একে অপরকে ঘায়েল করার খেলায় রাজনীতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিনিধি : সরকার ও বিএনপি নানা কৌশলে একে অপরকে ঘায়েল করার খেলায় মেতে উঠেছে। এখন বিএনপি নির্বাচনে আসায় সরকারপক্ষ কৌশলে কিছু পরিবর্তন এনেছে মাত্র। বিএনপি ও তাদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনে আনার সরকারি চেষ্টা সফল হয়েছে। তারা না এলেও এদের বাইরে রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দৃঢ়তা ছিল সরকারের। অপরদিকে বিএনপি ও তার সমগামীরা সরকারের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ন্যূনতম সমঝোতার পথ খুঁজে নিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনৈতিক মহলেরও আশঙ্কা, হার-জিত, একে অপরকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতায় রাজনীতিই না হারিয়ে যায়। দুই পক্ষকেই বিষয়টি ভাবিয়ে রেখেছে বলে উভয় পক্ষেরই সতর্ক পদচারণ।
একদিকে ৭ দফা দাবি আদায়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কর্মসূচি দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি বিএনপি দলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যও বলে আসছিল। অপরদিকে সরকারি দল ও সহযোগীরা বেশ আগে থেকেই নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছে। বিএনপি ও সঙ্গীরা নির্বাচনে না এলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিপক্ষে হুংকার দিয়ে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও চালাচ্ছেন। অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন। গ্রেফতার, হয়রানি চলছে। গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেওয়া হয়নি। ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বুধবার সাক্ষাৎকারের পরিবেশ সৃষ্টির দাবি জানাবেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করা না হলে তারা নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে আসার হুঁশিয়ারিও দেবেন। ঐক্যজোটের ক্ষুদ্র শরিক দলগুলোর নেতাদের স্বীকৃত নির্বাচনী এলাকা নেই। বিএনপির করুণা ছাড়া এসব ছোট দলের শীর্ষ নেতাদের বিজয়ী হয়ে আসার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই। প্রত্যেকেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হবেÑএই বাস্তবতাকে বিএনপি এখন রাজনৈতিক তাগিদে আর বড় করে দেখছে না। বৃহত্তর স্বার্থচিন্তায় শরিক হচ্ছে ক্ষুদ্র দলগুলোর চেয়ে বিএনপি নির্বাচনে অনেক বেশি আগ্রহী। কারণ মাঠের অবস্থা, জনমত তাদের অনুকূলে বলেই বিএনপির কর্মীরা দৃঢ়ভাবে মনে করেন।
বিএনপির একাধিক শীর্ষস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রার্থী তালিকা তারা চূড়ান্ত করেই রেখেছেন। গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য নিয়ে আসনবণ্টনে সমস্যা নেই। ড. কামাল হোসেন নিজে প্রার্থী হতে চান না বলে ঘোষণা করেছেন। নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না তিনি। আওয়ামী লীগ ড. কামালকে ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। কেরানীগঞ্জে মোস্তফা মহসীন মন্টুর পক্ষে সাবেক এমপি আমানউল্লাহ আমান, কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বর রায় এবং তাদের কর্মীরা কতটা সক্রিয় হবেন, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। গণফোরাম আরো দুটি আসনে মনোনয়ন চাচ্ছে। জাসদ (রব) ও নাগরিক ঐক্য পাঁচটি করে আসন চাইলেও জনপ্রিয়, যোগ্য প্রার্থী সংকটে বিএনপি তাদেরকে তিন-চারটির বেশি আসনে ছাড় নাও দিতে পারে। ২০ দলের শরিকদের ৩০টি আসনে ছাড় দেবে বিএনপি।
জানা যায়, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মানসিক, রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিয়েই বিএনপি নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়েছে। সাজানো মিথ্যা মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়া এবং তারেক রহমানকে পরিকল্পিত ও রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে সরকার যাবতীয় ব্যবস্থা নিয়েছে বলে ভোটার সাধারণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের মুক্তির জন্য ভোট, তাদের সহানুভূতি, সমর্থন প্রার্থনা করবেন বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা। সরকার এখন যা-ই বলুক, নির্বাচন তারা নতুন নতুন কৌশলে প্রভাবিত করবে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের আসনসংখ্যা কম দেখিয়ে হলেও সরকার গঠনের মতো জয় নিশ্চিত করবে বলে বিএনপি মনে করে। নানা কৌশলী ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা দেশবাসী ও বহির্বিশ্বকে দেখাবে যে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে সজাগ থেকেই বিএনপি ও তার সহযোগীরা নিজেদের নির্বাচনী কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা করছেন।
বিএনপির নেতারা কোনোভাবেই বিশ্বাস করেন না এই নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অধীনে প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা সরকারিভাবে বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কমই হবে। এখন পর্যন্ত তেমন কিছু পরিদৃষ্ট নয় বলেই তাদের অভিযোগ। বিএনপিকে একবার নির্বাচনী মাঠে নামাতে পারলেই কেল্লা ফতে বলেই মনে করেছেন সরকারদলীয় নেতারা। কিন্তু বিএনপি সে সুযোগ সরকারকে দেবে না। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও বিএনপির পক্ষে দেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন, সহানুভূতি সংগ্রহ এবং তাকে সংগঠিত রূপ দিয়ে নতুন আঙ্গিকে মাঠে নামবেন তারা। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিকূল পরিবেশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিএনপি সময়মতো তার প্রার্থীদের নির্বাচনী ময়দান থেকে একযোগে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। অন্য দলের সহযোগী, সমমনাদেরও তারা এই প্রক্রিয়ায় শামিল করবেন। আন্তর্জাতিক পরিম-লে তারা প্রতিষ্ঠা করবেন যে গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা বিদ্যমান প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বৈরী ভূমিকার কারণে তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজপথ, রেলপথ, বিমানবন্দর, সচিবালয় অবরোধ, লাগাতার হরতলের মতো কঠোর কর্মসূচি তারা সেই পর্যায়েই দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কর্মসূচি এমন পর্যায়ে নেবেন, যাতে ভোটারদের পক্ষে ভোটকেন্দ্রে যাওয়াই সম্ভব না হয়। নির্বাচনের পর তা আরো তীব্র করা হবে। সরকার সবকিছু সহনীয় মাত্রার মধ্যে রাখে তাহলে বিএনপি তেমন কিছু নাও করতে পারে।