা যায় না। কিন্তু পরম তৃপ্তিতে মহিলার চোখ বুজে যাচ্ছে। মহিলার এক চোখে মায়া, অন্য চোখ স্থির। বরং সাগিরার চোখেই যেন এক অনন্তের ক্ষুধা ঝলসে উঠল। আহা, এক টুকরো মাংস!

নর্দমার দিকে তাকিয়ে সাগিরার মাথা ঘুরে যায়। এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক দৃশ্য নয়। কিন্তু রাস্তার এত মানুষ একবারও মহিলার দিকে তাকাল না। মহিলাটি মাংসের প্রতি ক্ষুধার্ত আর তার এই ক্ষুধার প্রতি কারও সহানুভূতি নেই।
ক্ষুধার প্রতি সহানুভূতি না থাকলে থাকে তবে কিসের প্রতি? এত ক্ষুধা চারপাশে, সাগিরা আগে বোঝে নাই। ক্ষুধা অনেকভাবে ক্ষুধার্তের চোখে-মুখে লেগে থাকে। তবে এটা ঠিক যে ক্ষুধার্তের কোনো লজ্জা নেই। বিশাল ভবনের সামনে ফুটপাথে যারা বসে রয়েছে, তাদের কারোরই গায়ে কোনো পোশাক নেই। পোশাকহীন মানুষের ক্ষুধা দেখতে পাওয়া খুবই সহজ; কিন্তু কেউ দেখবে না। যেমন এই ক্ষুধার্ত মহিলার দিকে কেউ তাকিয়ে নেই। আজ যদি সে চাকচিক্যময় মেয়েমানুষ হতো বা গতরে শক্তিশালী, তাহলে কেউ চোখ ফেরাত? সাগিরার নিজের এখনও কিছু শক্তি আছে বলে তার দিকে তো সবাই তাকাচ্ছে, এমনকি যেতে যেতে পেছন ফিরেও। হাস্যকর! মহিলার ক্ষুধার দিকে না তাকিয়ে তার দেহের দিকে তাকিয়ে আছে সব।

আরেকটি বড় গলির মধ্যে সে এসে পড়ল। এখানে কোনো ফাঙ্গাস নেই দেয়ালে, কোনো ভাঙা ইট খোয়া নেই। সব পরিষ্কার আর তকতকে পরিপাটি। এখানকার দেয়ালগুলোতে কোনো বিজ্ঞাপন কাগজও নেই। সে গলির দিকে আরেকটু এগোল আর দেখল এইসব গলিতেও গেট থাকে। আর সেই গেটের মাঝখানে গেটম্যান দাঁড়িয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই গেটম্যান রহস্যময় হাসি হাসে।
গেটম্যান হয়তো ভুল ভাবছে সাগিরাকে। সে কেবল কাজ খুঁজতে বেরিয়েছে। অন্য কিছু নয়। সে সৎ ও ভদ্র। এখানে সে ঢুকেছে সুন্দর বাড়িগুলো দেখতে। কিন্তু সামনে সে আগাতে পারে না। কেননা, এই গলিগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। বরং দূর থেকেই বাড়িগুলো দেখতে হয়। এই বাড়িগুলো যতটা সুন্দর, ভেতরের মানুষগুলো কি তার চেয়ে আরও সুন্দর?

সে এগোতে পারে না অনিন্দ্যসুন্দর রাস্তায়। রাস্তার মাঝখানে গেট; এরা এভাবেই অফিসে, বাড়িতে ব্যারিকেড দিয়ে রাখে। তারা ব্যারিকেড দিয়ে রাখে সবখানে, যাতে কেউ সেই দুনিয়ায় ঢোকার অধিকার না পায়। সে এখানকার দেয়ালে কোনো বিজ্ঞাপন পায় না। তাকে যেতে হবে অনেক বেশি নোংরা, ঘুপচি যেসব গলিÑ সেসব গলিতে। সেসবই তার জন্য। অজস্র কাজের বিজ্ঞাপন ঝুলে থাকে সেইসব দেয়ালে।
আশ্চর্য, এইসব সুন্দর রাস্তায় কেউ কারও চোখের দিকে তাকায় না। তাকায় না যদিও, তবু তার লজ্জা লাগে। সে দেয়ালে যা খুঁজছে তা উজ্জ্বল মানুষরা কেউ খোঁজে না। এইসব দেয়ালের পাশেও তাকে দরিদ্র দেখাচ্ছে। তা দেখাক। মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে একেকবার দেয়ালের দিকে তাকায়। জগতের সমস্ত লজ্জা যেন তার একার। ক্ষুধার্তের লজ্জা বেশি।
হঠাৎ সাগিরার চোখ পড়ল এক ভবঘুরের দিকে। পাগলের বেশে পয়সার থালা হাতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে স্পষ্ট আহ্বান। একবার চোখ টিপল সাগিরার দিকে তাকিয়ে।