একটি রূপকথার গল্প

এক.
পাখির দোকানে এক তরুণী গিয়ে হাজির। উদ্দেশ্য পাখি কেনা। তবে পাখির দাম শুনে সে অবাক। সে জানত দোকানে কিনতে গেলে পাখির দাম নাকি অনেক। কিন্তু পাখির দাম এত কম হয় নাকি! এই মুহূর্তে একটা বিরল প্রজাতির তোতা পাখির দাম শুনে সে সত্যিই হতবাক হয়। অবাক হওয়ার কারণ হলো এটি আবার কথা বলতে পারা তোতা পাখি! সে বিস্মিত গলায় দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে- ‘ভাই, এই পাখিটার দাম এত কম!’
দোকানদারের জবাব-
‘সময়েই কইবো দাম কেন কম!’
‘মানে?’
‘মানে, যে কিনবে সেই বুঝবে এই পাখিটার দাম কেন এত কম।’
‘এটা কোন কথা!’
‘তাইলে আপনিই অর লগে কথা বলেন। বলবেন?’ দোকানদারের সম্মতি পেয়ে সুন্দরী তরুণী পাখিটির সামনে দাঁড়ায়, প্রশ্ন করে-
‘হ্যালো তোতা পাখি, তুমি কেমন আছ?’
‘ভালো আছি।’
‘আচ্ছা বলত আমি কেমন মেয়ে?’
‘তুই তো একটা দুশ্চরিত্রা রে!’
‘এমা ছি ছি! এই পাখিটা বলে কি? ও দোকানদার ভাই, এ তো ভারি বেয়াদব।’ দোকানদার হাসতে হাসতে বলেÑ
‘আপা আপনেরে তো আগেই কইছিলাম এই তোতা একটু ঘাউরা কিছিমের। একটু দাঁড়ান, অর ব্যবস্থা আমি লইতাছি।’ বলতে বলতে দোকানদার পানি ভর্তি বালতিতে পাখিটাকে একটা চুবান দিয়ে ছেড়ে দেয়। তোতাটা চুবান খেয়ে একটু পর পর মাথা ঝাড়তে থাকে। দোকানদার তরুণীকে ইশারা করে বলে- ‘আপা এবার কথা বলেন তো দেখি।’ তরুণী দ্বিতীয়বারের মতো পাখিটির খাঁচার সামনে দাঁড়ায় এবং প্রশ্ন করতে শুরু করে-
‘আচ্ছা তোতা, তুমি বল রিক্সায় যদি একটা বয়স্ক লোককে আমার সঙ্গে দেখা যায়, তা হলে লোকটা আমার কে হবে?’
‘আপনের বাবা।’
‘ভেরি গুড। এবার বল পার্কে যদি একটা ছেলের সঙ্গে আমাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়, তা হলে সে আমার কে হবে।’
‘আপনের বয়ফ্রেন্ড।’
‘আচ্ছা বেশ। বল তো দেখি সাজগোজ করে আর একটা লোকের সঙ্গে আমি যদি কোন দাওয়াতে যাই, তা হলে সে আমার কে হবে?’
‘আপনের স্বামী হবে।’
‘ভেরি ভেরি গুড। আর একটা মাত্র প্রশ্ন করব। তুমি বল অনেক রাতে যদি ফোনে একটা লোকের সঙ্গে আমি ফিস ফিস করে কথা বলি, তা হলে লোকটা আমার কে হবে?’
