একুশের চেতনা ‘পুরস্কার’ প্রাপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ?

শিতাংশু গুহ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য কর্ম বিশাল; কিন্তু তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ‘গীতাঞ্জলী’র জন্য। একটি ম্যুভি যখন অস্কার পায়, তখন ছবির নামটি থাকে। দর্শক তা দেখে। একুশে কমিটি যখন কাউকে পুরস্কার দেন, তখন তাঁর ঠিক কোন কাজের জন্য পুরস্কারটি দিলেন, তা জানানো উচিত। এতে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয়, তাঁরা সেটি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন। একুশে কমিটি যে পুরস্কারপ্রাপ্তদের কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, মানুষ তা-ও বুঝতে পারে?
এই সুযোগে এবার যে একুশ জন একুশে পদক পেয়েছেন তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে রাখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হলের অ্যাল্যুমিনি হিসাব আমি এবার আরো খুশি যে, আমাদের হলের সাবেক তিন ছাত্র এবার একুশে পদক পেয়েছেন। এঁরা হচ্ছেনÑ সাংবাদিকতায় অজয় দাশগুপ্ত, আবৃত্তিতে ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় এবং গবেষণায় ড. সমীর সাহা। আমার অনুজপ্রতিম পাভেল রহমান ফটোগ্রাফিতে ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন, সেটিও গর্বের।
ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের বাংলা ভাষা প্রেম উত্থলে উঠে, বাংলাদেশ ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি দেশ; কিন্ত কেন যেন মনে হয়, স্বাধীনতার আগে বা অব্যবহতি পরে ‘মহান একুশের’ যে চমক বা কদর ছিল এখন তা আর নেই? বাংলা ভাষা অবহেলিত। শান্তি নিকেতন না হোক, বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি? নাই ভাষাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। শিল্প নেই, সাহিত্য নেই, সাংবাদিকতা নেই, ‘আলজাজিরার’ পাল্টা স্টোরি করার যোগ্যতা আমাদের নেই?
ক্লাস রুমে শিক্ষক ছাত্রকে প্রশ্ন করেন, ‘হু স্পেল টি অন দ্য টেবিল’ (‘টেবিলে চা কে ফেলেছে’) এটি মাতৃভাষায় বলার জন্য। ছাত্র জানতে চাইলো, মায়ের ভাষায় বলতে হবে? শিক্ষক, ‘হ্যাঁ’। ছাত্র : মা ঘরে ঢুকেই চিৎকার করে বলে, ‘আমার কাজ বাড়ানো ছাড়া আর কি তোর কোনো কাজ নেই, আজ তোর এক দিন কি আমার এক দিন। পুত্র বলে, মা, আমি ফেলিনি, বাবা ফেলেছে! মা : যেমন বাপ তেমন পোলা, দু’জনে মিলে আমার লাইফ ধ্বংস করে দিলো, খাটতে খাটতে আমার জীবন শেষ?
বাংলা ভাষার অবস্থা অনেকটা ওই শিক্ষক অথবা ছাত্রের বাবার মতো? বাংলাদেশে বাংলা ভাষার রমরমা অবস্থা হওয়ার কথা, তা হয়নি। আপাতত : হওয়ার সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না! ভাষা ও সংস্কৃতি সমবৃদ্ধির জন্য মুক্ত পরিবেশ দরকার, তা নেই? নাভি থেকে না গাইলে নাকি গান হয় না, তেমনি মনের বদ্ধ কপাট না খুললে শিল্প-সাহিত্য সমবৃদ্ধ হয় না। আসলে উন্মুক্ত পরিবেশ না হলে ভালো কিছুই জন্মে না। আমাদের একুশের চেতনা ‘পুরস্কার’ প্রাপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ঢাকার বইমেলা পিছিয়ে গেছে। ভাগ্য ভালো যে বন্ধ হয়ে যায়নি! একদা একুশের প্রভাতফেরি ছিল একটি আকর্ষণ। প্রভাতফেরি হারিয়ে গেছে, এর জায়গা করে নিয়েছে ‘একুশের প্রথম প্রহর’। ফেব্রুয়ারি মাসে একুশের বইমেলার জনক বলা হয় পুথিঘর ও মুক্তধারার প্রতিষ্ঠাতা চিত্ত সাহাকে, মার্চের বইমেলা কি ধারাবাহিকতা, নাকি এর নতুন কোন জনক হবেন, কেজানে! এভাবে হয়তো এক দিন ‘একুশের বইমেলা’ হারিয়ে যাবে, নতুন নাম হবে ‘স্বাধীনতার বইমেলা’? হয়তো এভাবে এক দিন ‘একুশ’ হারিয়ে যাবে, পরাজিত হবে বাংলা ভাষা।
ভাষা বা সাহিত্য নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা আমার নেই; কিন্তু এ নিয়ে রাজনীতি হয়তো কিছুটা বুঝতে পারি। সময় নির্ঘণ্ট মিলে যাওয়ায় ২০১৯-এ দিল্লিতে একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে কিছু সময়ের জন্যে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে বাংলাদেশ থেকে বেশ ক’জন অংশ নিয়েছিলেন। কথা বলার সুযোগ এলে বলেছিলাম, আগামীতে যদি কেউ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, সেটি বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে হবে না, হবে বহির্বিশ্ব থেকে, কারণ সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে সৃজনশীল কিছু জন্মে না! মৌলবাদ মুক্ত চিন্তার পরিপন্থী! সুতরাং-!
১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২১, নিউইয়র্ক।