একুশ শুধু শোকের নয়, আবার লোক দেখানো উৎসবও নয় — মুহম্মদ ফজলুর রহমান

অর্জন মানেই আনন্দ। আর আনন্দ মানেই উৎসব। উৎসবের মধ্য দিয়েই আনন্দের প্রকাশ। একুশ বাঙালিদের প্রথম জাতিগত বিজয়। জাতিগত অর্জন। মাতৃভাষায় কথা বলার স্বীকৃতি আদায়। আর এ অর্জন কারও দয়ার দান নয়। রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে কেনা। এ অর্জনে যেমন আনন্দ আছে, আছে বেদনাও। হাসি ও কান্না আছে পাশাপাশি। একুশ তাই বাঙালির কেবল আনন্দ-উৎসব নয় যেমন, লোক দেখানো শোকও নয়। এ একান্তই বাঙালির আত্মদর্শন ও আত্মোপলব্ধির মিলিত আয়োজন। একুশের বেদনায় মিশে আছে রফিক, শফিক, জব্বার, বরকতের রক্ত, তাদের প্রিয়জনদের চোখের জল। অন্যদিকে বাঙালি জাতির মহান অর্জন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। স্বাধীনতা অর্জনের বীজমন্ত্র। তাই জাতিগতভাবে মহা-আনন্দের দিনও একুশে ফেব্রæয়ারি।
আবার বাঙালি জাতির মাতৃভাষার জন্য যে আত্মবলিদান, তার স্বীকৃতি আজ আন্তর্জাতিক পরিমÐলেও। সব জাতির মাতৃভাষা সংরক্ষণে একুশে ফেব্রæয়ারি মহিমান্বিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সুতরাং, একুশে ফেব্রæয়ারি এখন আন্তর্জাতিক উৎসবেও পরিণত। মাতৃভাষার প্রতি এই যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তাতে এও প্রমাণিত হয়ে যায় যে মাতৃভাষার মান রক্ষায় বাঙালির যে লড়াই-সংগ্রাম, তা কোনো অন্যায় লড়াই ছিল না। ছিল মায়ের ভাষায় কথা বলার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। ছিল সত্যের পক্ষের লড়াই। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে এ সত্যও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতের জীবনদানও ব্যর্থ হয়নি। ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সত্য ও সুন্দরের পক্ষে কোনো আত্মদানই বৃথা যায় না।
আমরা সে কারণে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ১৯৫২’র সেই রক্তাক্ত একুশে ফেব্রæয়ারিকে। যেদিন বাঙালি জাতির মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে পাকিস্তানি শাসকচক্রের দুরভিসন্ধিকে রুখে দিয়েছিল বাংলার ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিক, জনতা। যার পথ বেয়ে এসেছিল বাঙালির জাতিগত স্বাধীনতা ১৯৭১-এ। যেদিন মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয়, সেই ১৬ ডিসেম্বর আমরা কিছুদিন আগেই অতিক্রম করে এসেছি। আর ২১ ফেব্রæয়ারি, শহীদ দিবস সামনে। ১৯৫২ সালে বাঙালিদের প্রথম জয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি জেনারেল প্রভাবিত সরকার আমাদের মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নিয়ে আমাদের সংস্কৃতিচর্চা ও বিকাশের পথ রুদ্ধ করে চিরদিনের জন্য পদানত রাখতে চেয়েছিল। পারেনি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ এ ঘোষণার মাধ্যমে আমাদের মুখে উর্দু গুঁজে দিয়ে বাঙালি জাতিকে মূলত বোবা বানিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিলেন! সে চক্রান্ত সফল হতে দেয়নি বাংলার লড়াকু ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-জনতার মিলিত প্রতিরোধ।