‘ওটা তোর নাঙ হবে রে বেটি, নাঙ!’ এটুকু বলে ময়না পাখিটি চিৎকার করে দোকানদারকে ডাকতে থাকে-
‘ওই দোকনদার, জলদি মাথায় পানি ঢাল রে শালা। তোরে তো আগেই কইছিলাম এই বেটির চরিত্রের ঠিক নাই।’ তোতাটি চিৎকার করে আরও কি কি সব বলতে থাকে। দোকানদার দৌড় দিয়ে খাঁচাসমেত পাখিটিকে দোকানের পেছনে রেখে আসে। এরপর তরুণীর কাছে মাফ চেয়ে বলতে থাকে- ‘আপা, কিছু মনে কইরেন না। ওর এই ব্যাত্তমিজির জন্য ওকে কেউ কিনতে চায় না। ‘কোন সমস্যা নেই। তার পরও ওকে আমি কিনব’- তরুণী উত্তর দেয়। এরপর নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দাম দিয়ে তরুণী কথা বলা তোতাটিকে কিনে নেয়।
রাস্তায় পাখিটি এক প্রকার শান্তই থাকে। কোন উল্টাপাল্টা কথা বলে না। মাঝখানে একবার ফিসফিসিয়ে মন্তব্য করে- ‘আপা, আমারে কেনা আপনের ঠিক হইল না।’ ‘কেন, তোমারে কেনা ঠিক হলো না কেন?’ -তরুণী আগ্রহ ভরে জানতে চায়। ‘কেন আবার। আমার কথাবার্তার লাইন বেলাইন নাই। কখন যে কি কইয়া ফালাই!’- তোতাটি বিমর্ষ হয়ে উত্তর দেয়। তোতার ভাবভঙ্গি দেখে তরুণী আপন মনে হাসতে থাকে। তরুণীর হাসি দেখে তোতা রাগী চোখে তাকায়। পাখিটির রাগ দেখে তরুণীর আরও হাসি পায়। তরুণীর হাসির শব্দে রিক্সাওয়ালা বার বার পেছন ফেরে। শেষে আর থাকতে না পেরে জানতে চায়- ‘আপা, একা একা হাসেন ক্যান?’ তরুণী কিছু বলার আগেই জবাব আসে- ‘ওই ব্যাটা, আপা হাসে ক্যান এইটা কি তোরে কইতে হইবো রে? তোর চোখ সামনে তুই সামনে তাকা, বার বার পিছে তাকাস ক্যান?’ মেয়েটি এবার খিল খিল করে হাসতে থাকে। কে কথা বলল? কে কথা বলল?- বলতে বলতে রিক্সাওয়ালা ভয় পেয়ে রিক্সা থামায়। মেয়েটি অভয় দেয়ার ভঙ্গিতে বলে- ‘রিক্সাওয়ালা ভাই, ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আমার এই পাখিটাই এতক্ষণ কথা বলছিল।’ রিক্সাওয়ালা অবাক হয়ে তোতাটির দিকে তাকায়। তোতাটি তখনও পর্যন্ত চোখ লাল করে তাকিয়ে থাকে। রিক্সাওয়ালা ভয় পাওয়া গলায় বলে- ‘আপা, আমারে ছইড়া দেন। আমি আর যামু না।’ বলতে বলতে রিক্সাওয়ালা পাখিসমেত তরুণীকে নামিয়ে দিয়ে ভাড়া না নিয়েই দ্রুতবেগে চলে যায়। মেয়েটি অপ্রস্তুত হলেও খুব একটা সমস্যায় পড়ে না। কারণ তাদের বাসা সামনেই। সে হেলতে দুলতে পাখিটিসমেত বাসার দিকে রওনা দেয়।
দুই.
