একাত্তরের বিভীষিকাময় দিনগুলো

রত্না চক্রবর্তী

২৫ শে মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নরখেকো বাঘের মত। এই বর্বরোচিত হামলার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের বীর বাঙালি বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দির থেকে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল তা ছিল প্রথম আক্রমণ। কিন্তু কোন বই পুস্তক, সংবাদ পত্রে, কোন ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে এ আক্রমণ সম্পর্কে কোন তথ্য মিলেনা। এ প্রতিরোধের বীর সৈনিকরা রয়ে গেছেন লোকচক্ষুর অগোচরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সেতু কালভার্ট শিল্প কারখানা পুনঃ মেরামত ও নির্মাণে অনেক সময় চলে যায়। সবার কর্ম সংস্থান জরুরী ছিল।
যাহোক, ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধেও ইতিহাস ভিন্ন খাতে মোড় নেয়। তাই চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দিরের বীর সেনারা উপেক্ষিতই রয়ে যান। আজ শ্রদ্ধাভরে অবনত মস্তকে তাদের স্মরণ করছি। সেদিন আমাদের বাড়ির যে সব অসহায় মানুষগুলো এক কাপড়ে বেরিয়ে এসছিল এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টকে বাড়িতে জায়গা দিয়েছিল। আর এ অপরাধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ৯ টি মাস প্রতিদিন এসে বাড়ির লোকদের খোঁজাখুঁজি করত। আমাদের কারও পক্ষে উক্ত এলাকার ত্রিসীমানায় আসা সম্ভব হয়নি পারিনি। এ সকল ঘটনা পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হওয়ার দাবি রাখে।
১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দির থেকে তৎকালীন বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সংখ্যক বীরসেনার দুঃসাহসিক অভিযানটি নিঃসন্দেহে সঠিক মূল্যায়নের দাবি রাখে। আমাদের বাড়িটি পাহাড়ের উপর হওয়ায় এবং খালেক বিল্ডিংয়ের ঠিক মুখোমুখি হওয়ায় অভিযানের জন্য চট্টেশ্বরী মন্দিও থেকে পুরো অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। এই অভিযানে পাকিস্তানীদের সাথে কিছু সংখ্যক বাঙালিও হতাহত হয়। যারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দূর থেকে দেখছিল, তাদের দিকে তাক করে খালেক বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নেয়া পাকিস্তানীরা গুলি চালায়। ব্যাঙ্কসহ সব বন্ধ থাকায় বাঙালিদের হাতে টাকা ছিল না। শোনা যায় খালেক বিল্ডিং থেকে টাকা ছিটিয়ে দেয়া হয়। কিছু সংখ্যক অবুঝ ও লোভী বাঙালি ঐ টাকা কুড়িয়ে নিতে গেলে বিল্ডিং থেকে গুলি চালিয়ে অনেককে হত্যা ও অনেককে আহত করা হয়।
যাহোক, আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এবং আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, সেই অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের যথাযোগ্য মূল্যায়ন করতে এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। চট্টেশ্বরী মন্দিরের নাম সহ অভিযানটি ইতিহাসে স্থাপন করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে জানার সুযোগ করে দেয়া হোক।
