এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

মো. মিজানুর রহমান
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে দ্রম্নত এগিয়ে চলছে দেশ। গার্মেন্টস শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নারীদের ক্ষমতায়ন করেছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাও বেড়েছে। বিদেশের শ্রম বাজারেও রয়েছে বাংলাদেশের অসংখ্য শ্রমশক্তি এবং তাদের প্রেরিত রেমিট্যন্স জাতীয় অর্থনীতির চাকা রাখছে গতিশীল। ক্ষুদ্র-মাঝারী শিল্পের উত্তরোত্তর বিকাশ ঘটছে। চীনের মতো বাংলাদেশের ধোলাইখাল-জিনজিরার পণ্য উৎপাদন অর্থনীতিতে রাখছে গুরম্নত্বপূর্ণ অবদান। কৃষিভিত্তিক শিল্পও দ্রম্নত গতিতে বিকশিত হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে পস্নাস্টিক, লেদার, টেক্সটাইল, পাট, বস্ত্র, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারি, লবণ, রিয়েল এস্টেট, মোটরসাইকেল, জাহাজ নির্মাণ, পর্যটনসহ বিভিন্ন শিল্প এই দেশে গড়ে উঠেছে। এই সকল শিল্প দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যথেষ্ট উপাদান ও উপকরণ বাংলাদেশের রয়েছে। সঠিক ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে পারলে আমাদের অগ্রগতি কেউ ঠেকাতে পারবে না।
রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির এই অগ্রগতি বজায় থাকায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। গত বছরের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের এক প্রতিবেদনে ওই প্রশংসা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও উলেস্নখযোগ্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকার পরও দেশটির সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে।
একটি কথা না বললেই নয়, অর্থনীতির নানা সূচকে বাংলাদেশ ক্রমাগত এগিয়ে চলছে। তবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ব্যাংক কেলেঙ্কারি অন্যতম। এতকিছুর পরও আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে, যা বর্তমানে সিঙ্গেল ডিজিটে অবস্থান করছে। এর সবই বর্তমান সরকারের সফলতা। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী ও পুরম্নষের মধ্যে সমতা ফিরে আসছে। নারী উন্নয়নে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর লিঙ্গ বৈষম্যে অনেকটাই সমতা এসেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জেন্ডার সমতা এমনভাবে বাংলাদেশে আর দেখা যায়নি। সরকারের গুরম্নত্বপূর্ণ পদসহ কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখন সমান গুরম্নত্বপূর্ণ। ‘৯৬-এর পর কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদানের প্রতিফলন সমাজে পড়তে শুরম্ন করে। ২০০৫-০৬ শ্রম জরিপ অনুসারে মোট শ্রমশক্তির ৪১.৮ শতাংশ পুরম্নষ এবং ৬৮.১ শতাংশ নারী সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। গত এক দশকে কৃষিখাতে পুরম্নষ শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১০.৪ শতাংশ, যা নারীদের দ্বারা বর্তমানে সম্পাদিত হচ্ছে। এক সমীক্ষায় জানা গেছে প্রান্ত্মিক ও ক্ষুদ্র চাষি পরিবারের নারীরা নিজ উদ্যোগে বসতবাড়ির আঙিনায় ফলানো সবজি চাহিদার অনেকাংশ মোটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ে অবদান রাখছে ১৫ থেকে ৩০ ভাগ।
বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় হচ্ছে: উন্নয়নের জন্যে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। ব্যক্তি, দল-মতের উর্ধে উঠে দেশের জন্য সবাইকে আত্মনিয়োগ করা। সৎ ও নিষ্ঠাবান হওয়া। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্ত্মরিত করা। হিংসার ঊর্ধ্বে থেকে উন্নয়ন নীতি-কৌশল সঠিকভাবে বাস্ত্মবায়ন করতে হবে। সম্ভাবনাময় শিল্প খাত উন্নয়নে সঠিক নীতি-কৌশল গ্রহণ ও বাস্ত্মবায়ন করা। জাতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করা। সম্পদের সুষম বণ্টন করা। বিদেশিরা যাতে আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে সে জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি কর। বিশ্ব দরবারে দেশকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা। পুঁজিবাজারের সমস্যা দুর করে পুঁজিবাজার সম্পর্কে মানুষের আস্থা তৈরি করা। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে অধিক চাঙ্গা রাখা।
স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছানো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। এর ফলে বিশ্বের ৫১টি অভিজাত দেশের তালিকায় ঢুকল বাংলাদেশ। মাথাপিছু জাতীয় আয় এখন ১৩১৪ ডলার। এই বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৫৮তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। দেশের মাথাপিছু ক্রয় ক্ষমতা এখন ৩০১৯ ডলার। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখন ৩৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।
বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও আন্ত্মর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর মতে মোট দেশজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৪৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ, ২০১৪ সাল থেকে ১১ ধাপ ওপরে। বর্তমানে দেশের মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদন ১২৩৫ ডলার, ২০০৬ সালে যা ছিল ৫১৪ ডলার। জাতীয় উৎপাদনের হার ২০১৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৬.৫১ শতাংশ। অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে বাংলাদেশ টানা ছয় বছর ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখেছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারত ব্যাতীত দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশকে ছাপিয়ে ক্যাটাগরি ৬ থেকে ৫ এ উঠে এসেছে। এ ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডবিস্নউইএফ) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সূচকে (এষড়নধষ ঈড়সঢ়বঃরঃরাবহবংং ওহফবী) বাংলাদেশ একধাপ এগিয়েছে, যার কারণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও চিকিৎসা সেবায় দেশের উন্নতি।
২০০৫ সালে দেশের রেমিট্যান্স আয় ছিল ৪.৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের গত ছয় মাসে প্রবাসীদের পাঠান রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭.৪৫ বিলিয়ন ডলার। এর পেছনে মূল কারন বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি। মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ বু্যরোর মতে ২০১৫ সালে ৪ লাখ ২০ হাজার পুরম্নষ ও ৭৬ হাজার ৭ জন নারী বিদেশে কর্মসংস্থান লাভ করেছেন।
আন্ত্মর্জাতিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইস এর অক্টোবর ২০১৫ এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ তিনগুন বেড়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের বেড়েছে দ্বিগুণ। বর্তমানে দেশের ১০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩৭ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু সম্পদ ২,২০১ ডলার।
বাংলাদেশের দ্রম্নতলয়ে এগিয়ে যাওয়ার এ কৃতিত্ব দেশের ১৬ কোটি মানুষের। বিশেষত শ্রমজীবী মানুষের। দেশের প্রায় ১ কোটি শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। পোশাকশিল্পের ৪০ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিকের অক্লান্ত্ম ভূমিকা বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পোশাক তৈরির দেশ হিসেবেই শুধু প্রতিষ্ঠিত করেনি, দেশের অর্থনীতিকে স্ফীত করছে। কিছু কিছু বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের নেতিবাচক রাজনীতি দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত্ম করলেও বাংলাদেশের সাফল্য দুনিয়ার সব দেশের জন্যই ঈর্ষণীয়। সাফল্যের এ ধারা যে কোনো মূল্যে অব্যাহত রাখতে হবে।