কোয়েকাফ নগর। নগরের ভেতরে-বাইরে বিষাদের ছায়া। কারও মন ভাল নেই। কেননা প্রাসাদের অবস্থা দুঃখবহ। শান্ত্রী প্রহরী সকলেই তটস্থ। দাসদাসীরা ভীষণ অস্বস্তিতে আছে। বাদশাহ থেকে থেকে ভীষণ গর্জন করছেন। রানী মা মাথা নিচু করে কাঁদছেন। শাহজাদারা নাঙা তলোয়ার হাতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকলেই চিন্তিত। কারণ একটাইÑ বাদশার নয়নের মণি শাহজাদী যুবাইদা আজ তিন দিন হলো তার কক্ষে স্বেচ্ছা বন্দিত্ব গ্রহণ করেছে। নাওয়া-খাওয়া তো দূরের কথা সে কারও সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করছে না। আর সে আহার-বিহার করবেই বা কেমন করে! আজ কয়েকদিন হলো তার সর্বক্ষণিক সহোচর প্রিয় তোতা পাখিটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম দুদিন রানী-মাতা তাকে সান্ত¦না দিয়েছিলেন- দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই যুবাইদা। তোমার তোতা যেহেতু একা একা এখানে সেখানে ঘুরতে পছন্দ করে, তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে ঠিক চলে আসবে। কিন্তু সপ্তাহান্তেও যখন তোতা ফিরে এলো না; তখন মনের দুঃখে শাহজাদী সেই যে দরজা বন্দ করে অন্তরালে গেল আর বাইরে আসার নামটি করছে না। মাত্র একবারই শুধু দাসী রাদিসাকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে- তোতাকে কাছে পেলেই কেবল সে দরজা খুলবে। না হলে কখনই নয়। শাহজাদীর এ ঘোষণায় বাদশাহর সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের প্রজাকুলও নিদারুণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কারণ শাহজাদী যুবাইদা তাদের সৌভাগ্যের প্রতীক। শাহজাদী যে বার হাসিখুশি থাকে সেবার বসন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর শাহজাদী মন খারাপ করে থাকলে শীতকাল যেতেই চায় না। সামনে আসন্ন শীত, তার আগেই শাহজাদী স্বেচ্ছা বন্দিত্ব গ্রহণ করেছে। এবার যে কী হবে- এই ভেবে প্রজাকুলও দিশেহারা। তবে কাজীর পরামর্শে প্রজারা সকলেই শাহজাদীর তোতাপাখি খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে সবখানেই তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাদশাহ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। বলা হয়েছে- যে বা যারা শাহজাদীর তোতাকে খুঁজে দিতে কিংবা সন্ধান যোগাতে পারবে তাকে বা তাদের তিন-তিনটি ইচ্ছা পূরণ করা হবে। কিন্তু প্রজারা পুরস্কারের আশায় নয় বরং তারা ইতোমধ্যেই স্বপ্রণোদিত হয়ে শাহজাদীর প্রাণপাখির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে।
এদিকে পক্ষিকুলের মধ্যেও থমথমে ভাব বিরাজ করছে। তারা বিশেষ সঙ্কেত প্রচারের মধ্য দিয়ে দ্রুত এক জরুরী সভার আয়োজন করে। সভায় কোয়েকাফ নগরের সব শ্রেণীর পক্ষিকুল উপস্থিত হয়। পাখিদের প্রত্যেক গোত্রের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে রাজকীয় তোতা নিখোঁজ হওয়ার তীব্র নিন্দা জানায়। কেউ কেউ এটাকে তাদের জীবন ও নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি বিরাট এক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা দ্রুত এ ব্যাপারে করণীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আর্জি জানায়। পক্ষিকুলের দলনেতা সকলের বক্তব্য ও মতামত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত জানায়। তিনি দ্রুত সকলকে রাজ্যের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়তে বলেন। সেই সঙ্গে তিনি এও নির্দেশ দেন যে, কেউ যদি কোন ভাবে কোন সূত্রে রাজকীয় তোতার সামান্যতম তথ্যও যোগাড় করতে পারে; তাহলে সে যেন কালবিলম্ব না করে প্রাসাদের পক্ষিবিশারদের কাছে সে সংবাদ পৌঁছে দেয়।