১৯৪৮ সাল থেকে যে আন্দোলনের সূচনা, সংগ্রামী মানুষের মিলিত সে আন্দোলনে বাঙালিরা জয়ী হয় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি, বুকের রক্ত ঢেলে। রক্ত দেয় ছাত্র-জনতা। পাকিস্তান সরকার নৃশংসভাবে শুধু তাদের হত্যাই করেনি, তাদের অনেকের লাশও গুম করে দেয়। ’৫২-এর সেই পথ ধরেই আমাদের জয়ের অভিযাত্রা। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন। সামনেই সেই মহান মার্চ মাস। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাস। জয় ডিসেম্বরে। বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞ ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিসংগ্রামীদের কাছে।
শুরুতেই জানাই ভাষাশহীদ ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এবং সম্ভ্রম খোয়ানো মা-বোনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। আমরা যারা স্বদেশ-স্বজন ছেড়ে প্রবাসে বসতি গেড়েছি, তারা স্বদেশের কিছুই ছাড়িনি, কিছুই ভুলিনি। শহীদ দিবস, মুক্তিযুদ্ধÑসবই আমাদের হৃদয়ে সমুজ্জ্বল। হৃদয়ের সব শ্রদ্ধা ঢেলে, কনকনে শীত উপেক্ষা করে আমরা পালন করি শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বৈশাখী উৎসব। মেতে উঠি রবীন্দ্র-নজরুলকে নিয়ে। প্রবাসের সব প্রতিক‚লতা জয় করে মেতে থাকি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে। এবারের একুশে ফেব্রæয়ারি শহীদ দিবসকে সামনে রেখে প্রবাসে আমাদের যাপিত জীবনের চালচিত্রে আমরা কতটুকু ছেড়েছি এবং কতটুকু ধরেছি বা পেয়েছি, তার হিসাব মেলানোর প্রয়াস নেব। দেবে আর নেবের অঙ্ক মেলালে দেখা যাবে, এখানেও আমরাই জিতেছি।
তবে এবার এসব হিসাব মেলানোর অঙ্ক নিয়ে কথা বলব না। এবার একেবারেই অন্য কথা। যা নিয়ে এখন অনেকেই আমরা বলাবলি করছি। কথাটা হচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের ৬৬ বছর পর শহীদদের রক্তদানের সেই ইতিহাস কেবলই শোকের, নাকি কেবলই উৎসবের, আনন্দের।
অনেকেই বলেন, একুশ এখন আর কেবলই শোকের নয়। উৎসবের এবং আনন্দেরও। একুশ এখন উদযাপিত হয়, পালিত হয় না। একুশে উদ্্যাপনের আয়োজনেও উৎসবের ব্যঞ্জনাই ফুটে ওঠে। কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়, নগ্নপায়ে প্রভাতফেরি হয়। শহীদদের উদ্দেশে শোকগাথাও উচ্চারিত হয়। তবু উৎসবের বর্ণময়তা প্রধান হয়ে দেখা যায় আয়োজনের সর্ব অঙ্গে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি আমরা এখনো ভুলিনি, ভুলবও না কোনো দিন। তবে শোকের আবহাওয়া এখন আর একুশকে আচ্ছন্ন করে না। স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ খচিত শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সুসজ্জিত নারী-পুরুষের হৃদয়ে কী থাকে ধরতে পারা না গেলেও, বহিরাঙ্গনে শোক থাকে না। উৎসবেরই আমেজ থাকে। একুশের অনুষ্ঠানে যে হাততালি একসময় নিষিদ্ধ ছিল কঠোরভাবে, এখন সে হাততালি নিষিদ্ধ নয় মোটেও। হাততালির ফেটে পড়া শব্দে হয়তো শহীদদের আত্মাই কেঁপে ওঠে।
আগামী দিনের কথা বাদ থাক, ১৯৫২ থেকে ২০১৮Ñ৬৬টি বছর, এ-ও কি একেবারে কম সময়? ৫২’র শোক আর কত দিনই-বা বয়ে বেড়ানো যায়! ফিকে তো একটু হবেই। নিজের মা-বাবা, প্রিয়জনদের শোকই এত দিন থাকে না, এ তো নেহাত আবেগের শোক! তা আর কত দিন? যে বাংলা ভাষার জন্য ৫২’র সৃষ্টি, সেই ভাষারই অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানে যত মায়াই থাক, ও মায়ার ঘোরে আর কত দিন ডুবে থাকা যায়! ৪৭ বছরের মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকেই ভুলতে বসেছি, আর ৬৬ বছরের মাত্র কজনের আত্মত্যাগ! তা-ও তো একেবারে ভুলে যাওয়া নয়। কিছুটা পাশ ফেরা। শোককে আনন্দে রূপান্তরিত করে নেওয়া। রাজনৈতিক ভাষায়Ñশোককে শক্তিতে পরিণত করার কথা বলা হয়। সংস্কৃতির ভাষায় যদি শোককে উৎসবে পরিণত করার কথা বলা যায়, তবে তাতে খুব বেশি অন্যায় হওয়ার কী আছে?
