এক পরম কাঙ্খিত “তুমি”

দিল আফরোজ কাজী রহমান চাঁপা

আমাদের সবার মনের ভেতরে এক পরম ‘তুমি’র আকাঙ্খা থাকে – জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি। কে সেই তুমি ? সে কি প্রেমিক-প্রেমিকা ? নাকি তিনি সৃষ্টিকর্তা
? আমরা কতই না স্বপ্ন দেখি সেই ‘তুমি’ কে নিয়ে যাকে পেলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে। এই ‘তুমি ‘কে নিয়ে এক চমৎকার আকাঙ্খার রূপ দেখি এক ভারতীয় গায়কের এক অসাধারণ গানে –
“প্রথমত আমি তোমাকে চাই!
দ্বিতীয়তঃ আমি তোমাকে চাই!
তৃতীয়তঃ আমি তোমাকে চাই!
শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই।
তোমাকে চাই, তোমাকে চাই,
তোমাকে চাই ………….. “
কিন্তু এই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি করেও জীবনের’ শুরু থেকে শেষ অবধি অপেক্ষা করেও কয় জন মানুষ সেই পরম কাঙ্খিত ‘তুমি’র সাক্ষাৎ লাভ করে ? আমরা এই পৃথিবীর কাউকে কখনো কখনো সেই ‘তুমি’ মনে করে এক মধুর স্বপ্নে বিভোর হই। সেই তুমি যখন সংসারের আঙিনায় পা রাখে ধীরে ধীরে সেই স্বপ্ন কালক্রমে চূর্ণ হতে থাকে। হৃদয় ভেঙ্গে দ্বিখ-িত হয়। তাইতো দেখা যায় সমাজে. চারিদিকে ডিভোর্সের ছড়াছড়ি। কোথায় সেই স্বর্গীয় প্রেম ? কোথায় সেই কাঙ্খিত তুমি ? যারা কোন রকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছে …সেটা ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে এবং সমাজের দিকে তাকিয়ে নীরবে ভালোবাসাহীন জীবন যাপন করছে।
আসলে সেই কল্পনার তুমিকে বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায়না। এ এক অলীক স্বপ্ন … তবুও আমরা ভালোবাসি … তবুও আমরা পথ চলি … তবুও আমরা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি। ক্রমে যখন বয়স বাড়তে থাকে …মাথার চুল পাকতে থাকে …জীবন যখন ধীরে ধীরে অস্তাচলের দিকে যেতে থাকে ….রোগ শোক আমাদের শরীরে মনে বাসা বাঁধতে থাকে ….. আমাদের সব মোহ ক্রমান্বয়ে ঘুচে যেতে থাকে। বাস্তবের কঠিন কষাঘাতে আমাদের মনে ক্রমেই একটি নুতন বোধের উদয় হয়। তখন আমরা বুঝতে পারি আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ বা গড বা ভগবান বা ঈশ্বরই হচ্ছেন সেই কাঙ্খিত “তুমি “। আমরা তখন সব কিছু ফেলে দিনরাত তাঁর ধ্যানে রত হই যে যার মতো করে। এই যে এক সৃষ্টিকর্তার ভাবনা এবং তাঁর উপর বিশ্বাস আমাদের জীবনকে এক অপরিসীম মাধুর্যে ভরে তোলে। তা না হলে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা খুব কঠিন হতো।
আমরা মুসলমানেরা যত রকম নামাজ আছে সবই পড়ি…এমন কি মাঝ রাতে তাহাজ্জুতের নামাজও পড়ি …আর বলি – “ হে আল্লাহ, তোমাকে ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝিনা … তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে চাইনা …. আমি আমার সব ভালোবাসা তোমাকে দিলাম …তুমি আমাকে সৎ পথে পরিচালিত করো … তুমি আমাকে ক্ষমা করো …তুমি আমাকে দয়া করো …তুমি আমাকে পরিপূর্ণ করো ….তুমি আমার সব প্রার্থনা কবুল কর প্রভু। ” এই রকম ভাবে একাগ্র চিত্তে যখন মাইন্ডকে কন্ট্রোল করে আল্লাহর ধ্যানে রত হই আমরা ঠিক তখন এঞ্জেলরা এসে আমাদের পাশে দাঁড়ান। তাঁরা আমাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য করেন।
প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেকগুলো অসাধারণ আধ্যাত্মিক গান এবং কবিতা রচনা করেছেন। মহান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন -“তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুব তারা ।
এ সমুদ্রে আর কভু হবো নাকো পথ হারা।
যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাক।
আকুল নয়ন জলে ঢালগো কিরণধারা। “
তিনি আরো বলেছেন -“যেদিন তোমার জগৎ নিরখি,
হরষে পরাণ উঠেছে পুলকি,
সেদিন আমার নয়নে হয়েছে,
তোমার নয়ন পাত।
জীবনে আমার যত আনন্দ
পেয়েছি দিবস রাত।
সবার মাঝারে আজিকে তোমারে
স্মরিব জীবন নাথ’’
এই দুটো গানই কবিগুরুর অতি উচ্চ পর্যায়ের আধ্যাত্মিক গান।
“আপন নয়ন জলে ঢালগো কিরণধারা।”. কিরণধারা অর্থাৎ সূর্যের আলো। প্রভু তুমি নয়ন জলের মতো করে সূর্যের আলো ঢালছো। আমি যেখানেই যাই তুমি সেখানেই প্রকাশিত থাক। ইসলামও একই কথা বলে – একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানুতালাই সর্বত্র বিরাজ করেন।
এই জন্যে আমার জীবনে তোমাকে আমি ধ্রুব তারকা করেছি। এই জীবন সমুদ্রে আমি আর কখনো পথ হারা হবোনা। কারণ প্রভু তুমি আছ আমার সাথে। যেদিন তোমার জগতকে দেখলাম সেদিন খুশীতে আমার মন ভরে গেলো। ঠিক সেদিন আমি তোমাকে চিনেছি। “সেদিন আমার নয়নে হয়েছে তোমার নয়ন পাত।
গেইন্সভিল, ফ্লোরিডা।