পক্ষিকুলের এমন তৎপরতার জন্যই নিখোঁজ হওয়া রাজকীয় তোতার একটি সংবাদ পাওয়া সম্ভরপর হয়। সেই সংবাদের ভিত্তিতে প্রাসাদে মন্ত্রী-সান্ত্রী ও সভাসদরা জড়ো হন। সেনাপতি বাদশাহকে জানায় যে- ‘আলম্পনা, জানা গিয়েছে যে, আমাদের তোতা কিছু অতিথি পাখির সঙ্গে ভ্রমণের প্রাক্কালে দিক ভুলে রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরের দিকে চলে যায়।’ এটুকু শুনেই বাদশাহ হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন- ‘এই সংবাদের জন্য এ সভার আয়োজন করা হয়েছে? রাজকীয় তোতার সর্বশেষ সংবাদ বল?’ পক্ষিবিশারদ বিনয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলে- ‘গোস্তাকি মাফ করবেন জাহাপনা, আমাদের রাজকীয় তোতা ধৃত হয়েছে।’ ‘কী বললে সাবধানে বল’- রাগে, ক্রোধে বাদশাহ সিংহাসনে দাঁড়িয়ে পড়েন আর কি! পক্ষিবিশারদ জানায়- ‘জি আলাম্পনা অতিথি পাখিদের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের উখিয়া নামক অঞ্চলে ভ্রমণের সময় এক রোহিঙ্গার হাতে আমাদের রাজকীয় তোতা ধৃত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সেই রোহিঙ্গা রাজকীয় তোতার গলার হার খুলে নেয় এবং সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দেয়।’ এটুকু শুনেই বাদশাহ চিৎকার করে সেনাপতির কাছে জানতে চায়-‘ সেনাপতি, এই রোহিঙ্গা কারা? এদের এত সাহস এরা কোয়েকাফ নগরের রাজকীয় তোতা ধরে সওদা হিসেবে বিক্রি করে! এদের এখনই ধ্বংসের ব্যবস্থা করা হোক।’ প্রধান সেনাপতি দাঁড়িয়ে নরম সুরে জানায়- ‘জি আলম্পনা, রোহিঙ্গা হচ্ছে সেই জাতি যারা সব কিছু নিয়ে ব্যবসা করে। ওরা একটি পলায়নপর ও উদবাস্তু জাতি। এই মুহূর্তে ওরা উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশ রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নিয়েই ওরা বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের ব্যবসা শুরু করেছে। আর অন্যান্য অপরাধ তো আছেই। গোস্তাকি মাফ করবেন জাহাপনা, আমরা চাইলেও রোহিঙ্গাদের আক্রমণ করতে পারব না। কারণ রোহিঙ্গারা জাতিতে মুসলমান। আর কোয়েকাফের সালতানাতের নিয়ম অনুযায়ী কোন মুসলিম জাতি অন্য কোন মুসলিম জাতির ওপর আক্রমণ কিংবা কোন রূপ ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাছাড়া বাংলাদেশ রাজ্যের প্রজারা যেখানে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাহলে সেখানে আমরাই আর কি ব্যবস্থা নেব জাহাপনা?’ কোয়েকাফের বাদশা সব কিছু শুনতে শুনতে হতাশ হয়ে পড়েন। তারপর সিংহাসনে বসেই তিনি বিমর্ষ স্বরে জানতে চান- ‘তাহলে আমাদের তোতাকে কি আমরা কোন দিনও ফিরে পাব না?’ ‘অবশ্যই পাব জাহাপনা’- সহসা দাঁড়িয়ে উত্তর দেয় পক্ষিবিশারদ। ‘আমরা যে করেই হোক আমাদের রাজকীয় তোতাকে উদ্ধার করবই করব।’
তিন.