না, খুব বেশি অন্যায় হবে না। আমরা তো সবই করছি, শহীদ বেদিতে যাচ্ছি, ফুল দিচ্ছি। নানা অনুষ্ঠানে বেছে বেছে কবিতা আবৃত্তি করি, মন-ছোঁয়া সব সুশীল শব্দে একুশের মাহাত্ম্য বর্ণনা করি। পত্রপত্রিকায় একুশের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। এসব করেও যদি একুশকে একটু উৎসবে কালো ব্যাজ ঝুলিয়ে রূপ দেওয়া হয়, তবে আর তাতে অন্যায় কী? মূল কথা তো ভাষাশহীদদের স্মরণ করা। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য ও প্রাপ্তি মনে রাখা। আনন্দ-উৎসব তো বিস্মৃতির আয়োজন নয়। বর্ণাঢ্য আয়োজনেও স্মরণোৎসব করা যায়।
তবে একটি বিশ্বাস থেকে কোনোভাবেই সরে আসা যাবে না। একুশ যদি শোকের না-ও হয়, একুশ যদি এখন উৎসবের রঙে রাঙাও হয়, তবে সে উৎসব অবশ্যই লোক দেখানো উৎসব হবে না। হবে না হালকা বিনোদন। অর্থহীন কোনো আয়োজনে শোককে আড়াল করার প্রয়াস যেন কিছুতেই না হয়। একুশ উৎসবের হলেও তা হতে হবে গভীর অনুভবের। ইতিহাসকে সামনে রেখে বাঙালি জাতিগত পরিচয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রথম বিজয় অর্জনের কথা মনে দৃঢ় রেখেই শোককে আত্মস্থ করে আনন্দের বাতাবরণে শহীদদের স্মরণ করার উৎসব হবে সেটা।
উৎসবের নামে যত কোলাহলেই মাতি না, ভাষাশহীদদের স্মরণ করতে হবে যথাযথ মর্যাদায়। শ্রদ্ধা থাকতে হবে ষোলো আনা। মনে রাখতে হবে, ওরা কেবল ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেননি। ওরা বাঙালি জাতিকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনা, নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে গেছেন। স্বাধীনতা অর্জনের পথে আমাদের এগিয়ে দিয়ে গেছেন এবং ওরা এই সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে কিছুই চাননি। কিছু চাইতে আসবেনও না। ওদের রক্তের বিনিময়ে আমরা যা পেয়েছি, কোনো কিছুর বিনিময়েই তার মূল্য পরিশোধ হবে না। আজ আমাদের মুখে যে মায়ের ভাষা শোভা পায়, আমরা যে স্বাধীনতা ভোগ করছি, সে তো ওই শহীদদেরই দান! তাই শ্রদ্ধাটুকু ওদের দেখাতেই হবে এবং যত উৎসব আয়োজনই হোক-শ্রদ্ধাটুকু লোক দেখানো হলে হবে না। হতে হবে নির্ভেজাল। হৃদয়-উৎসারিত।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বর্তমানে যে বেহাল দশা, তাতে নানা কথা ওঠে। যারা বাংলা ভাষা নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করেন, একুশের চেতনা যাদের বুকের মধ্যে এখনো উষ্ণতা ছড়ায়, যারা বাংলা ভাষার প্রতি এখনো দরদ পোষণ করেন এবং যারা বাংলা ভাষার গন্তব্য নিয়ে শঙ্কিত, তারা বলেনÑবাংলাদেশে বাংলা ভাষার বড় নৈরাজ্য চলছে। যেসব বিড়াল ‘মাছ খাব না কাশী যাব’ বলে মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে দেশ ও দশের সর্বনাশ ঘটাতে চায়, সেই রকম কিছু ‘বিড়াল-বুদ্ধিজীবী’ বাংলা ভাষার সেবার নামে বাণিজ্য করে যাচ্ছেন এবং ভাষারও বারোটা বাজাচ্ছেন। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে এরা শহীদ মিনারে যান। বড় বড় সেমিনারে বড় বড় কথাও বলেন। কিন্তু তলে তলে সর্বনাশ ঘটানোর কাজটাও করে যাচ্ছেন। এরা খুবই ভয়ংকর জীব বাংলা ভাষার জন্য। যারা ’৫২-তে গুলি করে রফিক, জব্বার, বরকতদের খুন করেছিল, তাদের চেয়েও কম নন। স্বভাষী মানুষদের এই অশুভ তৎপরতা আরও ভয়ংকর এ কারণে যে, তাদের চক্রান্তের বিষে আক্রান্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোররা।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষা এখন এতটাই অবহেলিত যে, অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকহীন মনে হয়। বাংলাদেশে যেখানে লড়াই-সংগ্রাম করে, বুকের রক্ত ঢেলে মাতৃভাষা অর্জিত হয়, সেখানে ভাবতে কষ্ট হয়, ভাষার জন্য কোনো দরদ, ভালোবাসা, মায়া, মমতা না দেখে। অসম্মান, অমর্যাদা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই যেন বরাদ্দ মায়ের মুখের ভাষার জন্য। ভাষার জন্য এই যে আত্মত্যাগ, তার দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত নেই বিশ্বজুড়ে। বাঙালির পরিচয় যদি ভাষায় হয়, জীবনাচরণে বাংলা সংস্কৃতির চর্চায় হয়, তবে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার নৈরাজ্য দেখে খুব হতাশ হতে হয়। মনে হয়, পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্তি পেয়েও বাংলা ভাষা এখন আবার স্বদেশি কোনো অদৃশ্য শক্তির হাতে বন্দী। ৫২’র ¤øান-মলিন বাঙালি জাতির মুখে যে ভাষার অধিকার অর্জন হাসি ফুটিয়েছিল, আজ আর তা নেই। বাঙালি বীরের জাতি, বিজয়ী জাতি। কিন্তু ভাষার প্রশ্নে পরজাতি, পরদেশি শত্রæর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেও হেরে যাচ্ছি স্বভাষী, স্বজাতির কাছে।