সেদিন বাড়ি ত্যাগকালে দু কেয়ার টেকার হরিচরণ আর অমূল্যকে আমার ঠাকুরদাকে দেখাশোনা করার জন্য রেখে আসা হয়। পরের দিন সকালবেলা ঠাকুরদা মিঃ খালেকের খোঁজ নিতে খালেক বিল্ডিংয়ে যেতে চাইল। সঙ্গে প্রায় ৫, ৬ লিটার দুধ গরম করে নিয়ে যান, তখন আমাদের বাড়িতে ৫টা গাভী সহ ১৩টি গরু ছিল। উল্লেখ্য, খালেক সাহেব ঠাকুরদাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। যখনই দেখা হতো মাথা নিচু করে কুর্ণিশ করতেন। আমার ঠাকুরদা শ্রী কালিপদ অধিকারি সাধক মানুষ ছিলেন, গেরুয়া বসন পরতেন। মুখস্থ চন্ডীপাঠ করতেন, কখন ও কারো গোলামী করেন নি, তখনকার দিনের আই এস সি পাস ছিলেন। মন্দিরের চীফ যাজক হিসেবে আয়ুব খান, জর্ডনের বাদশা, ব্রিটেনের রাণীসহ আরো কয়েকটি দেশের প্রধানদের চিঠি লিখেছিলেন, ঐ চিঠির উওরগুলো সযতেœ বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। যারা ঠাকুরদাকে প্রণাম করতে আসতো সবাইকে ঐ মূল্যবান চিঠিগুলো দেখাতেন। কোনদিন কোন ব্যাঙ্কের একাউন্ট করেননি। আমার বাবা কাকার থেকে এক পয়সা কখনও নেন নি, আবার এক পয়সা দিয়েও যান নি।
আমাদের কেয়ার টেকার অমূল্যের ভাষ্য অনুযায়ী ঠাকুরদা ঐ গরম দুধ নিয়ে খালেক বিল্ডিংয়ের নিচ তলা থেকে উপর তলা পর্যন্ত যারা আহত অবস্থায় ছিল তাদের সবাইকে খাইয়েছিল। ৩ দিন এই ভাবে চলছিল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং নারকীয় ঘটনাগুলো দেখে ঠাকুরদা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
আমার ২ কাকু অরুণ চক্রবর্তী আর বিজয় চক্রবর্তী লুকিয়ে শহরে আসেন ঠাকুরদাকে নিয়ে যেতে। শহরে তখন হাতে গোনা কিছু মানুষ। চারদিকে থমথমে অবস্থা। ঠাকুরদাকে পাওয়া যাচ্ছে না। পাড়ার একজন বলল, তাঁকে জয় পাহাড়ের উপরে দেখেছে। তখন চট্টগ্রামের দিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আসতে শুরু করেছে। আমার অরুণ কাকু , বিজয় কাকু প্রায় দৌড়ে জয় পাহাড়ে উঠতেই ঠাকুরদাকে পেল। না কিছুতেই যাবেন না, বলছে তোরা সব কাপুরুষ, চট্টেশ্বরী মাকে ফেলে চলে গেলি। তোরা আমার কেউ নয়। তারপর অনেক চেষ্টা করে ও বিফল হয়ে কাকুরা চোখের জল নিয়ে চল এলো।
চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দিরের উল্টো দিকের সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের পাকিস্তানী মিলনিয়ার মিঃ খালেকের সেই “খালেক বিল্ডিং” কালের অগ্রযাত্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষের মনের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলার স্থাপত্যেরও পরিবর্তন করা হয়েছে।
সম্ভবত ৩১ শে মার্চ বা ১লা এপ্রিল আমার ঠাকুরদা চট্টেশ্বরী মন্দিরের প্রধান সেবায়েত শ্রী কালীপদ অধিকারী অন্যান্য দিনের মতো ভোরে স্নান সেরে পূজো শেষে বেরিয়ে পড়েন। সকাল ১০টার সময় পাকিস্তানী হানাদারবাহিনীর একটি দল মন্দিরে আসে। তাদের গাড়ির শব্দ শুনেই আমাদের দুই কেয়ার টেকার অমূল্য ও হরিচরণ বাড়ির পেছন দিকে পুকুরের পাশ দিয়ে পালিয়ে বাঁচে। হানাদাররা হন্যে হয়ে বাড়ির লোকদের খুঁজতে থাকে, ঘন্টা খানেক খোঁজাখুঁজির পর খালেক বিল্ডিংয়ে যায়। যাওয়ার পথে আবার মন্দিরে আসে। এইবার পুরো বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আমাদের বাড়িটি পাহাড়ের উপর, তাই প্রায় ৪০ টি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। এই সিঁড়ির নীচে ৪ টি পেরা (প্রসিদ্ধ) মিষ্টির দোকান