লাবণ্য যখন খাঁচা সমেত সদ্য কেনা তোতা নিয়ে বাসায় ঢুকে তখন সে কারও কাছেই খুব একটা পাত্তা পায় না। অবশ্য পাত্তা দেয়ার মতো অবস্থায় কেউই নেই। সবাই গম্ভীরমুখে বসার ঘরে বসে আছে। লাবণ্যর বড় ভাইয়ের স্ত্রী ঘোষণা দিয়েছে সে আর এ বাড়িতে থাকবে না। দু-একদিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কারণ লাবণ্যর বড় ভাই এমদাদের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছে না। তাই সবাই বসার ঘরে বসেছে বিষয়টার মীমাংসা করার জন্য। কিন্তু লাবণ্যর ভাবির এক কথা সে আর কোন ভাবেই থাকবে না, যাবেই যাবে। তাই সবার মুখ ভার। এমন সময় লাবণ্য তোতা পাখি সমেত বসার ঘরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে- ‘ভাবি, তুমি এখনও যাও নাই! তোমার না সকালেই যাওয়ার কথা?’ বলতে বলতে লাবণ্য সোফার এক কর্নার দখল করে। পায়ের কাছে নামিয়ে রাখে খাঁচাসমেত তোতাটাকে।
লাবণ্যকে মোটামুটি মাথা খারাপ মেয়ে হিসেবে সবাই জানে। তার বিচিত্র সব কর্মকা-ে বাড়ির লোকজন অভ্যস্ত। তাই লাবণ্যর তোতা পাখি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোটা এই মুহূর্তে কারও মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। লাবণ্যর মেঝো ভাই বেশ বিরক্তির স্বরে বলেÑ ‘লাবণ্য, তোর এসব জন্তু-জানোয়ার নিয়ে ভাগ এখান থেকে।’ লাবণ্য কিছু বলার আগেই কে যেন ওর হয়ে জবাব দেয়- ‘এই ছ্যামড়া কথাবার্তা সাবধানে ক। মেয়েদের সঙ্গে তুই তুকারি করস, তোর এত বড় সাহস!’ মোক্ষম জবাব শুনে লাবণ্যর হাসি আর কে দেখে! কে কথা বলে, কে কথা বলেÑ বলতে বলতে সবাই তোতাটার দিকে তাকায়। ওমা কি সুন্দর তোতা পাখি! এ দেখি কথাও বলতে পারে! এরপর সবাই তোতাটাকে ঘিরে ধরে। সবার প্রতিক্রিয়া দেখে লাবণ্য মিটমিট করে হাসে। মুহূর্তেই লাবণ্যদের বাসার গুরুগম্ভীর পরিবেশ বদলে দারুণ একটা হাসিখুশি পরিবেশ তৈরি হয়। পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে দেখে লাবণ্যর বড় ভাবি বলে ওঠেÑ ‘আপনারা যেহেতু কিছু বলছেন না। তাহলে আমি চলে যাই, কি বলেন আম্মা?’ এবার আম্মার হয়ে তোতা উত্তর দেয়- ‘ওই বেটি তুই বার বার যাইতে চায়াও যাইতাছস না ক্যান? তোর যেইখানে খুশি চইলা যা। তোরে তো কেউ বাইন্দা রাখে নাই!’ তোতার এ হেন কথায় হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। বড় ভাবি নিজেও হেসে ফেলেন। সেদিন থেকে তোতা লাবণ্যদের বাড়ির একজন হয়ে যায়।
এর মধ্যে লাবণ্যর সঙ্গে তোতার বেশ ভাব হয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই লাবণ্য তোতাকে নিয়ে বসে। ইতোমধ্যে তোতার একটা নামও দেয়া হয়েছে। এখন তাকে ডাকা হয় তোতা মিয়া বলে। তার থাকার জায়গা হয়েছে লাবণ্যর ঘরের বারান্দায়। মাঝে মাঝে তোতা মিয়া লাবণ্যকে অদ্ভুত সব কথা শোনায়। যেমন- তার বাড়ি কোয়েকাফ নগর, সে একজন রাজকীয় তোতা, তার পূর্ব পুরুষগণের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন রাজসভাসদ, তার মধ্যে বিখ্যাত প-িত শুকপাখির কথা নাকি জগদ্বিখ্যাত। তোতার এ ধরনের কথায় লাবণ্য একবার জানতে চায়-
‘তাহলে তুমি বাংলাদেশে কেন?’