স্বাধীন দেশে এমন পরাজয় কেন? যখন পূর্ব পাকিস্তানে পরাধীন ছিলাম, যখন শাসন করত পরদেশি, পর ভাষার মানুষ, তখন তাদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে আজ কেন এভাবে হেরে যাওয়া? তবে কি সালাম, রফিক, শফিক, বরকতের রক্তদান বৃথা যাবে! আমরা যে এত দিন ¯েøাগান দিয়ে এলাম, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, তবে কি সেসব ¯েøাগান এখন অর্থহীন? ভাষাশহীদরা কি আমাদের ধিক্কার ও অভিশাপ দিচ্ছেন? বিশ্ব যেখানে আমাদের ভাষাসংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে নিজ নিজ মাতৃভাষা রক্ষার অঙ্গীকারে ২১ শে ফেব্রæয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি দিয়ে গৌরববোধ করছে, সেখানে আমাদের কেন লজ্জাজনক পরাজয়?
বাংলাদেশে বাংলা ভাষার দুরবস্থা দেখে এ কথা যদি কেউ বলেনÑরক্ত দিয়ে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারলেও আমাদের মন-মনন আর মগজে যেভাবে একুশের চেতনা আশ্রয় পাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে পায়নি, তবে খুব বেশি বলা হবে না। আমাদের প্রাত্যহিক কর্ম বলি আর ভাবনার জগৎ বলি, একুশের আলোয় আলোকিত নয়। সেসব জায়গায় এখনো অন্ধকার রয়ে গেছে।
অন্যদিকে আমরা একজোট হয়ে লড়াই করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি। সেই দেশে একজোট হয়ে বসবাস করতে পারছি না। স্বাধীনতার লড়াইয়ে আমরা যত এক ছিলাম, স্বাধীনতা উত্তরকালে ঠিক ততটাই বিচ্ছিন্ন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে সকলের তরে সকলে লড়েছি। এখন লড়াই চলছে ব্যক্তিস্বার্থ লাভে। সে কারণে কলহ-বিবাদ-হানাহানি। সম্মিলিত স্বার্থ নেই, সম্মিলিত লড়াইও নেই। নিজেকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত। সবার সুখ সুখ নয়, নিজের সুখই সুখ। নিজের সুখের জন্য অনেকের সুখ হরণ করতে হবে। অন্যের আনন্দে ছাই দিয়ে নিজের আনন্দ অ¤øান রাখতে হবে। সকলে মিলে সুখ উপভোগের সুখ উধাও আজ একুশের চেতনায় পাওয়া বাংলাদেশে!
সার্বিক বিবেচনায় আজ দ্বিধা জড়ো জড়ো কণ্ঠে এ কথাই উচ্চারণ করতে চাই যে, একুশ নিয়ে আমরা যতই আজ উদ্্যাপনে মাতি, মূল চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে নিশ্চয় নয়। সেই চেতনা, যে চেতনায় শাণিত হয়ে বাঙালিরা জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়ে মুক্তযুদ্ধ করেছি। জীবন দিয়েছি। সম্ভ্রম খুইয়েছি। অবশেষে কাক্সিক্ষত স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। আমাদের করোটিতে সেই শোক ও উৎসব দুটোই পাশে রেখে আমাদের এখন ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও লক্ষ্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। মূল লক্ষ্য বাংলা ভাষাকে প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। অবজ্ঞা-অবহেলা থেকে বের করে এনে সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসানো। বাংলা ভাষার যে কী দৈন্যদশা, তা বাংলাদেশের কতিপয় মিডিয়া, নাটক-নভেল এবং দু-চারজন অনুষ্ঠান সঞ্চালকের প্রতি খেয়াল দিলে ভালোভাবে অনুভব করা যায়। ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে একটি সংকর ভাষা নির্মাণের নিয়ত প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা মূলত কিশোর-তরুণ-যুবকদের মাথা নষ্ট করে দিয়ে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ডোবানোর প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। এ জন্য কিন্তু সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতরা জীবন দেননি।
এ অবস্থা থেকে প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। তাহলেই আমরা শোকের আবহে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে পারব। আবার উৎসবের মধ্য দিয়ে অর্জনের আনন্দও উপভোগ করতে পারব।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।