ছিল। আগুন থেকে গরিব মানুষদের এই দোকানগুলোও রক্ষা পায়নি। প্রায় দুপুর ২টার সময় ঠাকুরদা দুপুরের খাবার খেতে বাড়িতে আসছিল। সর্বশেষ নিচের সিঁড়িতে পা রাখতেই (ঠাকুরদা গেরুয়া রঙের ধূতি পাঞ্জাবী পরিহিত ছিল) বিরাট হুঙ্কার —- শুনেছি ঠাকুরদা ইংরেজীতে ঊর্দুতে অনেক কিছু বলেছে। বলেছিল আমি তো বুড়ো মানুষ , এই মন্দিরের চীফ প্রিস্ট, ধর্ম পালন ছাড়া আমার অন্য কোন আসক্তি নেই। তোমরা দেখবে চলো আমার কাছে লিখা মাননীয় আয়ুব খানের চিঠি আছে, জর্ডনের বাদশার চিঠি, আরো অনেকের চিঠি আছে……। না ৮০ বছরের এই বুড়ো অহিংস অজাতশত্রু মানুষটির কোন আকুতি তাদের হৃদয়কে নাড়া দিল না। তারা তো তখন হিংস্র বাঘ! কিছুতেই বাঁচতে পারল না। সেখানেই ঠাকুরদা কে গুলি করে সিঁড়ির মধ্যেই ফেলে দিল। আমাদের প্রিয় ঠাকুরদা চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দিরের প্রধান সেবায়েত শ্রী কালীপদ অধিকারী মায়ের পায়ের তলায় শহীদ হলেন। সেদিন থেকে প্রায় ১৫ দিন অর্থাৎ ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামের অনেক বিখ্যাত লোককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ব্যাঙ্কের এডভাইজার পি বর্মনকে তাঁর বাড়িতে পূজারত অবস্থায় গুলি করা হয়। তাঁর মাত্র ২৫ বছর বয়সী ছেলে রতন বর্মনকেও (স্বামী বিবেকানন্দের মতো দেখতে ছিল) নদীপথে গ্রামে যাওয়ার জন্য নৌকায় পা দিতেই গুলি করা হয়। আর ও অনেক … প্রায় ২ হাজার লোককে ১ম দফায় মারা হয়। এ সকল শহীদের নাম হয়াত বা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।
আমাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার দিন একদিকে আমাদের প্রিয়জন আমার ঠাকুরদাকে হারিয়েছি, অন্যদিকে আমাদের তিন পুরুষের সম্পদের একটি কণা ও ছিল না। প্রায় ৩০০ মন তামা পিতলের বাসন (আমাদের বাড়ির ৫ পরিবারের এবং কালী মন্দিরের), কাঠের আসবাব, সর্ব মোট ২০টি গরু, বড়ো পাই রেডিও, আরো অনেক জিনিসের সাথে আমার ঠাকুরদার দেয়া আমার সবচাইতে প্রিয় জার্মান রিডের বড় হারমণিয়াম। যা পুড়ে যাওয়ার গেছে, আর হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর বাকী সব লুট হয়ে যায়। আমাদের দু কেয়ার টেকার আর বাড়িতে ঢুকে নি। হরিচরণ চারদিকে এতো লাশ আর আগুন দেখে পাগলের মতো আচরণ করতে করতে কোথায় চলে গেছে হদিস পাওয়া যায়নি। তার তিন কুলে কেউ ছিল না। ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ির প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে তার ছিল হরিহর আত্মা। অন্যজন অমূল্য প্রাণ ফিরে পেয়ে আমাদের খবর দিতে গ্রামে বাবার মামার বাড়িতে যায়। তার সাথে যেন আমার ঠাকুরমার দেখা না হয়, সেই ভাবে তাকে কিছু খাবার আর টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়। ৯টি মাস আমরা ঠাকুরমাকে জানতে দেইনি যে ঠাকুরদা নেই।
গ্রামে পালিয়ে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পেলেও সারাক্ষণ আমাদের দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়েছিল। আমরা কিভাবে আমাদের মান সম্মান রক্ষা করে পুরো নয় মাস প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রাম করেছি তার সঠিক বর্ণনায় ভাষা হার মানতে বাধ্য। (চলবে)
সাউথ বার্লিংটন, ভারমন্ট।