‘কপালের ফেরে গো! কপালের ফেরে!’
‘সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু তুমি মাঝে মধ্যে এমন বিচ্ছিরি করে কথা বল কেন?’
‘সঙ্গ দোষ! প্রথমে রোহিঙ্গা তারপর গুলিস্তানের লোকজনের খাসিলত আমারে পাইয়া বইছে বইন। কেমতে কেমতে জানি মুখ দিয়া বেফাস কথা বাড়ায় পড়ে।’
লাবণ্য তোতার কথার বেশিরভাগই হেসে উড়িয়ে দেয়। অবশ্য লাবণ্যর ব্যবহারে তোতা মিয়া কিছু মনে করে না । তবে তার অবিশ্বাস্যে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে তোতা গুণ গুণ করে-
‘যখনে যে করে প্রভু সেই মত হএ
কর্ম অনুরূপে ফল সকলে ভুঞ্জএ।’
চার.
বহুদিন পর কোয়েকাফ নগরে আনন্দের কমতি নেই। নগরের প্রতিটি অংশ আলোক সজ্জায় সজ্জিত। সুগন্ধিযুক্ত খাবারের গন্ধে সরাইখানাগুলো মৌ মৌ করছে। বসন্ত তার পুরনো সৌষ্ঠবে আবারও ফিরে এসেছে। বোঝা যাচ্ছে এবার বসন্তকাল দীর্ঘস্থায়ী হবে। ফুলের বাগানে নানান রঙের ফুল ও প্রজাপতি মিলেমিশে একাকার। পথঘাট ও ঘর গৃহস্থালি ধুপ ও খুশবুর গন্ধে ভরপুর। নগরের প্রধান তোরণ এক পক্ষকালেরও বেশি সময় ধরে সজ্জিত।
শাহজাদী যুবাইদার কক্ষ আলোয় ঝলমল করছে। তার মনে আনন্দের শেষ নেই। তাকে যখন জানান হয় তার প্রিয় তোতা ফিরে এসেছে, তখন সে এক অবিশ্বাস্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সংবাদ বাহকের দিকে। শাহজাদী তোতাকে কাছে পাওয়ার পর থেকে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করেনি। সারাক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে রাখেছে। তবে আনন্দের অতি উচ্ছ্বাস কেটে যাওয়ার পর শাহজাদী খেয়াল করে তার প্রিয় ফোরকান কেমন যেন গম্ভীর হয়ে থাকে। শাহজাদী তার প্রিয় তোতাকে ফোরকান নামেই ডাকে। জ্ঞানী, আমুদে, সত্য-মিথ্যার বিচারে প্রাজ্ঞ তোতা পাখিটির জন্য এটাকেই সে উপযুক্ত নাম মনে করেছে। কিন্তু ফোরকানের বিমর্ষভাব এই মুহূর্তে তাকে অনেক বেশি ভাবিত করে।
প্রাসাদের অলিন্দে বসে শাহজাদী তোতার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে জানতে চায়-
‘প্রিয় ফোরকান, তোমার কি মন খারাপ?’
‘জি শাহজাদী।’
‘কেন বল তো?’
‘ওই সমুদ্রের পাড়ের দেশটার কথা মনে পড়ছে।’
‘ওই দেশটাতেই না তুমি ধৃত হয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ, ওই দেশটাতেই!’
‘বলেছিলে ওখানে অনেক মন্দলোক। তাদের ব্যবহার খারাপ, তারা বেশ কূট। তার পরও ওই দেশটার কথা মনে পড়ে তোমার?’
‘হ্যাঁ, মনে পড়ে।’
‘কেন বল তো?’
‘কারণ ওটা সবুজের দেশ। ওটা লাবণ্যর দেশ!’